গণসংগীতের উৎস সন্ধানে
গণসংগীত রচনা করার হাতে খড়ি আমার হয়েছিল গণনাট্য সংঘ গড়ে ওঠার বেশ কিছু আগে থেকেই। আমি থাকতুম আমার মামার বাড়ি সোনারপুর থানার অন্তর্গত কোদালিয়া গ্রামে (এখন নাম সুভাষগ্রাম)। ওখান থেকে ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে বঙ্গবাসী কলেজে পড়তে যেতুম। সোনারপুর অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন তখন বেশ দানা বেঁধে উঠেছে। বিদ্যাধরী নদী মজে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের নোনা জল ঢুকে হাজার হাজার বিঘে ধান জমি নোনাজলে ভেসে গিয়ে অনাবাদী হয়ে গিয়েছিল। ফলে লক্ষ লক্ষ কৃষক ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়েছিল। সেটা ব্রিটিশ আমল। দাবি ছিল ড্রেজার দিয়ে খাল কাটতে হবে। মজা বিদ্যাধরীর বালু তুলে ফেলে দিয়ে ওটাকে জীবন্ত করে তুলতে হবে। তাছাড়া কৃষককে ভরতুকি দিয়ে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে চাল, আটা, ডাল, শিশুদের জন্য দুধ আর রোগীর জন্য ওষুধ বিতরণ করতে হবে। পিপলস রিলিফ কমিটির একটা শাখা গড়ে উঠেছিল আমাদের গ্রামে। তারা দুধ-ওষুধ বিনামূল্যে চাষীদের মধ্যে বিতরণ করতো। আমি কখন অজান্তে এই কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লুম। স্থানীয় দু'একজন কৃষক নেতা আমার কাছে একদিন এলেন এই আবদার নিয়ে যে আসন্ন কৃষক সম্মেলনের জন্য দু'একটি গান রচনা করে আমায় গাইতে হবে। কলেজে আমি তখন বেআইনী কমিউনিস্ট পার্টির সংশ্রবে এসেছি (১৯৪১-৪২ সালের কথা)। ছাত্র ফেডারেশনও করি অল্পস্বল্প। আবার অন্যদিকে বাঁশি বাজিয়ে হিসেবেও খুব নাম আমার। গ্রামেই শুধু নয়, কলেজেও ইন্টার কলেজ কমপিটিশনে পরপর তিনবার বাঁশিতে এস্রাজে প্রথম হয়েছি। তিমিরবরণের অর্কেষ্টাতেও ঢুকেছি। কিন্তু গানবাজনা যদিও ছোটবেলা থেকেই শিখেছি সেটা ছিল অন্য ব্যাপার। তাকে টেনে এনে আন্দোলনের কাজে লাগানোর কথা কোনদিন মনে আসেনি। কৃষক নেতারা বল্লেন—‘লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ হবে—মাইক থাকবে, সেখানে তুমি গান গাইবে—সেটা হবে একটা অন্য ব্যাপার।’ শুনে আমার বুক ঢিপ্ঢিপ্ করতে লাগল—বল্লুম: “কিন্তু ওরকম গান তো আমি কোনদিন বাঁধিনি বা গাইনি!”—ওঁরা প্রচন্ড উৎসাহ দিয়ে চলে গেলেন 'তুমি একটু চেষ্টা করলেই পারবে।'—তখন আমি একটা ডান্সপার্টিতে ঢুকেছি। মিউজিক ডায়রেকটর সুশান্ত ব্যানার্জী, তিমিরবরণের অ্যাসিস্ট্যান্ট! রোজ কলেজের পর রিহার্শাল করতে যাই—রাত করে বাড়ি ফিরি। ভুলেই গেলুম কৃষক সম্মেলনের কথা। তারপর একদিন ওঁরা এসে হাজির—'চলো'! 'কোথায়'? জিজ্ঞাসা করলুম। 'সন্দেশখালি' ওরা বললেন 'কালকেই সম্মেলন। গান রেডি তো?'—কী সব্বোনাশ! বল্লুম—না না গান রেডি নেই, আর ওসব গান আমার দ্বারা হবে না—আমি যাব না’ ওরা নাছোড়বান্দা ‘ঠিক আছে গান গাইতে হবে না, এমনি চলো।’ শ্যামবাজার থেকে একটা লঞ্চে চেপে যাত্রা শুরু হল। যেতে যেতে ওরা বল্লেন—'তোমার নাম প্রচার হয়ে গেছে—তুমি গাইবেনা?'—আমার একটা সিঙ্গল রীডের ছোট হারমোনিয়ম ছিল—বাবা কিনে দিয়েছিলেন। সেটা ওরা তুলে নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে। ভাবলুম চাষাভুষোর জন্যে গান, কী আর এমন শক্ত ব্যাপার। একটা সাদামাটা সুর করে কথা বসিয়ে গেয়ে দিলেই হবে। কিন্তু সাদামাটা সুর করাটা কতো শক্ত! শেষ পর্যন্ত ভাটিয়ালী সুর ভিত্তি করে একটা গান বেঁধে সম্মেলনে গাইলুম—(গানটা এখনও মনে আছে):
‘দেশ ভেসেছে বানের জলে
ধান গিয়েছে মরে
কেমনে বলিব বন্ধু গ্রামের কথা তোরে।’
প্রচণ্ড হৈচৈ সাড়া পড়ে গেল। দুবার তিনবার করে গাইতে হল। তখন আমার বড়জোর আঠারো কী উনিশ বছর বয়স হবে। রক্তে আগুন লেগে গেল। এর আগে বহু ছোটখাটো জলসায় তখনকার দিনের সিনেমার হিট্ পঙ্কজ মল্লিকের গান রেকর্ডে মৃণালকান্তি ঘোষ, ধীরেন দাসের গান গেয়ে বেশ কিছু আসর মাতিয়েছি। তিমিরবরণের অর্কেষ্টায় ফেলু নায়ার, শীলা হালদারের মতো নর্তক নর্তকীর সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে বাহবা কুড়িয়েছি। কিন্তু এমন সম্বর্ধনা, এমন করে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া ছিল আমার স্বপ্নের অতীত। সেই যে শুরু হল তারপর আর আমার ছাড় নেই। কৃষকদের নানান দাবি দাওয়া জমিদারের জোতদারের শোষণ ‘লাঙ্গল যার জমি তার’—আন্দোলন এই সব
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments