মার্কসবাদ ও বিউপনিবেশায়ন সম্বন্ধে দশটি থিসিস
[২০২২ সালের জুলাই মাসে, ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এর পরিচালক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বিজয় প্রসাদ ইনস্টিটিউটের চলমান কাজের ওপর ভিত্তি করে সেখানে একটি বক্তৃতা দেন। ডসিয়ার নং ৫৬, মার্কসবাদ ও বিউপনিবেশায়ন সম্বন্ধে দশটি থিসিস, সেই বক্তৃতার মূল ভাবনাগুলোকে ধারণ করেছে এবং সেগুলোকে আরও বিস্তৃত করেছে।]
এক. ইতিহাসের সমাপ্তি
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটে ১৯৯১ সালে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৈশ্বিক দক্ষিণে (গ্লোবাল সাউথে) এক ভয়াবহ ঋণসংকট—যার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৮২ সালে, মেক্সিকোর ঋণখেলাপি হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই দুটি ঘটনা—সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ‘তৃতীয় বিশ্ব প্রকল্প’-এর দুর্বলতা—কে কাজে লাগিয়ে ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং মার্কিন-পরিচালিত বিশ্বায়ন প্রকল্প প্রবল আঘাত হানে। বামপন্থীদের জন্য এটা ছিল দুর্বলতার দশক, কারণ আমাদের বামপন্থী ঐতিহ্য ও সংগঠনগুলো আত্মসংশয়ে ভুগছিল এবং বিশ্বব্যাপী নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান সহজে এগিয়ে নিতে পারেনি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শীরা বলছিল—ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে; সামনের একমাত্র পথ হলো মার্কিন প্রকল্পের অগ্রগতি। সোভিয়েত নেতৃত্বের আত্মসমর্পণের ফলে বামপন্থীরা যে শাস্তি পেল, তা ছিল গুরুতর—এর ফলে কেবল বহু বামপন্থী দলই বিলুপ্ত হয়নি, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে মার্কসবাদী চিন্তার স্পষ্টতা সম্পর্কে আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুই. চিন্তাধারার সংঘাত
১৯৯০-এর দশকে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর দেশবাসীকে আহ্বান জানান একটি “চিন্তাধারার সংঘাত (battle of ideas)”-এ অংশগ্রহণ করতে, যে শব্দবন্ধটি কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসেরজার্মান ভাবাদর্শ(১৮৪৬) থেকে নেওয়া।[১]কাস্ত্রোর অভিপ্রায় ছিল—বামপন্থীরা যেন নব্য-উদারনীতির উত্থান দেখে ভীত না হয়; বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে দেখায় যে, নব্য-উদারনীতিবাদ মানবজাতির মৌলিক সংকটগুলোর কোন সমাধান দিতে অক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুধার বিষয়টাই ধরা যাক: পৃথিবীতে ৭.৯ বিলিয়ন মানুষ বাস করে, অথচ খাদ্য মজুত রয়েছে ১৫ বিলিয়নের জন্য; তবুও প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন খাবারের জন্য সংগ্রাম করে। এই বাস্তবতাকে সমাধান করা সম্ভব কেবল সমাজতন্ত্র দিয়েই, কোন দাতব্য ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে নয়।[২]“চিন্তাধারার সংঘাত” বলতে বোঝানো হয় যে, আমাদের সময়ের সংকটের সংজ্ঞা এবং তা সমাধানের পথ যেন পুঁজিপতিদের উপর ছেড়ে না দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন এবং সমাধান হাজির করতে হবে। যেমন, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে বক্তৃতাকালে কাস্ত্রো আবেগের সঙ্গে “মানবাধিকার (human rights)” ও “মানবতা (humanity)”র ধারণা সম্পর্কে বলেছিলেন:
মানবাধিকারের কথা প্রায়শই বলা হয়, কিন্তু মানবতার অধিকারের কথাও বলা প্রয়োজন। কেন কিছু মানুষকে খালি পায়ে হাঁটতে হবে, যাতে অন্যরা বিলাসবহুল গাড়িতে ভ্রমণ করতে পারে? কেন কিছু মানুষকে মাত্র ৩৫ বছর বাঁচতে হবে, যেখানে অন্যরা ৭০ বছর বাঁচে? কেন কিছু মানুষকে নিদারুণ দারিদ্র্যে থাকতে হবে, যাতে অন্যরা অতিমাত্রায় ধনী হয়? আমি সেইসব শিশুদের হয়ে বলছি, যাদের কাছে এক টুকরো রুটিও নেই। আমি সেইসব অসুস্থ মানুষের হয়ে বলছি, যাদের ওষুধ নেই। আমি তাদের হয়ে বলছি, যাদের জীবন ও মর্যাদার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।[৩]
কাস্ত্রো যখন ১৯৯০-এর দশকে “চিন্তাধারার সংঘাত”-এর প্রসঙ্গ ফের আলাপ তুললেন, তখন বামপন্থীরা দুটি প্রবণতার মুখোমুখি হয় (যারা পরস্পর সম্পর্কিত), যা আজও আমাদের সময়ে ভাবাদর্শগত জটিলতা তৈরি করে চলেছে—
১.উত্তর-মার্কসবাদ (Post-Marxism). এই মতবাদ বলল, মার্কসবাদ অতিরিক্তভাবে “মহা-বয়ান” (grand narratives)-এর ওপর নির্ভরশীল, যেমন—পুঁজিবাদ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর অপরিহার্যতা। এর বিপরীতে বলা হলো, টুকরো টুকরো খন্ড গল্পগুলোই নাকি বাস্তবতা বোঝার জন্য বেশি কার্যকর। ফলে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকের রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের সংগ্রামকে আরেকটি ভুয়া “মহা-বয়ান” হিসেবে বাতিল করা হলো, আর এনজিওধর্মী খণ্ডিত রাজনীতিকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হলো। এভাবে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments