জাত কুট্টি

ঢাকার বয়োবৃদ্ধ দিলওয়ার হোসেন মজলিশী মানুষ। তিনি শুরুতেই বলেন, আমি হালায় জাত কুট্টি।

এই শহরের হিন্দু মুসলমান মূল বাসিন্দারা কয়েকশ বছর ধরে একটা লোকভাষায় কথা বলে আসছে। এই ভাষায় যারা কথা বলে তাদের কুট্টি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানদের স্থান কুট্টিদের মধ্যে সেরা বিবেচিত হয়েছে। ঘোড়ার গাড়িগুলো উঠে গেলেও গাড়োয়ানদের চিনে নেয়া যায় কথা শুনেই। দিলওয়ার হোসেনও এক সময় ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। তিনি আজ ডালের তেজারতি করেন। তবে তাঁর গর্ব, তিনি জাত কুট্টি।

এই দিলওয়ার একদিন গল্প করতে করতে বললেন, আরেক জাত কুট্টি আছিল এলবাৰ্ট লাইব্রেরীর গোপাল বসাক। আমরা ঢাকার গাড়োয়ানরা একবার ইউনিয়ন করছিলাম। গোপাল বসাক হইছিল প্রেসিডেন্ট। ‘দুনিয়ার মজুর এক হও’ কথাটা তার কাছে পেরথম শুনছিলাম হেইদিন। মীর্জা কাদের সর্দার লায়ন সিনেমা করছিল। হেয় ভি আছিল। গোপাল বসাক ভাষণ দিছিল কুট্টি ভাষায়। কাদের সর্দারভি দিছিল। কারে ছাইড়া কারে রাখি। দুনিয়াটারে চিনতে আরম্ভ করি এই দুই ভাষণ শুইনা। ফজলুল হক তখন কৃষক প্রজা পার্টি করছে, মীর্জা আছিল তার সঙ্গে। গোপাল বসাক করছিল লাল ঝাণ্ডার পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি। জেল খাইটা বাইরে আইছে। তার দুই বছ্‌ছর পরে আমাগো ইউনিয়নে নামায়। দিলওয়ার হোসেন বললেন বাপের বেটা এই গোপাল বসাক। কইলজাটা আছিল হাতির থ্যাকান বড়। দিলওয়ার হোসেন গোপাল বসাকের গল্প বললেন। ঢাকার ইতিবৃত্তের সঙ্গে গাছের শিকড়ের মত গাঁথা গোপাল বসাকের গল্প। দিলওয়ার হোসেন উপমা দিয়ে বললেন, মানুষের মৌত আছে, মরতে হইব। দেশ ভাগের পর ঢাকা ছাড়ছিল গোপাল বসাক। সে নাকি বাঁইচা নাই। শুনছি, মরছে ব্যারাম হইয়া। কিন্তু কুড়াল দিয়া গাছ ফালাইয়া দিলেও শিকড় থাকে। কুট্টিগো মধ্যে গোপাল বসাকেরও শিকড় রইছে। একদিন মাটি ফুইড়া জাগতে পারে, পাতা মেলতে পারে। এই ঢাকা শহরেই। বাপের বেটার লাহান কাম কইরা গেছে। একটা ঘটনার কথা বলি।

দিলওয়ায় হোসেন ঘটনাটাকে দুএক কথাতেই শেষ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি গোপাল বসাকের সঙ্গে ঢাকার চরিত্রের যে ব্যাখ্যা দিলেন, সেটা ছাড়া এই ঘটনাকে পুরোপুরি বুঝতে পারা যাবে না। গোপাল বসাকের গল্প ঢাকা শহরেরও গল্প। দিলওয়ার সাহেবের বিবরণের কুট্টি ভাষাকে চলতি বাংলায় সাজিয়ে লিখছি।

আমাদের সারা উপমহাদেশে হিন্দু আর মুসলমান অন্যান্য আরও কত ধর্মের মানুষের সঙ্গে ঢাকাই শাড়ির মত বোনা রয়েছে। একটু খোসটা লাগলেই শাড়িটা নষ্ট হতে পারে। হিন্দু আর মুসলমানকে ভাগ করে আলাদা বানাবার কথাটা কোনদিন ভাবা যায়নি। কিন্তু ৪৭ সালে ইংরেজরা ভাগ করলো, তখন মন্দের ভাল বলে অনেকে মেনেও নিল। প্রকৃতপক্ষে যমুনা যেমন ভাঙ্গে, ঠিক সেই রকম তলায় তলায় ভাঙ্গতে শুরু করেছিল। তখন ফাটল দেখেও আন্দাজ করা যায়নি, এই পর্যন্ত বলা যায়। এই ফাটল একটার পর একটা দাঙ্গা। ক্লাইভের বংশের লোকেরা যেসব জায়গা বেছে নিয়েছিল হিন্দু মুসলমানে ফাটল ধরাবার জন্যে, ঢাকা শহর হলো সেগুলোর একটি। ৪০ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় খড়কুটো জড়ো করে আগুন ধরানো হলো ঢাকাতেই। তৈরি হলো হিন্দু এলাকা আর মুসলমান এলাকা। ৪০ থেকে ৪৬ সালের মধ্যে ঢাকা শহরটা গোটা পঁচিশেক টুকরোয় ভাগ হয়ে গেল। রেসকোর্স, কোর্ট-কাচারি, ইউনিভার্সিটি আর রোজকার বাজার রইল সাধারণ এলাকা। মাত্র কয়েক বছর আগে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানরা যে ইউনিয়ন করেছিল, তার কথা মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন গোপাল বসাকের মত লোকেরা। মাঝে মাঝে জিন্দাবাহারের মইজুদ্দিন ডাক্তার আর নবাবপুরের গোপাল বসাকের দল শহরে পঁচিশ টুকরোর সীমান্তগুলোতে ছুরি মারামারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খাড়া করতে চেষ্টা করতেন। ঘোড়ার গাড়িতে লাল ঝাণ্ডা উড়িয়ে সাম্প্রদায়িক মৈত্রীর প্রচার চলতো। কিন্তু সেই সময়েই ঢাকার ঘোড়ার গাড়ির ওপর উচ্ছেদের নোটিস জারি হয়েছিল। আমদানি

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice