১৯২২–১৯৭১
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
See more >>-
‘ওমা, আমি ভেবেছিলুম এ ঘরে বুঝি কেউ নেই; যা অন্ধকার—কিছু দেখা যায় না।’ শুনে নিরন্ধ্র অন্ধকারে আনোয়ার হাসলে, বোধ হয় কথাটা মিথ্যে বলে; চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে আবছা সাদা বস্তুর পানে তাকিয়ে বললে: ‘আলাপ করবে? উঁ? করবে-তো ওঘর হতে আলোটা নিয়ে এসে বস।’
‘আলো?...তা…’ ছালেহা ইতস্তত করে থেমে গেল। আনোয়ার উঠে দাঁড়ালে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে একটা অর্ধদগ্ধ মোমবাতি খুঁজে বের করল, জ্বালাতে-জ্বালাতে, বললে: ‘বুঝেছ? মাঝে মাঝে একেবারে ভুলে যাই আমাদের বাড়িতে শুধু একটি আলো। মুসলমানদের এ-ধরনের ভুল প্রায়ই হয়ে থাকে, এবং সেইখানেই সবচেয়ে বড় দুঃখ।’
ছালেহা কিছু বললে না; আনোয়ারের ছেঁড়া-নোংরা মাদুরের এক প্রান্তে নিঃশব্দে বসল। কয়েক
-
বাইরে আকাশ কাঁদছে, ঘরে কাঁদছে রহিমা।
ঝমঝম শব্দে অবিশ্রান্ত অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে: বৃষ্টির ছাটে জানলার স্বচ্ছ সার্শিগুলো ঝাপসা ঝাপসা হয়ে উঠছে: অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে পানি ঝরার একটানা করুণ সুরে-সুরে রহিমা কাঁদছে; আর অদূরে ঝাপসা সার্শির মধ্য দিয়ে বাইরের অস্পষ্ট সিক্ত বস্তুগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঈষৎ মাথা নিচু করে প্রস্তরমূর্তির মতো আনোয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে ক্রন্দনরতা রহিমার স্বামী।
আকাশের পানি অবিরাম ঝরছে, কিন্তু রহিমার কান্না যেন ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে আসছে। সে-কথা আনোয়ার জানে। জানে বলেই সে কিছুটা অধীরচিত্তে আগতপ্রায় সন্ধ্যার কথা ভাবছে। সন্ধ্যা-আলো আজ মলিন থাকবে। এ-মলিনতার মধ্যে এখানে আসবার পথ কি মমতাজ বেগম খুঁজে পাবে? একবার খুব করে জোর
-
চৈত্রের শেষে পল্লবশূন্য গাছে-গাছে নতুন সবুজ কচিপাতা গজিয়ে ওঠবার আগেই সাঈদের মেয়াদ ফুরিয়ে এল। তার অস্থায়ী পোস্টাফিসের চাকরিটির নির্দিষ্ট সময় উতরে গেলে। এবার তার যাবার পালা।
যে-দিন সাঈদ তার কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি চলে যাবে, সে-দিন অতি প্রভাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠল। উঠে ধীরে-ধীরে জানলার কাছে গিয়ে গরাদ ধরে দাঁড়ালে। তার ঋজু পাতলা দেহে তখনো ঘুমের জড়িমা: তার পদ্মের মতো চোখ দুটি তখনো নিদ্রালস। জানলার নিচেটা নানারকম ফুলের গাছে পরিপূর্ণ; তারই মিষ্টিমধুর গন্ধে সাঈদের নাক ভরে উঠল। বাইরে আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু সে-আলোতে রক্তাভা নেই: আছে একটা বিস্তৃত পবিত্র সুনির্মল স্নিগ্ধতা। দূরের জিনিস আবছা-আবছা দেখাচ্ছে, যেন পৃথিবীর গায়ে কুয়াশা। আর
-
দূরে সবুজ বনরেখা। সে বনরেখার পেছনে যে নীল পাহাড়গুলো দিগন্তরেখায় ঢেউ তুলে সারি-সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাহাড়িরা বলে সেখানে নাকি একটি স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, যার চারিধারে প্রাচীর সৃষ্টি করে ভিড় করে রয়েছে দীর্ঘ ঘন সন্নিবদ্ধ পাইন-বৃক্ষ। ওই সবুজ বনরেখা পেরিয়ে সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে—জড়াজড়ি-হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন পাইনের বন ঘেঁষে আজ সকালে এক ঝাঁক নাম-না-জানা হলদে পাখি উড়ে গেল।
হলদে পাখির ঝাঁক উড়ে গেল, সকালের নম্র স্নিগ্ধ সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে মনির তা-ই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, অলস কান পেতে শুনেছে তাদের পাখার সম্মিলিত অস্ফুট ধ্বনি, আর চলতে-চলতে হোঁচট খেয়েছে। বনের অন্তরালে ওরা মিলিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপরে ঝাউগাছটার তলে
-
আজ সন্ধ্যায় উত্তর আকাশের মেঘগুলো নীলাভ হয়ে উঠেছে, আর তাই চেয়ে-চেয়ে দেখে আরশেদ হামেদের স্বচ্ছ চোখও যেন নীলাভ হয়ে উঠল। হাতে তার একটা রক্তজবা, গাঢ় লাল তার রং। পাশের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা যে-ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি বসে ছিল নীরবে, তার পানে চেয়ে সে বললে: ‘ওই যে নীল মেঘগুলো—স্নেহের মতো নরম কোমল নীলাভ মেঘগুলো, ওইগুলো দেখে হঠাৎ একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল, ভারি দুঃখময় সে ঘটনাটি। শুনবে?... বলছি, আগে এই ফুলটি নাও।’
মেয়েটির সরু-সরু আঙ্গুলগুলো কোমল আর দীর্ঘ, সে-আঙ্গুলগুলো দিয়ে সে হামেদের হাত হতে আস্তে ফুলটি নিলে, নিয়ে মাথা নিচু করে কেমন করে সেটা খোঁপায় গুঁজে দিলে।
-
বড় রাস্তা হতে যে-সরু নোংরা গলিটি নগণ্য ঘটনার মতো আলগোছে নীরবে ওধারে সরে পড়েছে, সে-গলি দিয়ে কয়েক পা এগুলেই এক বিচিত্র আবহাওয়ায় গিয়ে পৌঁছোনো যায়। এ যেন তুচ্ছ ঘটনার পুচ্ছ ধরে বিরাট পরিণতি স্ফীত হয়ে ওঠার মতো। বড় রাস্তা হতে মোনায়েম সে-গলিতেই মোড় নিল।
একটা ঝুনো বাসার দরজায় কড়া নাড়তে যে মেয়েটি এসে দরজা খুলে দিল, তাকে মোনায়েম প্রথমেই বলল: পথ ভুলে আসি নি, বিশ্বেস কর।
মেয়েটি হাসলে, বললে: তা না হয় করলাম, কিন্তু ওরা যা খেপেছে সে-কথা আর বলবার নয়। বিচারে কী সাব্যস্ত করেছে জানেন?
কী? সভয়ে মোনায়েম তাকাল ওর চোখের পানে।
আপনাকে এ-বাসায় আর কক্ষনো ঢুকতে দেয়া হবে
-
[ ১৩৪৯ সালের পৌষ মাসে আমার সাত বোন পারুল শীর্ষক গল্পটিমোহাম্মদীতে প্রকাশ পেয়েছিল। আমাকে তখন আলাপে ও চিঠিতে বহুবার প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল এই মর্মে যে, এটা বাস্তব থেকে নেয়া কি না। তাহলেই হয়েছিল। আদালত পর্যন্ত ব্যাপারটা দৌড়ত না বটে, কিন্তু রুনু ঝুনু মুনু টুনু ভুলু লুলু বুলু—এই সাত বোনের গাট্টা খেয়ে মাথাটা আর আস্ত থাকত না। তবে একথাও ঠিক যে, এদের আমি ছাড়া ছাড়াভাবে এখানে-সেখানে দেখেছি, এবং এদের চপলতা ও স্বচ্ছ প্রাণময়তায় বারেবারে মুগ্ধ হয়েছি।]
দোরটা ভেজানো, সেটা ঠেলে মোনায়েম সন্তর্পণে ঘরে ঢুকলে। বাইরের ঘরটা নির্জন, কেউ কোথাও নেই। কিন্তু সে দু’পা এগিয়েছে কী অমনি অনেকগুলো সরুগলার বিকট
-
—তোমার মুখে ও কিসের আভা?
থামের আড়ালে ছায়া: সে-ছায়ায় ময়লা ও জীর্ণ সবুজ আলখাল্লা গায়ে যে-বৃদ্ধ ফকির নিমীলিত চোখে নিশ্চল হয়ে বসেছিল সে এবার চোখ মেলে চাইলে, প্রথমে দেখলে দুটি জ্বালাময় তীব্র দৃষ্টি। তার সামনে উবু হয়ে যে ছেলেটি বসে তাকিয়েছিল তার পানে, তার কোমল মুখ রিক্ততায় প্রখর, ক্ষীণ দীর্ঘ দেহ দীনতায় চঞ্চল, আর জ্বালাময় তীক্ষ্ণ চোখদুটি পদ্মশূন্য ও ছোট। তার পরনের কাপড় ময়লা, কিছুটা ছেঁড়া, আর তার মাথার রুক্ষ লালচে চুলগুলো এলোমেলো, সেগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কানের পাশে, ঘর্মাক্ত কপালের ওপর।
—তুমি কে?
ছেলেটির কাছ হতে সে-প্রশ্নের কোনো উত্তর এল না। তার পানে কতক্ষণ চেয়ে থেকে ফকির আবার প্রশ্ন করলে:
-
সন্ধের দিকে কোত্থেকে একটা জমাট মেঘ উড়ে এল, যার অভিক্ষেপগুলো কৌণিক ও তীক্ষ্ণ। মেঘ এল আর সাথে সাথে দুর্দান্ত হাওয়া শুরু হল, বাগানের ঝাউগাছগুলোতে প্রচণ্ড সাড়া পড়ে গেল। নওয়াজের স্ত্রী সকিনা ধূসর রঙের শাড়ি পরে ওঘর থেকে বেরিয়ে এল, বারান্দায় নওয়াজকে বললে: দেখেছ, কেমন হাওয়া?
—ভালো লাগছে তোমার?
—বাগানে যাবে? গিয়ে বসবে ওই ঝাউগাছগুলোর তলায়?
ঝাউগাছগুলোতে এমন একটা বিচিত্র শোঁ-শোঁ আওয়াজ, ওরা দুজন তার তলায় না গিয়ে পারলে না। গিয়ে তারা একটা দীর্ঘতর ঝাউগাছের তলায় বসলে। সকিনা তার মাথার রুক্ষ চুল ছেড়ে দিলে, প্রবল হাওয়ায় বোশেখি মেঘের মতো সে-চুল উড়তে থাকল। নওয়াজ কোনো কথা না-কয়ে শুধু তার একটি হাত নিজের
-
দক্ষিণের জানালাটা খোলা, পর্দাও সরানো। গুমট গরমের পর বাইরে হাওয়া দিয়েছে, তার কিছু জানলা গলে ভেতরেও আসছে।
সন্ধেয় বেড়িয়ে ফেরার পর আকরমের এক পেয়ালা চা খাবার অভ্যেস। আজ বেড়িয়ে ফিরে জামা-কাপড় ছেড়ে একটা পাতলা সিল্কের লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ইজিচেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসেছে, এমন সময় হোমেরা চায়ের পেয়ালা নিয়ে আস্তে ঘরে এল। ইজিচেয়ারের পাশে টিপয়, তার ওপর সে পেয়ালাটা নাবিয়ে রাখলে। চা দেবার পর আর কোনো কাজ নেই, কোনো কথাও নেই, তাই হোমেরা দরজার পানে আবার চলতে শুরু করেছে তখন আকরম পেছন থেকে আস্তে ডাকলে: শোন।
—কী? হোমেরা দাঁড়াল।
টিপয় থেকে পেয়ালা তুলে তাতে আকরম এক চুমুক দিলে, তারপর স্বাভাবিক
-
ভোর হতে সন্ধে পর্যন্ত এ স্থান ভরে শুধু খটাখট শব্দ। এতগুলো লোক, সবাই নীরব, কারো মুখে কোনো কথা নেই। এরা নৌকো তৈরি করে, বিভিন্ন প্রয়োজনের বিভিন্ন ঢঙের নানারকম নৌকো। সাম্পান হতে শুরু করে তিনশ' চারশ' মনের সাগরে মাছ ধরবার বা মাল বইবার বড়-বড় নৌকো এরা অনায়াসে তৈরি করতে পারে এবং করে।
কর্ণফুলী নদীর এ-ধারটা ঝোপঝাড়ে ঢাকা পাহাড়, তার ঠিক নিচেই নদীর তীর দিয়ে যে-খানিকটা সমতলভূমি, সেখানে তাদের নৌকো বানাবার কারখানা। একপাশে বিরাট টিনের গুদাম, সেখানে তারা কাঠ রাখে। তার পাশেই ছোট চালার ঘর, রাতে সেখানে লোক থাকে আর পাহারা দেয়। পাহাড়টা পেরিয়ে কাছেই গাঁ। এ-গাঁয়ের লোকদের পেশাই নৌকো বানানো, পুরুষানুক্রমে
-
কখনো স্বপ্ন গড়িয়ে আসে। অদ্ভুত কথা, তবু সত্যি। মনের উচ্চতম শিখরে স্বপ্ন যেন জমাট বেঁধে রয়েছে বরফের মতো, হঠাৎ কখন কিসের উত্তাপ এসে পড়ে তার শীর্ষে, সে-জমাট-বাঁধা স্বপ্ন গড়িয়ে আসে মন বেয়ে। গড়িয়ে আসে হয়তো লাভার মতো, হয়তো স্নিগ্ধ শীতল পানির মতো, কখনো-বা হয়তো পর্বত-দেহে আঘাত পেয়ে ফিরে আসা হাওয়ার মতোই আসে। সব জীবন-তো আর এক নয়।
আকবরের স্বভাব শান্ত। শান্তভাবে চলে শান্তভাবে কথা কয়ে সে আই. এ. পাস করেছে এবং শান্তভাবেই বাপের মৃত্যু সহ্য করে শান্তভাবে কেরানিগিরি করতে শুরু করেছে। কথা সে এত কম কয় যে কখনো মনে হয় তার যেন মন নেই, সে যেন ভাবে না; অথচ এ-কথা
-
[ ওর পরিচয়: ওর বয়স পঁচিশ। চেহারা ধারালো, ক্ষুদ্র উজ্জ্বল চোখদুটো অস্মিতাময়। জীবনে ওর অখণ্ড অবসর, এবং ব্যাংকে অজস্র অর্থ। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এই: কেউ গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে অর্থহীন পুলকে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দিলে ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।]
সহজ গতি:
ওর ভাষায় আজ সন্ধ্যার কথা:
সায়ন্তন শান্ত অথচ উজ্জ্বল আকাশে রঙের অসংখ্যতা ও সীমাহীনতা। এবং সে-বর্ণঝর্না যেন আজ অত্যুজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে গুঞ্জনময় কোলাহলমুখর আলোকিত শহরের বুকে। চারধারে ঝলমলানি, অস্ফুট সৌন্দর্যের মৃদু অথচ কঠিন অভিব্যক্তি, প্রাণ-স্নাত নরনারীর সংস্কৃতি-তরঙ্গের অনাবিল ঝিকিমিকি, এবং সে-ঝিকিমিকির একান্ত অন্তরালে ও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে—হঠাৎ ফুটন্ত অস্বাভাবিক উত্তুঙ্গ পুষ্পটির পাপড়িগুলো হতে দূরে, ধূসর-স্নিগ্ধ—নির্জনতার একান্তে। (সেটা দোতলার দক্ষিণ
-
কত গভীর রাতে আফজল রাতের নিঃশব্দতায় কান পেতে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এবং কখনো- কখনো মনে হয়েছে রাতের উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়ে তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে সে চেয়ে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অতল অন্ধকারের পানে, তারপর মনটা শূন্য হয়ে উঠে ঐ অন্ধকারের, যে-অনুবন্ধী অন্ধকার চিহ্নশূন্য অথচ অবান্তর নয়, সে অন্ধকারের ক্ষুদ্রতম কণাতম অংশই যথেষ্ট তার সীমাহীনতার প্রমাণ দিতে সে অন্ধকারের মতোই হয়ে উঠেছে।
অথচ তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে অন্ধকারের পানে সে চেয়ে দেখছে। পেছনে তাহলে বিন্দু-বিন্দু যে-আলোর কণা ছড়িয়ে ছিল, তা কি মহাআলোর বিনয়? থেকে-থেকে কাঁটার মতো বিদ্রোহী মনোভাব খুঁচিয়ে উঠেছে। কী একটা সংগ্রাম। সংগ্রাম!
এবং অনেক রাত ঠেকেছে বিভীষিকাময়।
অথচ সে-বিভীষিকায় নেশা।
শারদীয়
-
সামনের মাঠটা উঁচু হয়ে উঠে গিয়ে কিছু দূর হতে আবার নেবে গেছে। নেবে গেছে অনেকখানি। এতখানি নেবে গেছে যে, দূরের সুপুরিগাছ দুটোর শুধু আগা দেখা যায় এখান থেকে।
আকাশটা আজ নীল-ঝকঝকে নীল। এবং সে আকাশের তলে সবুজ মাঠটি মানিয়েছে ভালো। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাবেয়া সেদিকে চেয়ে আছে বটে কিন্তু তাঁর মন নেই সেখানে। নির্দিষ্টভাবে নেই কোথাও, কিন্তু সামনের মাঠটার নেবে-গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কেমন একটা নীরব উদাসীনতা, তাতে তার মনটা থেকে থেকে বেদনায় ছলছল করে উঠছে।
ওপাশে ইজিচেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে আকবর খবর কাগজ পড়ছিল, হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল রাবেয়ার পানে। ক্ষণকাল পরে শুধাল: কী দেখছ অত?
—মাঠ—মাঠ দেখছি
-
ক-দিন হল সামনের বাগান ও লনওয়ালা দোতলা বাড়ির মালিকরা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে। তাদের আগমনে খালি পড়ে থাকা মৃতপ্রায় সে বাড়িটা হঠাৎ প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠল। শুধু প্রাণ তো নয়, দীপ্ত যৌবনেরও আবির্ভাব ঘটেছে বলা যেতে পারে। রাতারাতি আচমকা পরিবর্তন ঘটে গেল সে-বাড়িটায়। দরজা-জানলায় ঝুলতে লাগল রঙিন পর্দা, মোটা ও ভারি এবং আমেঝে পর্যন্ত ঝোলানো, আবার কোনোটা পাতলা ঝিরঝিরে। সিঁড়ি, রেলিং ও বারান্দার প্রান্তের ওপর-নিচ পূর্ণ হয়ে উঠল নানারঙা ফুল ও পাতাগাছের টবে-টবে। তাছাড়া কখনো পিয়ানোর ও রেডিয়োর আওয়াজে, কখনো উচ্চকলহাসিতে অহরহ মুখর হয়ে উঠল গোটা বাড়িটা।
মালিকদের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সেলিমা উত্তরের গরাদ-দেয়া কিছু-ভাঙা জানলাটার পাশে কাজের ফাঁকে
-
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নাবল দেখে কামরুল হাসান পা-দুটো গুটিয়ে বসল, তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে হঠাৎ বললে: বুঝেছ, কালচার জিনিসটার যেন একটা গন্ধ আছে যা নাকে এসে লাগে। আর সে গন্ধ রজনীগন্ধার বা হানাহানার গন্ধ নয়, অনেকটা যেন ভালো পাতিনেবুর গন্ধের মতো। আর রং? রংটাও বসরা গোলাপ, সূর্যমুখী-রক্তজবা ইত্যাদির মতো অমন চোখ-ধাঁধানো জলুস তীব্র গোছের নয়, অনেকটা যেন, চাঁদনিরাতের আকাশের বিচিত্র নীলিমার মতো।
বলে কামরুল চোখ বুজল, বুজে আরেকটা কড়া টান দিলে সিগ্রেটে। আসর আজকে জমল না; অসময়ে হঠাৎ বর্ষার জন্যেই এল না কেউ। তবু কামরুলের ভাগ্য ভালো যে, রাসেল (অর্থাৎ রসুল) এসেছে। রসুলের নাম রাসেল হয়েছে তার ঘোরতর চার্চ-প্রীতি থেকে।
-
প্রথমে ধরা পড়ে না কিন্তু সময় নিয়ে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে কিসের যেন অভাব এ পরিবারে: হয়তো প্রাণের, বাহ্যিক ঝংকারের। সবাই কথা কম কয়, সবারই যেন একটা আলাদা জগৎ আছে যার মধ্যে প্রত্যেকে মগ্ন এবং যার সম্বন্ধে তারা পরস্পর অজ্ঞ। আম্মা হয়তো নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই দেয়ালের পানে বা মেঝের পানে চেয়ে মুহূর্তের পর মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থাকবেন, এবং একটু দূরে খাটের ওপর বসে বড়মেয়েটি আধা-চোখ বুজে মুরগির পালক দিয়ে কান খোঁচাতেই থাকবে, আম্মার পানে তাকালেও তার মনে কোনো প্রশ্ন জাগবে না। আব্বা হয়তো আপিস থেকে আসবেন, এসে চা-নাশতা খেয়ে বেলা গড়িয়ে এলে, সামনের মাঠটা গাঢ় সবুজ হয়ে উঠলে,
-
পদ্মাতে নতুন পানির শোরগোল পড়ে গেছে। পদ্মা নিজেকে বিস্তীর্ণ করেছে, যে জমিগুলো কোনো প্রকারে মাথা জাগিয়ে রোদ পোহানো কুমিরের মতো সূর্যের তলে নিজেকে প্ৰকাশ করেছিল, সে-গুলো আবার ঢেকে দিচ্ছে; কিন্তু ভাসিয়ে নিচ্ছে, আর দু-ধারের দুই দিগন্ত স্পর্শ করবার ব্যাকুলতা নিয়ে সে মুহূর্তে মুহূর্তে নিজের সবল দেহ প্রসারিত করছে, ফুলে-ফুলে গর্জে-গর্জে হিংস্র ঔদার্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ওধারে ঘোলাটে আকাশে কেমন হাওয়া। থেকে থেকে সে হাওয়া এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মনিরুদ্দিনের ঘাসী নৌকাটা কাত হয়ে ওঠে। হাল ধরছে সে নিজেই, মাঝি দুটো ছইয়ের এধারে উবু হয়ে বসে রাতের রান্নার ব্যবস্থা করছে। ছইয়ের ভেতরে ওদিকটায় দুটি প্রাণী—স্বামী আর স্ত্রী; তারা যাত্রী। কলকাতা থেকে
-
হাতে এত অবসর যে মনে হয় আকাশটা কত বড় হয়ে উঠেছে : এত বিশাল এত গভীর এবং এত মৌন আকাশ সে যেন দেখে নি কখনো। দেহ শুধু ক্লান্তিতে জড়িয়ে ওঠে, আর সে ক্লান্তিতে কেমন নেশা।
এখন সকাল। বোশেখি রোদ এখনো তেতে ওঠে নি, পশ্চিমের ঘরটায় এখনো কোমল ছায়া। দক্ষিণের জানলার পাশে ডেক-চেয়ারে আমজাদ বসে রয়েছে নিশ্চুপ হয়ে, আর হয়তো চেয়ে দেখছে অদূরে মাইল-স্তম্ভের পাশে বুড়ো জামগাছটার পানে। মৃদু-মৃদু হাওয়া বইছেই, জামগাছের পাতা নড়ছেই। কিন্তু কখনো-কখনো হাওয়া জোর হলে জোরে কেঁপে ওঠে, আবার স্তব্ধ হয়ে গেলে গাছময় এ-অবসরের মতো নিশ্চলতা জমে ওঠে। বাসাটা শহরের প্রান্তে বলে এধারে কোলাহল নেই এবং কোলাহল
-
আফিয়ার আব্বা গম্ভীর প্রকৃতির লোক। চেহারাটা ভারি, বৃহৎ বাঁকা নাক। আর চোখদুটি অদ্ভুত রকম স্থির। কখনো-কখনো তাতে গাম্ভীর্য বা বিরক্তি ঘনিয়ে ওঠে বটে, কিন্তু হাসির উচ্ছলতা তাতে ধরা পড়ে না।
ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে আফিয়ার তবু ঘনিষ্ঠতা ছিল। আদর করে কথা কইতেন, মিষ্টি করে হাসতেন। তাছাড়া প্রয়োজন হলে শাসনও করতেন। বাড়িতে পয়সা চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। সেবার মুন্নু, রেজিয়ারা এসেছিল। ওরা আত্মীয় বটে, কিন্তু বিদেশে তারা থাকত বলে আগে কখনো দেখেনি তাদের। মেহমান পেয়ে আফিয়ার আনন্দ হল, ভাব করল তাদের সঙ্গে। কিন্তু দুয়েক দিন পরে বুঝলে ওদের যেন কেমন ছ্যাঁচড়া অভ্যাস, এটা-সেটা চুরি করবার ঝোঁক। আব্বা বরাবর
-
বৃদ্ধ লোকটি যখন তার কথার মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছে তখন যুবকটি মুখ তুলে তার পানে কয়েকবার তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। ধারালো খাড়া নাক, মাথায় লাল ফেজ ; আর তার মোটা, রুক্ষ ঠোঁটটা কেমন আলগোছে ঝুলছে। তারপর সে বৃদ্ধের চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল, কতক্ষণ শুনল। কিন্তু আশ্চর্য, বৃদ্ধের কথা কখন শেষ হল সে টেরই পেল না, কারণ তার আগেই এক সময়ে হঠাৎ কী হল, সে যেন গড়িয়ে গেল, ধসে গেল, তারপর জানল যে সে রক্ত দেখেছে। অন্তত তেমনি তার মনে হল। সে রক্ত দেখল, যে-রক্ত কেমন একটু বিচিত্র ধরনের আর যা কেমন নিঃশব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে রক্তের সাগর তৈরি করছে।
সে অনেকক্ষণ এসব দেখল।
-
স্যাতস্যাতে দিনে মনটাও কেমন ভিজে ভিজে হয়ে ওঠে। কেবল বৃষ্টি আর বৃষ্টি, ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটছে সর্বক্ষণ, তবু মেঘের যেন অন্ত নেই। কাছারির ওধারে বড় পুকুরটা কানায় কানায় টলোমলো; আর ওধারের কাঁচা রাস্তাটায় কাদা ছাড়া কিছু নেই। কখনো একটা কিংবা দুটো জানলা-তোলা গাড়ি যাবে, অথবা একটা-দুটো লোক। কারো ছাতি আছে, কারো নেই। কিন্তু জুতো নেই কারো পায়ে। কাদা আর পানি রাস্তায়, জুতো সেখানে চলে না, খালি পায়েও অতি সাবধানে পা টিপে টিপে চলতে হয়-পিচ্ছিল কাদায় একবার পিছলে গেলে দেহের আর কিছু থাকবে না।
খড়খড়িটা তুলে করিমন পথ দেখছিল। ঘরে আবছা অন্ধকার, তোলা-খড়খড়ি দিয়ে যা বা ম্লান আলো আসছে, সে-আলো তার মুখে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.






















