তুষার মূর্তি

লেখক: আনোয়ার মামেদহানলি (জন্ম: ১৯১৩)

[সোভিয়েত আজেরবাইজানের বয়োজ্যেষ্ঠ লেখক। প্রথম বড় গল্প ‘জলাবর্ত’ প্রকাশ করেন ১৯৩৪ সালে। এরপর প্রকাশিত হয় তাঁর ছোট গল্প সংকলনগুলি ‘বাকুর রাত্রি’, ‘শপথ’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ ইত্যাদি, নাটক ‘প্রাচ্যের প্রত্যুষ’, ‘আগুন’, প্রহসন ‘শিরবানের সুন্দরী’, ‘আইনা’, ‘বখতিয়ার’, ‘আপেল গাছ’, ‘লায়লা মজনু’ প্রভৃতি ফিল্মের চিত্রনাট্য। আনোয়ার মামেদহানলির গদ্যরচনা সূক্ষ্ম লিরিক, চড়া রোমান্টিকতা আর জীবনের বাস্তব সত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। আকারে ছোট ‘তুষার মূর্তি’ গল্পটিতে তাঁর লেখনীর অনেকগুলি বৈশিষ্ট্যই বর্তমান।]

একচল্লিশ সালের শীতকাল। কনকনে ঠাণ্ডা রাত। মনে হচ্ছিল যেন চারদিকের জীবিত মৃত সবকিছুই বরফে ঢাকা পড়ে জমে গেছে।

এই রকম এক ইউক্রেনের সীমাহীন তুষার ঢাকা মাঠের ওপর দিয়ে চলেছে একটিমাত্র ছায়া। একটি যুবতী মেয়ে তার শিশুকে বুকে চেপে ধরে ছুটে চলেছে কোথায় যেন। ফ্যাসিস্টরা তাদের গ্রাম দখল করে নিয়েছে তাই সে পূর্ব দিকে ছুটে চলেছে নিজের সম্মান আর শিশুকে রক্ষা করার জন্য।

সামনেই নদী, তার ওপর দিয়েই ফ্রন্ট-লাইন গেছে। সেখান থেকে সোভিয়েতদের কামানের আওয়াজ আসছে।

মেয়েটি খুব তাড়াতাড়ি চলেছে, যাই ঘটুক না কেন তাকে নিজের দেশের লোকদের কাছে পৌঁছতেই হবে। নদীর ওপারে স্বাধীন ও মহান ভূমিতে তার শিশুকে পৌঁছে দিতেই হবে। সে আজ এই হিমশীতল রাতে মরে গেলেও কিছু না, তার সামনে পবিত্র উদ্দেশ্য: তার প্রথম প্রেমের স্মৃতিকে রক্ষা করা।

মেয়েটি দীর্ঘ ক্লান্তিহীন পথ চলেছে তো চলেছেই। কিন্তু তুষার ঢাকা এই মাঠগুলির শেষ নেই, সীমা নেই। ক্রমশ তার শক্তি ফুরিয়ে আসছে। কনকনে ঠাণ্ডা যেন তার দেহটাকে ছুরি দিয়ে কাটছে। হঠাৎ তার মনে হল যেন তার কোলের শিশুটি ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। সে চারিদিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে একটু আশ্রয় খাঁজতে থাকে, যেখানে বাচ্চাটার গায়ে গরম কাপড় আর একটু ভাল করে জড়িয়ে নেয়া যায়। ঐ যে সামনে দুটো কালো ছায়া দুটি কাছাকাছি বেড়ে ওঠা গাছ। একটুখানি হাঁফ ছাড়ার জন্য সে ঐ গাছগুলির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় মাত্র এক মুহূর্তের জন্য।

আর শক্তি নেই তার। হিমশিখা অগ্নিজিহ্বা দিয়ে তার মুখমণ্ডল অবলেহন করছে। মায়ের হৃদয় কেবল এই ভয়ঙ্কর কথা ভাবছে: ‘আমার ছেলে জমে যাচ্ছে! ও এতটা ঠান্ডা সহ্য করতে পারবে না।’

এই ভয়ঙ্কর ভাবনাটাকে সে তাড়াবার চেষ্টা করছে।

না! না! শত্রুর থাবা থেকে বাঁচিয়ে আনা তার সন্তানকে সে হিমশীতল আলিঙ্গনে সঁপে দেবে না। সারা পৃথিবী, জীবন জমে বরফ হয়ে যাক, সে তার হৃদয়ের উত্তাপে তার সন্তানকে উষ্ণতা দেবে...

সে নিজের গায়ের থেকে উলের জ্যাকেটটা খুলে সন্তানের গায়ে জড়িয়ে দেয় ভাল করে... মুহূর্তগুলো কাটছে আর তার মনে হচ্ছে যেন মাস কাটছে, বছর কাটছে, অনন্তকাল কেটে যাচ্ছে। হিম যেন আতপ্ত লৌহশলা দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকে।

আবার মায়ের মনে হল যেন জমে যাচ্ছে, কাঁপছে তার সন্তান, সে নিজে না।

সে নিজের মাথায় জড়ান পশমের শালটা খুলে ছেলের গায়ে জড়িয়ে দেয়। এবারে শীতে মা আরো অসহায় হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে যে তার শেষ সময় এগিয়ে আসছে, সে জমে যাচ্ছে। আর একটুও শক্তি নেই তার।

সে নিজের গায়ের থেকে সোয়েটারটা খুলে ছেলের গায়ে জড়িয়ে দেয় তাকে আরো উষ্ণতা দেবার জন্য। সে তো মরতেই চলেছে, ছেলে যেন বেঁচে থাকে। মাকে তার সন্তানকে বাঁচাতেই হবে। শেষ শক্তি সঞ্চয় করে পূর্ণ মাতৃস্নেহে সে সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে: ‘আর কোন কিছু দিয়েই তো তোকে উষ্ণতা দিতে পারি না, বাছা আমার, কেবল হৃদয়ের উষ্ণতা ছাড়া! এই হৃদয়ের শেষবারের স্পন্দন পর্যন্ত সবটুকু উষ্ণতাই দেবো তোকে।’

চুপ করে যায় মেয়েটি, তার কানে তারের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice