‘পথ বেঁধে দিল…’

প্রথম শ্রেণীর একটা ছোট কামরা।

অস্পষ্ট কোলাহলে কামালের তন্দ্রা ছুটে গেল; চোখ বুজেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে—মাদকতাপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস; অনুভব করল মাঝারি গোছের একটা নাম-না-জানা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে। ক্রমে কোলাহল ও ব্যস্ততার শব্দ ডুবে গেল রাত্রির সীমাহীন গভীর নীরবতার বুকে: যারা নাববে নেবে পড়ল, যারা উঠবে তারা উঠে পড়ল।

কামাল কান পেতে আছে: সামনের কয়েকটা অনির্দিষ্ট মুহূর্তের যে-কোনো একটা মুহূর্তে গার্ডের বাঁশি বেজে উঠবে, তার সুরের তীক্ষ্ণতা ক্ষণিকের জন্য ভরে তুলবে কালো নিষ্কম্প আকাশ, মায়াময় রহস্যময় করে তুলবে তন্দ্রাচ্ছন্ন যাত্রীদের আধ-জাগা কান, আর গাড়িতে আনবে চাঞ্চল্য ও গতি। কিন্তু হঠাৎ কামালের অপেক্ষমাণ কানদুটি সচকিত হয়ে উঠল, দরজা খোলার দ্রুত হ্যাঁচকা শব্দে। কয়েকটা মৃদু অথচ ক্ষিপ্র পায়ের শব্দ: মনে হল কে-যেন তার কামরায় উঠে দাঁড়িয়েছে; তারপর দাঁড়িয়ে থাকার নিস্তব্ধতা।

এবার কামালকে চোখ খুলতে হল এবং বিস্মিত হয়ে সে দেখল, দরজার প্রান্তে দাঁড়িয়ে এক তরুণী। তাঁর পাতলা সুঠাম দেহ জড়িয়ে লতিয়ে উঠেছে একটা অনুজ্জ্বল অথচ আকর্ষণী রঙের শাড়ি, সাধারণ ব্লাউজটাতে গায়ের রং, পায়ে ক্ষুদ্র হিলযুক্ত মসৃণ সাদা জুতো, মাথার চুল দুপাশে এলোমেলো; সিঁথির দীর্ঘ রেখাটি শুভ্র ও উজ্জ্বল, দেহময় নিঃসঙ্গতার একাকিত্বের স্নিগ্ধতা; আর চোখদুটি, কামাল বিস্মিত হয়ে দেখলে, অসংযত, ভীত ও চঞ্চল।

তরুণী বাঁ হাত দিয়ে টেনে দরজা বন্ধ করতেই ট্রেন ছেড়ে দিল।


এক নিঝুম রাতে ট্রেনের কামরায় অপরিচিত দুটি হৃদয়ের মেলবন্ধন ঘটছে এবং সহযাত্রী মি. স্যামুয়েলের এক আকস্মিক সম্বোধনে কামাল ও রাহেলা বেগমের মধ্যকার সংকোচ ও অভিনয় এক অদ্ভুত সত্যে রূপ নিতে শুরু করছে । এই ঘটনাটি তাদের মধ্যকার লৌকিক দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে এক প্রচ্ছন্ন রোমান্টিক ভবিষ্যৎ ও বন্ধনহীন গ্রন্থির দিকে ইশারা করে।


কামাল সোজা হয়ে বসল; মুখে সে কিছু বললে না, কিন্তু সমস্ত প্রশ্ন যেন তার স্থির চোখ দুটিতে পাঠ্য ও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তরুণীর ঠোঁট একবার একটু নড়ল: পলকে কামরার চতুর্দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন: ‘এ কামরায় শুধু আপনি? একা?’

‘হ্যাঁ।’ কামাল ঈষৎ মাথা নাড়লে; প্রশ্নগুলো তার চোখে আরো স্পষ্টতর হয়ে উঠল। ‘ইয়ে, দেখুন, আজ রাতটার মতো আমি এ-কামরায় থাকতে চাই। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো?’

‘অসুবিধে?’ কামাল অবাক হয়ে হাসল, ‘অসুবিধে কিসের?’ দুটি বেঞ্চ খালি... ওধারে জানালার পাশের বেঞ্চিতে তরুণী বসলেন; একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এসে তাঁর চোখদুটি স্বাভাবিক ও উজ্জ্বল করে তুলল। যেন জোর বাতাস বইল; আকাশে গুম হয়ে থাকা মেঘের দল মুহূর্তে উড়ে পালাল।

কামালের মালপত্রের ওপর তরুণী একবার হালকা চোখ বুলালেন, তারপর স্বাভাবিক দৃষ্টিতে কামালের ভাষাময় প্রশ্নময় চোখের পানে তাকালেন। তাঁর রক্তিম ঠোঁট নড়ে উঠল

‘পাশের মহিলা কামরায় ছিলুম—একা। আলোর পাশে পোকা পর্যন্ত নেই।’

‘একা বলে ভয় করছিল?’

‘হুঁ’, দ্রুতভঙ্গিতে তরুণী মাথা হেলালেন, ‘মনে হল কে যেন জানালা দিয়ে উঁকি মারল—ভীষণ তার চেহারা,’ তার স্বচ্ছ চোখে স্পষ্টভাবে ভীষণতার ছায়া পড়ল; কামাল একটু হাসল।

‘যখন ভীষণ চেহারা, ডাকাত নিশ্চয়ই হবে। কামরায় ঢোকে নি-তো?’

‘উঁহুঁ। তবে চিৎকার না করলেই হয়তো—’

‘ঢুকে পড়ত, না?’

জানালার বাইরে ঘনীভূত অন্ধকার। সে দিকে একবার তাকিয়ে কামাল বললে: ‘আপনি চলে এলেন, ডাকাতের সুবিধে হল। চুরি করতে আর বাধা দেবে না কেউ।’

‘মালপত্রের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওগুলো সে নেবে না।’

‘তবে কী নেবে? গলার ঐ হার, হাতের ঐ চুড়ি?’

এবার তরুণী উত্তর দিলেন না, শুধু মুখ টিপে হাসলেন, গূঢ় অর্থ চেপে। কামালও হাসল, ওঁর মুখের পানে চেয়ে। বললে: ‘বুঝেছি।’

কয়েক মিনিট স্তব্ধ নীরবতা প্রভুত্ব করল কামরার প্রতি কণায়, বিন্দুতে।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice