-
অনেক কাল আগে কিয়েভে ছিল এক প্রিন্স। আর কিয়েভের কাছেই থাকত নাগ। প্রতি বছর নাগকে ভেট দিতে হত: হয় কোনো নওল কুমার, নয় কুমারী। তারপরে তো একদিন প্রিন্সের মেয়েকে পাঠাবার পালা এল। করবার কিছু, নেই: প্রজারা পাঠিয়েছে, প্রিন্সকেও পাঠাতে হয়। নিজের মেয়েকে তাই নাগের কাছে ভেট পাঠাল প্রিন্স।
আর মেয়েটি এত সুন্দরী, এত মিষ্টি যে কাহিনীতে বলবার নয়, কলম, দিয়ে লিখবার নয়।
নাগ তার প্রেমে পড়ে গেল। একদিন মেয়েটি তাকে সোহাগ দেখিয়ে শুধাল: ‘আচ্ছা, দুনিয়ায় এমন লোক আছে যে তোমায় হারাতে পারে?’
নাগ বললে, ‘আছে, তেমন একজন আছে কিয়েভে, নিপার নদীর পাড়ে। বাড়িতে যখন আঁচ দেয়, ধোঁয়ায় আকাশ যায় ছেয়ে,
-
অতি প্রাচীন কাল থেকে পুরুষানুক্রমে লোকের মুখে মুখে চলে এসেছে নানা ধরনের লৌকিক কাহিনী, মায়াময় এক জগৎ আর তার নায়কদের নিয়ে গল্প, তাতে ঝলক দিয়েছে রসবোধ, বুদ্ধির চমক, জনসাধারণের প্রজ্ঞা। বহুযুগ ধরে কথন ছিল তার অবলম্বন, কথক এককালে তা নিজে শুনে আবার অন্যদের শোনাত। এই ‘কথন’ থেকেই এগুলির নাম হয়েছে কাহিনী...
অজস্র ইউক্রেনের লৌকিক কাহিনী, তাতে যত নায়ক আর ঘটনার ভিড়, তার কোনোটা খুবই অতীত কালের, কোনোটা আবার তত পুরনো নয়। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে এ বইয়ের পাত্রপাত্রী, সাধারণ লোকের মধ্যেকার সৎসাহসী সব মানুষদের। আনন্দ দেবে মজার মজার সব কান্ড, পশু-পাখির জ্বলজ্বলে চরিত্র। রূপকথার কাব্যমণ্ডিত নানা ছবিও দেখা যাবে,
-
বহুকাল আগে নিঝুম বনের মধ্যে দেখা দিল এক সিংহ, এমন সে জাঁদরেল আর ভয়ংকর যে একবার গর্জন করলেই সমস্ত জন্তু-জানোয়ার ভয়ে কাঁপত বেতস পাতার মতো। আর যখন শিকারে বেরত, সামনে যে পড়ত, তাকেই কামড়ে কুটিকুটি করত। বনশুয়োরদের পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে মেরে ফেলত, আর খাবার জন্যে রাখত কেবল একটাকে। ভারি ভয় পেয়ে গেল জন্তুরা, ভেবে পায় না কী করে। সবাই জুটল পরামর্শ করতে।
ভালুক তখন বললে: ‘শোনো, মশাইরা, এমন দিন যায় না যে সিংহ গোটা দশেক করে জন্তু না মারে, কখনো কখনো বিশটাও। আর খায় কেবল একটা-দুটো, বাকিগুলো খামকা মরছে, কেননা রোজ সে নতুন নতুন ধরছে, আগের দিনে মারা জন্তু
-
লেখক: ইগর স্তকমান
মানুষের জীবন... তার সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয় আজেরবাইজানের সমসাময়িক ছোট গল্পের এই সংকলনটি। সংকলনটি থেকে আমরা জানতে পারি মানুষের জীবন আসলে কি, কেমন করে তা অতিবাহিত হয়, কেমন করে গড়ে ওঠে, আর যেন হঠাৎ তার বহুদিনের পথ পরিবর্তন করে নতুন পথে চলতে থাকে।
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এমন ঘটনা ঘটে মোটেই ‘হঠাৎ’ নয়... মানুষের ভাগ্য যেন নদীরই মতন। প্রায়ই সে আঁকাবাঁকা খামখেয়ালী, কিন্তু তার গতি আর নদীগর্ভ নির্দ্ধারিত হয় প্রধান এক নিয়ম অনুসারে যা আমাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
দয়া, ভালবাসা যে মানুষে মানুষে এক অদৃশ্য কিন্তু দৃঢ়, অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে; মানুষের বিবেক যে তাকে হারিয়ে যেতে
-
সে অনেককাল আগের কথা, ভয়ংকর এক নাগ হানা দিতে লাগল এক বসতিতে। সবাইকে সে খেয়ে উজাড় করল, রইল শুধু এক বুড়ো।
নাগ ঠিক করল, ‘তা এটাকে কাল খাওয়া যাবে।’
এইসময় কাঙাল এক ছোকরা যাচ্ছিল বসতি দিয়ে। গিয়ে তো উঠল সেই বুড়োর কাছে, রাত কাটাতে চাইল সেখানে।
বুড়ো শুধায়, ‘জীবনে তোর ঘেন্না ধরে গেল নাকি?
‘কেন?’ বলে সেই কাঙাল ছোকরা।
বুড়ো তখন তাকে বলতে লাগল যে নাগ সেখানকার সবাইকে খেয়ে উজাড় করেছে, কাল তাকে খাবার কথা ভাবছে।
ছোকরা বললে, ‘ও কিছু, না, নিজেই গলায় ঠেকে মরবে।’
সকালে তো উড়ে এল নাগ, ছোকরাকে দেখে ভারি তার আনন্দ : “মন্দ নয় তো! ছিল
-
লেখক: মামেদকুলিজাদে (১৮৬৬-১৯৩২)
[বর্তমান আজেরবাইজান সাহিত্যের পথপ্রদর্শক, প্রাচ্যের সুপরিচিত পত্রিকা ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিনের’ স্রষ্টা ও সম্পাদক। তিনি রেখে গেছেন অমূল্য সাহিত্যসম্পদ ছোট গল্প, হাস্যরসিক প্রবন্ধ, বড় গল্প (‘হারিয়ে যাওয়া গাধা’ ইত্যাদি), নাটক (‘লাশ’, ‘কেমান্চা’ ইত্যাদি), উপন্যাস ‘দানাবাশা গ্রামে’ ইত্যাদি। এখন পর্যন্তও আজেরবাইজানের শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প লেখক বলে স্বীকৃত। তীব্র সামাজিক বিরোধ হল তাঁর ছোট গল্পগুলির মূল বিষয়। ছোট গল্পগুলি সংক্ষিপ্ত, ভাবগর্ভ। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ছোট গল্প ‘ডাকবাক্স’—এক গরীব কৃষকের সম্বন্ধে হাস্যকর, বিষণ্ণ গল্প।]
সে দিনটা ছিল বারই নভেম্বর। শীত বেশ পড়েছে কিন্তু বরফ পড়া এখনও আরম্ভ হয় নি।
ডাক্তারবাবু ভেলি-খানের অসুস্থা স্ত্রীকে আর একবার বেশ ভাল করে পরীক্ষা করে বললেন যে
-
লেখক: হুসেন আবাসজাদে (জন্ম: ১৯২২)
[সাহিত্যিক জীবনের শুরু কবি হিসাবে, কিন্তু সুপরিচিতি লাভ করেন গদ্যলেখক হিসাবে। পিতৃভূমির মহাযুদ্ধে সোভিয়েত জনগণের কীর্তিকাহিনী রূপায়িত হয়েছে তাঁর ‘জেনারেল’, ‘মুসি আবেল, আপনি কে?’, ‘কারাদাগের ঘটনা’ প্রভৃতি সাহিত্যরচনায়। ‘জলাবর্ত’ উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে একটা বিরাট সময়ের ছবি প্রায় শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত। এতে দেখান হয়েছে নতুন জীবনের ঘূর্ণাবর্তে প্রতিটি মানুষের জড়িয়ে পড়ার অনিবার্যতা, এমনকি যারা খুব সক্রিয় নয় তাদেরও। সাধারণ শ্রমিকদের চরিত্রগুলি চমৎকার পরিস্ফুট হয়েছে তাঁর ‘সুপারিশ’ উপন্যাসে এবং এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ‘মানুষের নাম’ ছোট গল্পে।]
ওয়াহিফ স্ট্রীটে পিরভের্দি ট্রলিবাস থেকে নামল। রেইনকোটের পকেট থেকে ঠিকানা-লেখা-কাগজটা বার করল, কাছের বাড়ীটার নম্বর দেখল। ঠিক আছে।
-
বন দিয়ে চলেছে দাদু, পেছন পেছন কুকুরটা। যায়, যায়, যায়—দস্তানাটি ওদিকে পড়ে গেল। ছুটে এল নেংটি ইঁদুর, দস্তানার ভেতর ঢুকে বললে: ‘এখানে থাকব আমি।’
এইসময় তিড়িক তিড়িক—এল ব্যাঙ। জিগ্যেস করলে: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর। কিন্তু তুমি কে?’
‘তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ। আমাকেও ঢুকতে দাও!’
'এসো।’
হল ওরা দুজন। ছুটছিল খরগোশ, দস্তানার কাছে এসে জিগ্যেস করলে: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর, তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ। কিন্তু তুমি কে?’
‘আর আমি দৌড়-খোশ খরগোশ। আমাকেও ঢুকতে দাও!’
‘এসো।’
হল ওরা তিনজন। ছুটে আসে শেয়ালি: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর, তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ আর দৌড়-খোশ খরগোশ। কিন্তু তুমি কে?’
-
এক-যে ছিল শেয়ালি, নিজের একটা ঘর বানাল সে। ঘরটা বানিয়ে না সেখানেই দিন কাটাতে লাগল। তারপরে তো ঠাণ্ডা পড়ল। ঠাণ্ডায় শেয়ালি জমে যায়, গাঁয়ে ছুটে গেল আগুন আনতে। এল এক বুড়ির বাড়িতে,
বলে: ‘কুশল গো দিদিমা! পরবের দিন, মঙ্গল হোক তোমার। আমায় একটু আগুন দাও, উপকারের শোধ দেব।’
‘তা বেশ শেয়ালি দিদি। বসো, গরম হয়ে নাও, আমি ততক্ষণ চুল্লি থেকে পিঠেগুলো নামাই গে।’
আর বুড়ি তো সেঁকছিল মসলাদার পিঠে। চুল্লি থেকে নামিয়ে সেগুলো টেবিলের ওপর রেখে জুড়তে দিল। শেয়ালির চোখ ওদিকে বড়োসড়ো লালচে রংধরা পিঠেটার দিকে। খপ্ করে নিয়েই, বাস... ভেতরকার পুরটা খেয়ে ফেলে তার জায়গায় যতসব আবর্জনা ঢুকিয়ে তার
-
ছিল একটা লোক, ছিল তার একটা বেড়াল, কিন্তু এতই বুড়ো যে ইঁদুর ধরতে পারত না। বাড়ির কর্তা ভাবলে, ‘এ বেড়াল দিয়ে আমার কী হবে? নিয়ে যাই, বনে ছেড়ে দিয়ে আসি।’ তাই নিয়ে গেল।
আমাদের বেড়ালটি ফারগাছের তলে বসে বসে কাঁদে। ছুটে আসে শেয়ালি দিদি শুধোয়: ‘তুমি কে গা?’
বেড়াল তার লোম ফুলিয়ে বললে: ‘হুঁ-হুঁ-হুঁ, আমি রায়বাহাদুর মার্জারচাঁদ!’
এমন গণ্যমান্য এক মহাশয়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় ভারি আনন্দ হল শেয়ালির। বললে: ‘আমায় বিয়ে করো। ভালো বৌ হব আমি। খাওয়াব তোমায়।’
‘বেশ,’ বেড়াল বললে, ‘তা বিয়ে করা যাক।’
কথাবার্তা হয়ে গেল, শেয়ালির বাড়িতে থাকতে লাগল তারা ৷
সবরকমে শেয়ালি তোয়াজ করত তার: কখনো
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর ঝুড়ি। তাদের ছিল একটা ছাগল আর একটা ভেড়া। ছাগল আর ভেড়ার মধ্যে ভারি ভাব: যেখানে ছাগল, ভেড়াও সেখানে; শবজি ভুঁইয়ে ছাগল ঢুকল বাঁধাকপি খেতে, ভেড়াও; ছাগল গেল বাগানে, ভেড়াও তার পেছু পেছু।
বুড়ো বললে, ‘আহ্,, পারি না গিন্নি—ছাগল, ভেড়াকে খেদাতে হয়, নইলে আমাদের শবজি ভুঁইও থাকবে না, বাগানও থাকবে না! ... এ্যাই, ভাগ তো, তোদের টিকিও যেন আর না দেখি!’
তা ছাগল আর ভেড়া একটা বস্তা বানিয়ে নিয়ে চলে গেল।F
যেতে, যেতে, যেতে দেখে মাঠের মধ্যে পড়ে আছে একটা নেকড়ের মাথা। ভেড়া তো তাগড়াই, কিন্তু সাহস তেমন নেই, আর ছাগল বেশ সাহসী। কিন্তু নেই তেমন একটা
-
তীরের কাছে ভাসছিল মরাল। ঘাড় বাঁকিয়ে সে জল দেখছিল। কাছেই ছিল একটা বোয়াল মাছ। মাছটা জিগ্যেস করলে: ‘আচ্ছা বলো তো, নদী জমে গেলে তুমি কোথায় উড়ে যাও?’
‘তা জেনে তোমার কী লাভ?’
‘শীতকালে কোথাও পালিয়ে থাকতে চাই। নইলে জমা বরফের তলে তাজা বাতাস থাকে না, দম আটকে মরি।’
‘শীতকালে আমি উড়ে যাই গরম দেশে, বসন্ত পর্যন্ত সেখানে থাকি।’
বোয়াল বললে, ‘আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।’
‘তা বেশ! যদি চাও, একসঙ্গেই উড়ে যাব। সঙ্গী থাকলে ভালোই কাটবে।’
কথাবার্তাটা কানে গেল চিংড়ির। বললে: ‘আমাকেও সঙ্গে নাও।’
‘তা বেশ! তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে, আনন্দে কাটবে। শরৎ পর্যন্ত এখানে থাকব, বলব কখন উড়ে যেতে হবে।’
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.