বাংলা অ্যাকাডেমি
দ্রাবণের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে, অতিরিক্ত দ্রব্যকে তলানি হিসেবে পড়ে থাকতে হয়। কোনো সংবাদ শুনে মন আন্দোলিত হওয়ারও তেমনি একটা মাত্রা আছে, তারপর ভোঁতা মনে দুঃসংবাদ অথবা সুসংবাদ কোনোটাই তেমন সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় না। সীমান্তের ওপার থেকে আরো হাজারো দুঃসংবাদের মতো খবর এসেছে যে, সকল গণআন্দোলনের অনুপ্রেরণা ও শত স্মৃতিমাখা ঢাকার শহীদ মিনারটি ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ধ্বংস করেছে, ধ্বংস করেছে ভাষা আন্দোলনের অন্য আর একটি স্মৃতি বাংলা অ্যাকাডেমিকে। ১৯৬২ সালের ভাষা আন্দোলনের দুটি অক্ষয় স্মৃতিকে এমন পাষণ্ডের মতো বিনষ্ট করার বর্বরতা ও নির্লজ্জতা দখলদারি সৈন্যরা দেখাতে পেরেছে অনায়াসে। আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ইয়াহিয়া যে কোনো নীচতার আশ্রয় নিতে পারে। সুতরাং শহীদ মিনার এবং বাংলা অ্যাকাডেমি ধ্বংস করাটা সে পুরোনো ছকের মধ্যে পড়ে গেছে এর মধ্যে নূতনত্ব যেটুকু সে কেবল সৈন্যদের বর্বরতা ও দুঃসাহস বরং ধ্বংস না করলেই বোধহয় পাক সৈন্যোচিত হতো না; আমরা বিভ্রান্ত হতুম।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পূর্ববাংলাকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন ও শোষণ করার জন্যে মহম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর পারিষদবৃন্দ পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তানের দুর্বল যোগসূত্রকে সবল এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বহু শতাব্দীর দৃঢ় যোগসূত্রকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তথা বাংলা সংস্কৃতিকে নির্মূল করার নানা সুচিন্তিত পরিকল্পনা উদ্ভাবন করেছেন। পাকিস্তানের অধিকাংশ জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদাদানে অস্বীকৃতি জানালে প্রথমে ১৯৪৮ ও পরে ১৯৫২ সালে দুটি ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সমগ্র পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার বাধ্য হলেন বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার সম্মান দিতে ১৯৫৪ সালে জনগণের দাবির স্বীকৃতি স্বরূপ মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের সরকারী বাসভবন বর্ধমান হাউজে স্থাপিত হয় বাংলা অ্যাকাডেমি আর মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গনে স্থাপিত হয় শহীদ মিনার যদিও শহীদ স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্যে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবু পরবর্তীকালে এ মিনার শুধু ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকেনি, বরং প্রতীক হয়েছে সকল ন্যায় আন্দোলনের সকল আন্দোলনের কালেই শহীদ মিনার উদ্দীপনা জুগিয়েছে সংগ্রামী জনতার অন্তরে এবং শহীদদের স্মৃতি ক্রমে মর্মর মিনার থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে আপামর মানুষের হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে। তাই আজ শহীদ মিনারকে ধূলিসাৎ করেও শহীদদের অক্ষয় স্মৃতিকে অথবা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসাকে মুছে ফেলা যাবে না।
শহীদ মিনারের মাধ্যমে যেমন শহীদদের স্মৃতিকে চিরজাগরুক করে রাখার চেষ্টা হয়েছে, তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি বিকাশের জন্যে স্থাপিত হয়েছিল বাংলা অ্যাকাডেমি অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য যে, সরকারী সাহায্যে পরিচালিত হয়েছে বলে বাংলা অ্যাকাডেমি সর্বদা জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দেয়নি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির নামে অ্যাকাডেমি যে সব কর্মসূচী অনুসরণ করেছে তার মধ্যে পাকিস্তানের মৌল আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
তাই যদিও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সামগ্রিক উন্নয়ন বাংলা অ্যাকাডেমির লক্ষ্য বলে কথিত হয়েছে তথাপি দেখা যাবে, বাংলা অ্যাকাডেমি বাংলা সাহিত্য বলতে পূর্ব বাংলার সাহিত্যকে কিংবা বিভাগপূর্ব বাংলার মুসলিম সাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্যকে বুঝেছে এর ফলস্বরূপ অ্যাকাডেমি গবেষণাকার্য পরিচালনা করেছে মধ্য যুগের কিংবা উনবিংশ শতকের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে অথবা আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলে যার পৃষ্ঠপোষকতা অ্যাকাডেমি করেছে তা একান্তভাবেই পূর্ববঙ্গীয় লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার যে কাজ অ্যাকাডেমি করেছে তা আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় সংকীর্ণতামুক্ত মনে হলেও সুবিচারে দেখা যাবে তার নীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে আঞ্চলিকতা অথবা ধর্মীয় বিবেচনার দ্বারা।
কিন্তু এ সব সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, মধ্যযুগ নিয়ে যে ব্যাপক ও গুরুতর গবেষণার গোড়াপত্তন অ্যাকাডেমি করেছে তার কোন তুলনা পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে আদৌ থাকলেও বিরল। এনামুল হক,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments