১৯১২–১৯৯৭
রণেশ দাশগুপ্ত
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
See more >>-
প্রথমে দেখা যাক, আধুনিক চিত্রকলা বলতে পারা যায় কাকে? এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তিকে ধরে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। “শেষ সপ্তক” কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতায় বলেছেন,
জগতে রূপের আনাগোনা চলেছে
সেই সঙ্গে আমার ছবিও এক একটি রূপ
অজানা থেকে বেরিয়ে আসছে জানা দ্বারে
এরা প্রতিরূপ না।
রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলিকে তাঁর এই উক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে আমরা প্রথমে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারি এবং তারপরে আধুনিক চিত্রকলার মর্ম কথাটতেও পৌঁছতে পারি। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখে যেকথা প্রথমেই মনে হয় সেটা এই যে, পঞ্চভূতের রামধনু-দুনিয়া তাঁর তুলির পোঁচে পোঁচে হয়েছে কিম্ভূত। শুধু তাই নয়, ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের গদ্য-কবিতাগুলিতে যাখন রবীন্দ্রনাথ পারিপার্শ্বিকের এবং প্রতিবেশীদের অবিকুল
-
এক
“হে প্রাচীন কাণ্ডারী মৃত্যু,
তোমার আশায় ফেনায়িত বিষের আরক
শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করতে দাও আমাদের।
আমাদের চিন্তাকে প্রদীপ্ত করতে চাই এই আগুনে
স্বর্গ হোক নরক হোক, আমরা
অতল গুহার তলায় পৌঁছতে চাই,
কী আসে যায়, অজানায়
দেখতে চাই নতুন জীবনকে, নতুন দেবতাদের।
—বদলেয়ার
‘শিল্পী অভিযাত্রা করেন অনুভূতির নতুন নতুন সমুদ্রে। জ্ঞানে যে বাস্তবলোক আয়ত্ত হয়, তার শক্ত ভূমিতল শিল্পীর পায়ের নীচে থাকে না। শিল্পী অতি অস্থির, উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
‘সৌন্দর্য’—ক্রিস্টফার কডওয়েল।
স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে সে সম্পর্কে পিসারভ লিখেছিলেন:
‘ব্যবধান একাধিক। আমার স্বপ্ন (প্রথমত) স্বাভাবিক ঘটনাস্রোতকে ছাড়িয়ে চলে যেতে পারে সামনে, কিংবা (দ্বিতীয়ত) এমন একদিকে
-
৬৮ সালের একেবারে শেষের দিকে সারা পাকিস্তানে গণতন্ত্রের দাবিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে যে মিটিং মিছিলের আন্দোলন শুরু হলো তা চরমে উঠলো ৬৯-এর জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীতে গণ অভ্যুত্থানে। শহীদের রক্তের রেখায় বাংলাদেশের মানচিত্র আলাদা করে আঁকা হয়ে গেলো।
২০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলের ওপর গুলী চললে আসাদ শহীদ হলো ৷
এই হত্যার বিরুদ্ধে ২৪শে জানুয়ারী হরতাল, মিছিল, জমায়েত করার জন্য সারা বাংলাদেশে সংযুক্ত ছাত্র সংগ্রাম কমিটি জনসাধারণকে আহ্বান করলো। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বশংবদ গভর্ণর মোনায়েম খাঁ ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রে কেন্দ্রে হরতালের বিরুদ্ধে হেঁটে হেঁটে বললেও ২৪শে জানুয়ারী সমস্ত দোকান পাট বন্ধ হলো। গাড়ীর চাকা ঘুরলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তরু
-
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের চল্লিশ বছরের চিত্র সাধনায় যবনিকা পড়ে গেল। বাঙলাদেশের এই ক্লান্তিহীন শিল্পী তাঁর কর্মক্ষেত্র ঢাকায় তাঁর সমাপ্ত ও অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের নানাধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার মাঝখানটিতে চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে পড়লেন। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসে ক্যানসার। চার বছর আগে স্ট্রোকে তাঁর জীবনসংশয় হয়েছিল। তাঁর কব্জি এবং আঙুল ভিতরে ভিতরে জখম হয়েছিল। কিন্তু অনেক কাজ পড়ে আছে এবং সাধারণভাবে বাঙলাদেশের ছবি আঁকার সাধনায় যারা নেমেছে, তাদের লড়াইকে এগিয়ে নেবার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে নিজস্ব ছবি আঁকার পদ্ধতিকে আরো কঠিন ভাবে সামলে জানতে হবে—এই তাগিদ তাঁকে সহায়তা করেছিল অরোগ্যের সংগ্রামে। তিনি জয়ী হয়েছিলেন বলা যেতে পারে। নতুন শক্তি ঢেলে তিনি ছবির পর ছবি
-
সাহিত্যের সংজ্ঞা
শিল্পী বললেই আমরা এক বিশেষ ধরনের লোককে বুঝি। কেউ পটুয়া, কেউ নট, কেউ গায়েন, কেউ বায়েন, কেউবা কবি। এরা এক বিশেষ ধরনের কাজ করে, যাকে আমরা বলি শিল্পকলা। এই শিল্পকলায় প্রকারভেদ আছে। কিন্তু সবাই এক ব্যাপারে পারদর্শী, তাই এক জাতের। এরা আমাদের মনে রঙ ধরিয়ে দেয়। আমাদের বাসনা, ভয়, ঘৃণা, আশা প্রমুখ আবেগকে সক্রিয় করে; আমাদের মানবীয় প্রবৃত্তিকে স্পর্শ করে, বইয়ে দেয় এক নতুন ধারায়। আমাদের সরু মোটা অনুভূতি নিয়ে এদের কারবার। পাথরে হোক, রঙে রেখায় অক্ষরে হোক, তারে বা টানা চামড়ায় অথবা কুমড়োর খোলে হোক, শিল্পীরা অভিন্ন এদিক দিয়ে যে এরা সবাই আমাদের প্রবৃত্তি, আবেগ ও অনুভূতিকে
-
[বহুদিন ধরেই আমাদের পরিকল্পনা চলছিল রণেশদার সাক্ষাৎকার নেওয়ার। ব্যক্তি হিসাবে যেমন বিশাল তাঁর মাপ, তেমনই সুদীর্ঘ সময়ের অগাধ, গভীর ও মূল্যবান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর জীবন। স্বাধীনতার আগে ও পরে সাত দশকের অধিককাল জুড়ে চলে তাঁর কর্মকাণ্ড। চলে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে, কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে, কখনও জেলখানার ভেতরে, কখনও বাইরে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক সর্বক্ষেত্রেই তার অবাধ ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তার সমস্ত কর্ম, ভাবনা ও সৃষ্টির মূলে একটিই স্বপ্ন, মানুষের মুক্তি। ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে নয়, অন্তরে বাহিরে যাবতীয় পীড়ন ও বন্ধন থেকে মুক্তি। এই মুক্তির সংগ্রামে তাঁর মন্ত্র ও অস্ত্র মার্কসীয় জীবনবীক্ষা, মানবিকতার সাধনায় শ্রেষ্ঠতম দর্শন। শুধুমাত্র বহু চেষ্টার
-
উনিশ শতকের রুশকথাশিল্পী ফিওদর দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে ‘উপন্যাসের তত্ত্ব গ্রহে হাঙ্গেরীর মার্কসবাদী সৌন্দর্যতত্ত্ববিদ গিওর্গি লুকাচ ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন যে, দস্তয়েভস্কি অনাগত লেখক লেখিকাদের জন্যে এক নতুন ধরনের বাস্তববাদের খসড়া রেখে গিয়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই ‘খসড়াগুলো’ সমগ্র বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রাণবন্ত ধারা হিসেবে আজও সক্রিয়। বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগের গল্পে উপন্যাসে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দি ইডিয়ট’ উদ্দাম মানবতাবাদী যৌবনের ভাবের ঘোর যুগিয়েছিল। সেই থেকে দস্তয়েভস্কির গল্প-উপন্যাস বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাকে টানে তাঁর এই পরিচিতিকে সামনে রেখে। বিশ্ব সাহিত্যে বিশেষ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দিনবদলের পালায় তাঁকে ঘিরে যে ভাবাদর্শের লড়াই চলছে সেটাই বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
দস্তয়েভস্কির কষ্টিপাথরে সাহিত্যে
-
ঢাকার বাজার ঠাঠারি বাজার।
ঠাঠারি বাজারই বটে। কানে তালা লেগে যেতো এখানে। পিতল কাঁসার বাসন তৈরী হতো। ঠন ঠন ঠাঁইঠাঁই ঠনাঠন। এই ঠনাঠনঠনের সঙ্গে তাল দিতেই বুঝিবা ঢাকা শহরের এই এলাকায় গোটা কয়েক স্টীল ট্রাঙ্ক তৈরীর ছোট ছোট কারখানা ঘর চালু হয়েছিল। ঠাঁই ঠাঁই ঠনাঠনের সঙ্গে একটা বাড়তি শব্দ যোগ হয়েছিল। চড় চড় চড়াৎ।
হারমোনিয়মের চড়া পর্দার রীড টেপার মতো গলা চড়িয়ে কথা বলার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল কারখানাগুলোর তাবৎ কর্মীদের। এই চড়া পর্দাতেই হরদম কথা বলার রেওয়াজ এমনকি খরিদ্দারদেরও। ঠন ঠন ঠাঁই ঠাঁই। চড় চড় চড়াৎ। সামনের ঘরটিতে বসে মহাজন আর তার সহকারী। খরিদ্দারেরা এখান থেকে কেনে স্টীল ট্রাঙ্ক। কয়েকটা
-
গত মহাযুদ্ধের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের) ঠিক পরবর্তী সাহিত্যের একটা বড় অংশই ছিল যুদ্ধ-সম্পর্কিত। বিষাদ, ক্ষোভ, জ্বালা ও বিদ্রোহ একটা প্রশ্নকে ঘিরে ফুলে ফুলে উঠছিল। গত মহাযুদ্ধের শ্মশানে বসে সাহিত্যিক প্রশ্ন করেছিলেন: মানুষের জীবন নিয়ে একি পরিহাস? একি রোগজীর্ণ সভ্যতা? মানুষের বিরুদ্ধে নিয়োজিত মানুষ। যে মানুষ প্রতিমুহূর্তে বিকশিত হচ্ছে, যার শত সহস্র অনুভূতি দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার অন্ধকার হাতড়ে জ্যোতির্ময় ভবিষ্যতের আশায় বলছে, মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, একটামাত্র ইস্পাতের টুকরোর আঘাতে সে যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, আর উঠবে না, আর চোখ চাইবে না। না জানি কোথায় বসন্তকাল এসেছে, তার আয়োজনে আয়োজন ভরে গিয়েছে ধরাতল! মহাসমরের অব্যবহিত পরবর্তী সাহিত্যে এই জীবন তৃষ্ণার তাগিদের
-
[১৯৯৭ সনের ১৫ই জানুয়ারী, লেনিন স্কুলে আয়োজিত তাঁর জন্মদিনে রণেশ দাশগুপ্ত শেষ ভাষণ দেন। মালবিকা চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত রেকর্ড করা সেই ভাষণের প্রধান অংশ আমরা প্রকাশ করছি।]
প্রিয় বন্ধুরা,
গতবারের মতই, কিংবা তার থেকে একটু ভালভাবে…যাকে আমরা বলি, একটু সমৃদ্ধ আকারে…আমি তো উপলক্ষ…এই যে আলোচনা…এটা আমি…প্রথম আমরা এখানে এলাম। আমি উপলক্ষ বলেই এরকম একটা সমাবেশ হল। যেটার অভাব প্রতিনিয়ত আমার মনে হয়, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা, সেই সমস্ত…বয়ঃসীমা ছাড়িয়ে, বৃদ্ধ থেকে একবারে তরুণ-তরুণী—সকলেই বোধহয় অনুভব করে যে কিছু একটা করা দরকার—যেখানে একসঙ্গে বসে—প্রগতি সাহিত্য আমি শুধু বলব না, গণসাহিত্য বলব না, বাংলার বাস্তববাদী সাহিত্য বলব না—সমগ্রভাবে বাংলার—সেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বুদ্ধদেব বসু—এঁরা সবাই
-
এক শতাব্দী আগে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর ইতালীয় অনুবাদের ভূমিকাতে এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘ইতালির শ্রমিকশ্রেণী থেকে নতুন দান্তে বেরিয়ে আসবেন।” শোষণমুক্ত সমাজের জন্যে শ্রমজীবী জনগণের লড়াই রূপের জগৎকে কিভাবে সঙ্গী হিসেবে দেখে, এঙ্গেলসের উক্তিটিতে তার ইঙ্গিত রয়েছে। এক কথায় একে বলা যেতে পারে আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপের দিশা। যেমন এর বিশালতা, তেমনি এর গভীরতা। এ শুধু ভাব নয়, এ হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্রান্ত সৃষ্টি আর কাজ ৷ দেশে দেশান্তরে যুগে যুগান্তরে মেহনতী মানুষের ‘রূপ লাগি ঝুরে মন'। তার অসংখ্য অজস্র অভিব্যক্তি। সমস্ত অবক্ষয় ও আবিলতা ও মৃত্যুকে সরিয়ে সরিয়ে ‘অভিনব ধরণী' গড়ার জন্যে মানবাত্মাকে অপরূপ রূপে সাজানো ৷ এরকমের একটি প্রেক্ষিত সামনে থাকাতে
-
‘আনা কারেনিনা,’ ‘রিসারেকসান’ এবং ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ উপন্যাসের রচয়িতা লিও টলস্টয়ের জীবনসূর্য যখন অস্তমিত-প্রায় তখন ‘অগ্নিপরীক্ষা’ উপন্যাসের রচয়িতা এলেক্সি টলস্টয়ের জীবন সূর্যের উদয়। একজনের শিল্পরূপ সাধনার যখন সমাপ্তি, তখন আরেক জনের সাধনার উপক্রমণিকা। লিও টলস্টয়ের মৃত্যু ১৯১০ সালে। এলেক্সি টলস্টয়ের জন্ম ১৮৮৩ সালের ১০ই জানুয়ারী। মৃত্যু ১৯৪৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী।
লিও টলস্টয় উনিশ শতকের, এলেক্সি টলস্টয় বিশ শতকের। “আনা কারেনিনা—রিসারেকসান—যুদ্ধ ও শান্তি'র লিও টলস্টয় উনিশ শতকের রুশ মহাজাগরণের মহাকাব্যিক উপন্যাসের শিল্পরূপকার।
‘অগ্নিপরীক্ষা'র এলেক্সি টলস্টয় বিশ শতকের রুশ মহাবিপ্লবের মহা- কাব্যিক উপন্যাসের শিল্পরূপকার।
লিও টলস্টয়ের ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ উপন্যাসের ঘটনাকাল উনিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশক। নেপোলিয়নের মস্কো অধিকার এবং মস্কো
-
ঢাকার বয়োবৃদ্ধ দিলওয়ার হোসেন মজলিশী মানুষ। তিনি শুরুতেই বলেন, আমি হালায় জাত কুট্টি।
এই শহরের হিন্দু মুসলমান মূল বাসিন্দারা কয়েকশ বছর ধরে একটা লোকভাষায় কথা বলে আসছে। এই ভাষায় যারা কথা বলে তাদের কুট্টি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানদের স্থান কুট্টিদের মধ্যে সেরা বিবেচিত হয়েছে। ঘোড়ার গাড়িগুলো উঠে গেলেও গাড়োয়ানদের চিনে নেয়া যায় কথা শুনেই। দিলওয়ার হোসেনও এক সময় ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। তিনি আজ ডালের তেজারতি করেন। তবে তাঁর গর্ব, তিনি জাত কুট্টি।
এই দিলওয়ার একদিন গল্প করতে করতে বললেন, আরেক জাত কুট্টি আছিল এলবাৰ্ট লাইব্রেরীর গোপাল বসাক। আমরা ঢাকার গাড়োয়ানরা একবার ইউনিয়ন করছিলাম। গোপাল বসাক
-
'৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের পরে তখনকার মুক্তিসংগ্রামী রাজ- নৈতিক কর্মীদের যে ধরপাকড় শুরু হয়, তার ধারাটা '৭১ পর্যন্ত প্রায় একই রকম ছিল। একবার ঢোকালে আর বের করার নাম নেই। দরকার হয়েছে বড় বড় ঠেলার। তবে জেলের দরজা খুলেছে। যেমন '৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঠেলা, '৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়ের ঠেলা, '৬২ সালের এন, ডি, এফ'এর ঠেলা, '৬৯ এর এগারো দফার ঠেলা। তারপর '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কত জেলের রাস্তা তো সদর রাস্তা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম প্রথম জেলবন্ধের সময়টা বেশী হতো। ভেতরে যারা থাকতো তারা মনে করতো সারা পৃথিবীটা নিঝুম। কবে জাগবে ছাত্র-জনতা? নোয়াখালির কৃষকনেতা মমতাজ মিঞা গাঁয়ের চেয়ারম্যান, প্রথম
-
১
শ্রমজীবীরা বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে অথবা আজ হোক কাল হোক করবে। সমস্ত মৌল অর্থনৈতিক সম্পদে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানাজারী প্রথম কাজ। শিল্পকলা সাহিত্যেরও দখল নেয়া এই কাজের অন্তর্ভুক্ত। এই একান্ত বাস্তব ও অনিবার্যভাবে সম্ভাব্য বাস্তব থেকে উদ্ভব হয়েছে সাহিত্য শিল্পকলার নতুন সংজ্ঞা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদের। এই সংজ্ঞার মূলসূত্র, শ্রমজীবী মানুষের কর্মকাণ্ড এবং ইচ্ছা ও অনুভবই সাহিত্য- শিল্পকলার চালকশক্তি।
এই সংজ্ঞার সূচনা ঐতিহাসিকভাবে সোভিয়েত অক্টোবর বিপ্লবে, কারণ এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই প্রথম শ্রমজীবীদের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা এবং সাহিত্য শিল্পকলার প্রবর্তন হয়েছে।
মায়াকভস্কির বিশেষত্ব এই যে, যাঁরা সাহিত্য শিল্পকলায় শ্রমজীবীদের দখল নেয়ার কাজে সৃজনশীলতায়
-
আমাদের এই বিংশ শতাব্দী এবং বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকাল সমাজতন্ত্রের তথা সাম্যবাদের অভ্যুদয়ের উদয়াচল। অপরদিকে এই শতাব্দী ধনিকতন্ত্রের অস্তমিত হওয়ার কাল। এই কালসন্ধিতে সর্বদেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবন ও সাধনা পরস্পরবিরোধী আকর্ষণ বিকর্ষণের লীলাভূমি হতে বাধ্য। শিল্পীচিত্রের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও সর্বজনীনতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা ও দায়িত্বশীলতা এই শতাব্দীর শুরু থেকেই নতুন কালের রসায়নের ভাণ্ডে কখনো অপূর্ব বর্ণবিভাময় নব উপাদান গড়ে তুলেছে, কখনো ধুম্রবহ্নি সমন্বিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রতিভার জন্য ডেকে এনেছে বিপর্যয়, কিংবা সৃষ্টিকে করেছে অনাসৃষ্টি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে সোভিয়েট ইউনিয়নের বোরিস পাস্তারনাক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের লেখক-জীবনের বিস্ফোরিত গতি পরিণতি এই দ্বন্দ্বের লীলাভূমিকে প্রকট করে দেখিয়েছে।
-
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও সঙ্গীত এবং সাধারণভাবে সাহিত্যসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও বহুত্বকে একটি বৃক্ষের শাখা প্রশাখা হিসাবে না দেখে একেবারে পৃথক করে করে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে আমাদের যার যার পছন্দমত বেছে নেবার একটা ঝোঁক তাঁর কাজের সামগ্রিকতাকে আড়াল করে দেয় এবং উৎকর্ষকে খণ্ডিত করে। অযৌক্তিক হলেও দুঃখের বিষয়, এটাই ঘটেছে বিশেষ করে চল্লিশের দশকে। এই বিভাজন ও তার ঝোঁকের মূলে কি কি কারণ রয়েছে এবং এদের অতিক্রম করার জন্যই বা কি কি পদক্ষেপ নেয়া, হয়েছে, আমরা এদের এখানে সংক্ষেপে খতিয়ে দেখছি এক এক করে। আমাদের মূল লক্ষ্য নজরুলের অব্যাহত ও অবিভাজ্য সত্তাটিকে প্রতিষ্ঠিত দেখা।
নজরুলের বিভাজনের জন্য হয়তো নজরুল নিজেও
-
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে।
যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে তাদের স্মৃতি তখন উড়তে শেখা পাখির বাচ্চার মতো, বুঝি তা অনন্ত ভবিষ্যতের অভিসারী। দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাছাইকরা খুনেরা যে হাজার হাজার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করেছিল তাদের বীরাঙ্গনা বলা হচ্ছে এবং তারা সামাজিকভাবে সমাদর পাচ্ছে। পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা কঙ্কাল আর করোটি সরিয়ে ফেলা হলেও সেগুলো কারও মন থেকে সরে যায়নি। ঢাকায় শহীদ মিনারের চত্বর থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গার বাঁধ পর্যন্ত রাস্তার আশেপাশে দখলদার বাহিনী আগুন লাগিয়ে যেসব এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছিল সেগুলোর অঙ্গার তখনো যেন কালো কালে৷ আঙ্গুলে শহরের আকাশকে বিঁধছে। এই অবস্থায় ৭১-এর ২৬শে মার্চের স্বাধীনতা দিবসের সমস্ত অনুষ্ঠানে ঐকান্তিকতার
-
সময়টা ছিল ১৯৪২ সাল। ঢাকা শহরের এক সামান্য দারোয়ান ছিল দ্বারভাঙ্গার গিরিধারী প্রসাদ। পটুয়াটুলির গলিতে সে কতকগুলো দোকান আর অফিসের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। পটুয়াটুলিতে রাস্তার দুপাশে দোকান আর ছোট ছোট অফিস ছিল সে সময়ে ৷ জন বসতি ছিল না। দারোয়ানরা ছিল জিম্মাদার। গিরিধারী প্রসাদ ছিল এদের একজন। অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সৎ, কিন্তু সামান্য মাইনের লোক ছিল সে।
সময়টা ছিল কিন্তু সঙ্গীন। অনেক হিসেব করে ভারতের কংগ্রেস-নেতৃত্ব ৪২ সালের ৯ই আগস্টের ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব পাশ করেছিলেন। নৈতিক দিক দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদী হিটলার মুসোলিনী তোজোর নিন্দা করেছিলেন তাঁরা ; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজের অধীনে ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাও সম্ভব নয় বলে
-
৪০ সালে ঢাকা শহরে হিন্দু মুসলমানে যে দাঙ্গা বেধেছিল, তা বছরের পর বছর তুষানলের মতো জ্বলছিল। মাঝে মাঝে সৃষ্টি হচ্ছিল দাবানলের। ধুতি আর লুঙ্গি, সিঁদুরের ফোঁটা আর বোরকাই হয়ে উঠছিল পুরুষ কিংবা স্ত্রীর পরিচয়। দুই তরফের বিত্তশালীদের সঙ্গে সঙ্গে একান্ত গরীবদের মধ্যেও এই সরঞ্জামগুলো মনের মধ্যে পরিচয়ের চিহ্ন হয়ে উঠছিল।
কলেরা আর বসন্তে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মতোই শেষ পর্যন্ত দেশভাগের চিন্তা দেশের মানুষের মনে বাসা করলো। ভাইয়ে ভাইয়ে এবং ভ্রাতৃবধূতে ভ্রাতৃবধূতে মন কষাকষি ও মুখ দেখা বন্ধের নাটকে পৃথক হবার যে পরামর্শ বিষ ফোড়ার মত সকলের মনকে টনটনিয়ে দেয় সেই পরামর্শে কান পাতলো দেশের বড় বড় বুঝদার নেতারাও। শেষ পর্যন্ত হাড়ি
-
বাংলাদেশের ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জয়ের পরে দেশের বাইরে চলে যাওয়া প্রায় ৮০ লক্ষ এবং দেশের ভিতরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধাবমান আরও ৮০ লক্ষ শরণার্থী নর-নারী-শিশুর নিজের নিজের ঘরে ফেরার পালা। হিসেব করতে গিয়ে দেখা গেলো, যারা ফিরবে না তাদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। যারা ঘরে ফিরে এলো তারা দেখলো যাদের রেখে গিয়েছিলো, তাদের মধ্যেও অনেকে নেই।
পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর মধ্যে থেকে বাছাই করা হিংস্র লোকদের নিয়ে গঠিত হানাদারদের বাহিনী ও স্থানীয় মুসলিম লীগ আর জামাতের বন্দুকধারী রাজাকাররা গ্রামের পরে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা সমেত অসংখ্য নর নারী শিশুকে নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা চরগুলোর বিরান এলাকায় জড়ো করে খুন করেছিল। প্রায়
-
৬৮-৬৯এ সারা পূর্ব বাংলা জুড়ে পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী অভ্যুত্থান হয়েছিল তা যেই মুহূর্তে জয়ী হলো প্রায় সেই মুহূর্তেই পড়ে গেলো। আইয়ুব খাঁ গেলো কিন্তু ইয়াহিয়া খাঁ এলো। আবার জারী হলো নতুন করে সামরিক শাসন। সভাসমিতি সমাবেশ মিছিল বিক্ষোভ বন্ধ করে ইসলামাবাদের হুকুমনামা জারী হলো। পূৰ্ব বাংলায় গণবিক্ষোভগুলো বরাবরই কালবৈশাখীর মতো এসে দপ্ করে থেমে গিয়েছে। ঝড় থেমে গেলে মনে হয় ঝড় কখনোবা ওঠেনি। আবার আচমকা গণবিক্ষোভ হবেই, কিন্তু যখন হবে তখন হবে। প্রকৃতি কিন্তু দেখতে না দেখতে একটা ঝড় তুললো আচমক৷৷ টর্নাডো ঘূর্ণিঝড় একটা আগুনের হল্কার মতো ছিটকে বেরিয়ে ঢাকার গা ঘেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খানিকটা ছুঁয়ে চলে গেলো।
-
যশোর জেলের নিরাপত্তা বন্দীদের দোতলা ওয়ার্ডের নীচতলায় জানালার কাছে কি যেন ঘটেছে। দূর থেকে দালাল গোছের বিশেষ সুবিধাভোগী কয়েদীরা চীৎকার করছিল। ভরদুপুর। এইমাত্র ছোট যশোর জেলে চৌকার বারান্দায় ডিউটি জমাদার সফদর আলী জুতো-মোজা-জামা ছেড়ে দুই জবরদস্ত চেহারার কয়েদীকে দিয়ে হাত-পা টেপাচ্ছিল। সে আঁতকে উঠে দাঁড়ালো খালি গায়েই কাছে রাখা রুলটা হাতে নিয়ে। যারা পা টিপছিল তারা জমাদার সাহেবকে জামা পরিয়ে দিল।
একটা ছুটোছুটি হচ্ছিল চারদিকে। কিন্তু জমাদারকে বিস্মিত করে সেই দালাল কয়েদীরা কোত্থেকে দৌড়ে এসে সামনেই নিরাপত্তা বন্দীদের ওয়ার্ডের জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। তারপর জানালার নীচে বাইরে বসে পড়া এক ছোকরা কয়েদীকে টেনে তুলে তার নাকে মুখে থাপ্পর কষতে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.


















