প্রাস্থানিক
চৈত্রের শেষে পল্লবশূন্য গাছে-গাছে নতুন সবুজ কচিপাতা গজিয়ে ওঠবার আগেই সাঈদের মেয়াদ ফুরিয়ে এল। তার অস্থায়ী পোস্টাফিসের চাকরিটির নির্দিষ্ট সময় উতরে গেলে। এবার তার যাবার পালা।
যে-দিন সাঈদ তার কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি চলে যাবে, সে-দিন অতি প্রভাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠল। উঠে ধীরে-ধীরে জানলার কাছে গিয়ে গরাদ ধরে দাঁড়ালে। তার ঋজু পাতলা দেহে তখনো ঘুমের জড়িমা: তার পদ্মের মতো চোখ দুটি তখনো নিদ্রালস। জানলার নিচেটা নানারকম ফুলের গাছে পরিপূর্ণ; তারই মিষ্টিমধুর গন্ধে সাঈদের নাক ভরে উঠল। বাইরে আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু সে-আলোতে রক্তাভা নেই: আছে একটা বিস্তৃত পবিত্র সুনির্মল স্নিগ্ধতা। দূরের জিনিস আবছা-আবছা দেখাচ্ছে, যেন পৃথিবীর গায়ে কুয়াশা। আর ধূলিধূসর সাদা মাটির পথটি, যে-পথে আজ সে চলে যাবে, সে পথটি, অস্পষ্টভাবে একাকী বিলম্বিত: তার নিদ্রা এখনো যেন ভাঙে নি।
যে-প্রভাত এ-স্থানের ওপর অপূর্ব মাধুর্যে জড়িয়ে প্রত্যহ নাবে, যে-প্রভাত তাঁর অস্ফুট আলোয় সর্পিল নিদ্রিত পথটির নিদ্রা প্রত্যহ ভেঙে দেয়, সে প্রভাত দেখা সাঈদের আর কখনো ঘটবে না; পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের প্রভাতের অস্পষ্ট নির্মল আলোয় তার জীবনের দিনগুলো কেটে যাবে, হয়তো সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে অপরিচিত কোনো প্রভাতী ঝিরঝিরে হাওয়ায়: এ স্থানের প্রভাতের নিকট তার চিরবিদায়।
যে-প্রভাত এ-স্থানের ওপর অপূর্ব মাধুর্যে জড়িয়ে প্রত্যহ নাবে, যে-প্রভাত তাঁর অস্ফুট আলোয় সর্পিল নিদ্রিত পথটির নিদ্রা প্রত্যহ ভেঙে দেয়, সে প্রভাত দেখা সাঈদের আর কখনো ঘটবে না; পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের প্রভাতের অস্পষ্ট নির্মল আলোয় তার জীবনের দিনগুলো কেটে যাবে, হয়তো সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে অপরিচিত কোনো প্রভাতী ঝিরঝিরে হাওয়ায়: এ স্থানের প্রভাতের নিকট তার চিরবিদায়।
যে-বাড়িটার পর হতে ধু-ধু করা লতাগুলাহীন প্রান্তর আরম্ভ হয়েছে, সে-বাড়িতে নিঃশব্দ-চরণে সাঈদ প্রবেশ করলে। দোরগোড়ায়, দুটি থাবার ওপর মুখ রেখে একটা কুকুর ঝিমাচ্ছিল, সাড়া পেয়ে লেজ নেড়ে তাকে স্বাগত করল। কয়েক মুহূর্ত ওকে আদর করে, সম্মুখের বড় ঘরটিতে প্রবেশ করতেই সাঈদ গৃহকর্ত্রীর সাথে মুখোমুখি হল। কর্ত্রী হাসলেন, তাঁর স্নেহ-কোমল মুখখানি সে হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি মিষ্টি গলায় বললেন: ‘এস, বাবা, এস।’
সাঈদ তাঁর মায়াময় স্নিগ্ধ চোখের পানে চোখ মেলে তাকালে, মৃদুকণ্ঠে বললে: ‘হয়তো শুনেছেন, এখান থেকে আমার চলে যাবার সময় হয়েছে।’
‘শুনেছি বাবা। শুনে সেদিন আমার মনটা যেন কেমন করে উঠল। ... কবে যাবে?’
‘আজ।’
‘আজ?’
সাঈদ কিছু বললে না, শুধু মুখ নত করলে।
‘আজই চলে যাবে বাবা?...’ কর্ত্রী কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকলেন, তারপর: ‘মনটা কেমন করছে সাঈদ।...আমার ছেলে নেই, তুমি আমার ছেলের মতোই ছিলে। কিন্তু, তোমাকে যে এত মায়া করি সে কি আগে জানতাম?’
সাঈদ নিরুত্তর। শুধু এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ তুলে জানলা দিয়ে ধূসর বিস্তীর্ণ প্রান্তরের পানে তাকালে। রোদ তখনো চড়ে নি, তাই প্রান্তরে প্রভাতের সজলতা, স্তব্ধ নীরবতা। মাথা নত করে সে মনে মনে ভাবলে, এত সকালে আসা তার অনুচিত হয়েছে, প্রান্তরের গায়ে এখনো সজলতা, নীরবতা! ...কর্ত্রীর চোখ ছলছল করছে, অপরাধীর মতো সাঈদ অবাঙ্মুখ। তাঁর বুকে কতখানি লেগেছে সাঈদ জানে, এবং জানে বলেই তাঁর চোখের পানে তাকাতে সাহস হচ্ছে না।
কতক্ষণব্যাপী নীরবতার পর গাঢ় কণ্ঠে কর্ত্রী বললেন: ‘আল্লার কাছে দোয়া করি, যখন যেখানেই তুমি থাক না কেন, তিনি যেন তোমাকে ভালো রাখেন, তোমার জীবনে যেন উন্নতি হয়, সুখ-শান্তি হয়।’ সাঈদ একাগ্রমনে তার ব্যথায় জড়ানো কণ্ঠের কথাগুলো শুনলে। শুনে অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইল তাঁর শুভ্র-কোমল সুন্দর পা-দুখানির পানে। ভাবলে, অমন সুন্দর পায়ের ওপর যদি তার অধিকার থাকত, তাহলে সে জন্ম সার্থক হয়েছে বলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments