বিশ্ববাসীর প্রতি
বাঙলা দেশ যুদ্ধে লিপ্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশবাদী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জন ছাড়া তার সামনে আর কোন বিকল্প নেই।
পাকিস্তান গভর্ণমেন্ট বাঙলা দেশে তাদের গণহত্যার যুদ্ধকে ধামাচাপা দেবার উদ্দেশ্যে মরীয়া হয়ে ঘটনাকে বিকৃত করে দেখাবার চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় বিশ্ববাসীর কাছে খুলে বলা দরকার কোন অবস্থা দ্বারা তাড়িত হয়ে বাঙলা দেশের শান্তিকামী জনসাধারণ তাঁদের ন্যায়সংগত আশা-আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের জন্যে সংসদীয় রাজনীতি ছেড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ধরতে বাধ্য হয়েছে।
ছয়-দফা কর্মসূচী
পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার শেষতম প্রয়াসে আওয়ামি লিগ পাকিস্তানের মধ্যে বাঙলা দেশের স্বায়ত্তশাসনের ছয়-দফা কর্মসূচীর উপস্থিত করেছিল আন্তরিকতার সঙ্গেই। ঐ ছয়-দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে লড়ে আওয়ামি লিগ ৩১৩ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের বাঙলা দেশের জন্য নির্দিষ্ট ১৬৯টি মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে। নির্বাচনের এই জয় এত চূড়ান্ত রকমের জয় ছিল যে প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৮০টি-ই তাঁরা পেয়েছেন। এই চূড়ান্ত জয় জাতীয় পরিষদেও তাদের দেয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
নির্বাচনোত্তর কাল ছিল আশার কাল। কেননা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ইতিপূর্বে আর কখনও জনসাধারণ এত স্পষ্টভাষায় তাদের রায় ঘোষণা করে নি। পাকিস্তানের উভয় শাখাতেই ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যে এইরকম একটা ধারণা হয়েছিল যে ছয়-দফার ভিত্তিতে কাজ চলার উপযোগী একটি সংবিধান রচনা করা সম্ভব হবে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি সিন্ধু ও পাঞ্জাবে প্রধান দলরূপে আত্মপ্রকাশ করে। নির্বাচনী প্রচার অভিযানে তারা ছয়-দফার প্রশ্নটি উত্থাপন করে নি। অতএব এর প্রতিরোধ করার জন্যও নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে তারা কোন দায়ে আবদ্ধ নয়। বেলুচিস্তানের প্রধান পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি (ন্যাপ) ছয়-দফার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ঘোষণা করেছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও, প্রাদেশিক পরিষদের প্রধান দল 'ন্যাপ'ও সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বায়ত্তশাসনের আদর্শে বিশ্বাসী। নির্বাচনের ফলাফলে, যাতে দেখা যায় প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলি পরাজিত হয়েছে, তাই পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হবার যথেষ্ট কারণ ছিল।
রাজনৈতিক আলোচনা
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের প্রস্তুতিপর্বে আশা করা গিয়েছিল রাজনীতি-ক্ষেত্রের প্রধান দলগুলির মধ্যে আলাপ-আলোচনা হবে। পরিষদ অধিবেশনের প্রস্তুতি হিসাবে আওয়ামি লিগ সর্বদাই প্রস্তুত ছিল অন্যান্য দলের কাছে নিজেদের সাংবিধানিক ধারণা ব্যাখ্যা করতে এবং তাদের বিকল্প প্রস্তাব আলোচনা করতে। তাদের বিশ্বাস ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গি দাবি করে গোপন আলোচনায় নয়, জাতীয় পরিষদেই সংবিধান নিয়ে বিতর্ক হবে এবং সেখানেই তা চূড়ান্ত রূপ পাবে। এই উদ্দেশ্যেই তারা জাতীয় পরিষদের আশু অধিবেশন দাবি করে আসছিল। আশু অধিবেশন হবে প্রত্যাশা করেই আওয়ামি লিগ দিবা-রাত্র পরিশ্রম করে ছয়-দফার ভিত্তিতে একটি সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করছিল এবং এই ধরনের একটি সংবিধান রূপায়ণের সমস্ত রকমের তাৎপর্য যথোচিত ভাবে বিবেচনা করে দেখছিল।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এই অধিবেশনে জেনারেল ইয়াহিয়া নিজেদের কর্মসূচীর প্রতি আওয়ামি লিগের আনুগত্য কতটা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেন এবং তাদের কাছে থেকে এই আশ্বাস পান যে এই কর্মসূচীর তাৎপর্য সম্পর্কে তারা পুরোপুরি অবহিত। ইয়াহিয়া কিন্তু সংবিধান সম্পর্কে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করেন না এবং এ সম্পর্কে সমস্ত প্রত্যাশা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া এইরকম একটা ধারণা দেন যে ছয়-দফার মধ্যে গুরুতর আপত্তি করার মতো তিনি কিছু খুঁজে পান নি, তবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি'র সঙ্গে সমঝোতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
এর পরের দফায় আলোচনা চলে ২৭ জানুয়ারি ১৯৭১ তারিখ থেকে ঢাকায়, পিপলস্ পার্টি ও আওয়ামি লিগের মধ্যে। সেখানে শাসনতন্ত্র সম্পর্কে আলোচনার জন্য মি. ভুট্টো ও তাঁর সঙ্গীরা আওয়ামি লিগের সঙ্গে অনেকগুলি বৈঠক করেন।
ইয়াহিয়ার মত মি. ভুট্টোও শাসনতন্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে নিজস্ব কোন সুনিদিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে আসেন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments