স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা
নিবেদন
৭১২ খৃষ্টাব্দে মহাবীর তারেখ স্পেনদেশ জয় করেন। আমার স্পেনবিজয় কাব্যে সে অতুলনীয় বিজয়-গৌরবের কাহিনী ছন্দোবদ্ধ হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। বিজয়ের পরে মোস্লেমগণ প্রায় সপ্তশত বর্ষ প্রবল পরাক্রমে এবং অতুল গৌরবে সমগ্র ইথ্রিয়া উপদ্বীপ অর্থাৎ স্পেন ও পর্ত্তুগাল শাসন করেন। আফ্রিকা এবং এশিয়া হইতে লক্ষ লক্ষ মোস্লেম যাইয়া স্পেনে উপনিবেশ স্থাপন করেন।
স্পেন এইরূপে মুসলমানদিগের জন্মভূমি কর্ম্মক্ষেত্র এবং গৌরবের লীলা-নিকেতনে পরিণত হয়। অজ্ঞান-অন্ধকারে আচ্ছন্ন বর্ব্বর ইউরোপে, এই স্পেন সাম্রাজ্য হইতেই জ্ঞানবিজ্ঞান দর্শন সাহিত্য এবং শিল্পকলার সঞ্জীবনী ধারা প্রবাহিত হয়। সভ্যতার তীব্রোজ্জ্বল আলোক-শিখা, মুসলমান-স্পেনের কর্ডোভা, গ্রাণাডা, ভালেন্সিয়া, বার্সিলোনা, করুণা, জিন মালাগা প্রভৃতি নগর হইতেই ইউরোপ খণ্ডে প্রকীর্ণ হইয়াছিল।
আধুনিক জগতের ভাগ্যচক্রের বিধানকর্ত্তা এবং সভ্যতার পরিরক্ষক বলিয়া পরিকীর্ত্তিত ইংরাজ, ফরাসী, জর্ম্মাণ, অষ্ট্ৰীয়ান প্রভৃতি জাতি এই স্পেনীয় অতুল মনীষাসম্পন্ন জ্ঞান-দৃপ্ত গৌরবোজ্জ্বল মুসলমানদিগেরই শিষ্য। খৃষ্টীয় জগতের ধর্ম্মগুরু এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলিয়া পরিচিত রোমের পোপ সালিভান পর্য্যন্ত স্পেনে শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন।
বর্ত্তমান ইউরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতা, স্পেনীয় সেই মোস্লেম সভ্যতা ও শিক্ষার স্ফুটতর বিকাশ মাত্র। স্পেনীয় মুসলমানদিগের সেই জ্ঞানচর্চ্চা এবং সভ্যতার ইতিবৃত্তি অতি বিপুল বিরাট্ ও বিশাল! সে গৌরব-কাহিনী অন্ততঃ সহস্র পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করিতে পারিলে, আমি প্রাণে কিছু সান্ত্বনা লাভ করিতে পারিতাম। কিন্তু অধম আমি, ঈশ্বরকৃপায় যে সমস্ত কাব্য, মহাকাব্য, প্রবন্ধ, ইতিহাস এবং উপন্যাস রচনা করিয়াছি—যাহা মুদ্রিত হইয়া প্রকাশিত হইলে, বঙ্গীয় মোস্লেম সমাজে এক নবজীবন ও নব আশার সঞ্চার হইত; দরিদ্রতা-নিবন্ধন সেই সমস্ত প্রকাশ করিতে না পারায়, অতীব মনঃকষ্টে দিন যাপন করিতেছি।
এ অবস্থায় স্পেনের বিরাট্ ইতিহাস লেখার পরিবর্ত্তে, এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ রচনা করিয়া প্রকাশ করা ব্যতীত আর কোনও উপায় নাই। ইহা পাঠে নব্যযুবক এবং ছাত্রদিগের প্রাণে আত্ম-গরিমা এবং তৎসঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার ভাব কথঞ্চিৎরূপে ফুটিয়া উঠিলেও, দগ্ধ প্রাণ শীতল হইবে। ইতি সৈয়দ সিরাজী, বাণীকুঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ১লা বৈশাখ ১৩২৩।
অজ্ঞান-অন্ধকারে আচ্ছন্ন বর্ব্বর ইউরোপে, এই স্পেন সাম্রাজ্য হইতেই জ্ঞানবিজ্ঞান দর্শন সাহিত্য এবং শিল্পকলার সঞ্জীবনী ধারা প্রবাহিত হয়। সভ্যতার তীব্রোজ্জ্বল আলোক-শিখা, মুসলমান-স্পেনের কর্ডোভা, গ্রাণাডা, ভালেন্সিয়া, বার্সিলোনা, করুণা, জিন মালাগা প্রভৃতি নগর হইতেই ইউরোপ খণ্ডে প্রকীর্ণ হইয়াছিল।
স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা
প্রাচীনকালে সভ্যতা, সৌন্দর্য্য ও শিক্ষার বিচিত্র লীলাভূমি ও কীর্ত্তিমন্দির বলিয়া যে সমস্ত মহানগরী খ্যাতিলাভ করিয়াছিল, তন্মধ্যে গৌরবোন্নত, সৌন্দর্য্য-সমলঙ্কত, সমৃদ্ধিসম্পন্ন স্পেনের কর্ডোভা মহানগরী অন্যতম। বোগদাদ ব্যতীত কর্ডোভা মহানগরীর সহিত অপর কোনও নগরীর নামও উল্লিখিত হইবার যোগ্য নহে। স্পেনকে পরী বলিয়া কল্পনা করিলে কর্ডোভাকে তাহার চক্ষু বলিয়া স্থান দিতে হয়। প্রাচীন আরব ঐতিহাসিকগণ কর্ডোভাকে স্পেনের পাত্রী বা ক’নে (Bride) বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। গৌরবের দিনে কর্ডোভার ঐশ্বর্য্য ও সৌন্দর্য্য, শিক্ষা ও সভ্যতা, শিল্প ও বাণিজ্য, স্থখ ও স্বাচ্ছন্দ্য, আমোদ প্রমোদ ও বিলাস-উল্লাস, একত্র পুঞ্জীভূত হইয়া ইহাকে কবি-চিত্ত-সম্মোহন কল্পনাতীত সুন্দরী ও সুখময়ী করিয়া তুলিয়াছিল। পৃথিবীর নানা দিগ্দেশের ভ্রমণকারিগণ কৌতূহলাক্রান্তচিত্তে কর্ডোভার বিশ্ব-বিশ্রুত সৌন্দর্য্য-গরিমায় মুগ্ধ হইয়া তদ্দর্শনার্থ আগমন করিতেন এবং বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে ইহার গঠন-সৌন্দর্য্য, পরিচ্ছন্নতা, সুখশান্তি এবং বিপুল ঐশ্বর্য্যচ্ছটায় স্তম্ভিত হইয়া মুক্তকণ্ঠে ইহার প্রশংসা কীর্ত্তনে আপনাদিগকে চরিতার্থ মনে করিতেন।
অন্ধতমসাচ্ছন্ন অসভ্য এবং বর্ব্বরপ্রকৃতি খ্রীষ্টানগণ উত্তর কালে শিক্ষা ও সভ্যতার যে আলোকে ইউরোপকে আলোকিত করিয়া তুলিয়াছে; শিক্ষা ও সভ্যতার সেই প্রদীপ্ত আলোকভাণ্ড কর্ডোভাতেই বিশেষরূপে প্রজ্বলিত হইয়াছিল।
পাঠক! মনে রাখিবেন, মুসলমান-স্পেনের কর্ডোভা নগরী হইতে যখন সভ্যতার স্বর্গীয় প্লাবন, জ্ঞান-বিদ্যাশিক্ষার উত্তাল তরঙ্গমালা বক্ষে ধারণ করিয়া কুসংস্কার জঞ্জাল-পরিপূর্ণ ইউরোপকে বিপ্লাবিত এবং বিধৌত করিবার জন্য চতুর্দ্দিকে তীব্রবেগে ছুটিয়া পড়িতেছিল; তখন বর্ত্তমান জ্ঞানগর্ব্বিত সভ্যতা-প্রদীপ্ত ইংরাজ, ফরাসী, এবং জর্ম্মাণ জাতির পূর্ব্বপুরুষগণ পর্ব্বতগহ্বরে এবং গভীর কাননাবাসে বন্য ফল মূল এবং আম-মাংসে উদরপূর্ত্তি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments