বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ উদ্‌যাপন: আনন্দ-বেদনার কাব্য

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া রোকেয়া উদাস দৃষ্টি মেলে ধরেন তার জীবনের আলোকোজ্জ্বল প্রভাতের দিকে। শৈশবের সেই বালিকা রোকেয়া ঈদের রাঙা প্রভাতে আনন্দের সাগরে ভাসছে। কিন্তু আজ জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে তিনি রিক্ত, শূন্য, জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক নারী। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিয়েছেন। ঈদের দিনটি তার কাছে বিশেষ কোনো তাৎপর্য বয়ে আনে না। শৈশবের আনন্দের কিছু স্মৃতিই তার সম্বল। আজ তার কাছে ঈদ মানে আনন্দের স্মৃতি, আর বাস্তবের বেদনার মিশ্রকাব্য মাত্র!

সবার কাছে ঈদ মানেই আনন্দ। এদিন ছোট-বড় সকলে মেতে ওঠে গল্প, আড্ডায়। ঈদের দিনসহ তিন-চার দিন ধরে চারদিকে বিরাজ করে এক উৎসবের আমেজ। গ্রামের বাড়িতে মায়েরা তাদের সন্তানদের দেখা পাওয়ার আশায় বছর ধরে অপেক্ষায় থাকেন এই দিনটির জন্য। গ্রামের ঘরে ঘরে বাবা-মায়ের ঈদ আনন্দ পূর্ণ হয় সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে ঈদের দিনটির চিত্র একেবারেই ভিন্ন। আপনজনের দেখা পাবার আশায় সারাদিন বসে কাটালেও হয়তো দেখা হয় না কারও সঙ্গেই। জীবনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে যাদের শেষ আশ্রয় হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রম, তাদের চোখের জলে, সন্তান-সন্তানাদি ছাড়া একাকী কাটাতে হয় ঈদের দিনটি।

আগারগাঁও প্রবীণ হিতৈষী সংঘের প্রবীণ নিবাসে বসবাসরত ৪০ জনের মধ্যে ২০ জনই নারী। শহরে একাকী জীবন কাটানোর অভিশাপ থেকে মুক্তি, সন্তানের সঙ্গে মনোমালিন্য, মেয়ের কাছে থাকতে না পারার অজুহাত—এসব নানা কারণে তারা শেষ বয়সে জীবন কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছেন এই বৃদ্ধাশ্রমকে। বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত নারীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে প্রথমে কেউই রাজি হননি। কেননা সবারই এই মনোভাব যে, বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থান তাদের সন্তানদের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। মনে যত অভিমানই জমা হোক না কেন, কেউই মুখে তা বলতে চান না। হয়তো ছেলে-মেয়ে বিদেশে চলে গেছে, বছরের পর বছর এভাবেই একাকী বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু তারপরও ভাই-বোন ছেলেমেয়ে কারও প্রতিই কোনো অভিযোগ নেই তাদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা শুরু করলে মনের চাপা দুঃখের কথা শেষ পর্যন্ত বেরিয়েই পড়ে। ফিরোজা বেগম (ছদ্মনাম) একসময় কলেজের শিক্ষক ছিলেন। এখানে নিজের টাকায় থাকেন। মেসে ৩০ জনের মতো একসঙ্গে খান। তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছায়ই আমি এখানে থাকি। বাড়িতে একা থাকার চেয়ে সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই ভালো। আমার একমাত্র পুত্র স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিদেশে আছে।’ ঈদের দিনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের কোনো ঈদ নেই। অন্য দশটা দিনের মতো ঈদের দিন যায় আসে বুঝতেও পারি না।’ ঈদের দিন বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা হয়। তবু চারপাশের পরিবেশে ঈদের আনন্দের বদলে চাপা দুঃখ আর অভিমানই বিরাজ করে। মায়েদের জন্য নিজ সন্তানকে ছাড়া বৃদ্ধাশ্রমে একাকী ঈদের দিনটি কাটানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও অনেকেই বলেন, সন্তানের ঈদের আনন্দই তার আনন্দ, তা সন্তান যেখানেই ঈদ করুক না কেন। পরিবার-পরিজন ছাড়া বৃদ্ধাশ্রমে প্রতিটি নারীর ঈদের দিনটি আসলে দুঃস্বপ্নের মতোই কাটে। সবাই তাই ঈদের কথা ভুলেই থাকতে চান। বন্যা (ছদ্মনাম) বললেন, তিনি নাতি-নাতনির ছবি দেখেই ঈদের দিনটি পার করেন। সুনিমা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ঈদের দিন পুরনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোই আমার কাজ। ছেলে বিদেশে থাকে। ছেলের বউ-নাতনি দেশে থাকলেও বহুকাল দেখা নেই। ছেলের বাড়িতে থাকার জায়গা হয়নি। ভাই-বোনেরা ঈদের দিনটিতেও দেখা করতে আসে না। তাই পুরনো দিনের স্মৃতিই আমার একমাত্র সম্বল।’

তাঁর ঈদের দিনের অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে আমার চোখও পানিতে ভিজে উঠল। মনে হলো ঈদের এই বিশেষ দিনটিতে প্রতিটি বৃদ্ধাশ্রমে যাদের বাবা-মা, নানা-নানি, দাদা-দাদি অথবা ভাই-বোন রয়েছে, তারা কি একবেলার জন্যও দেখা করতে যেতে পারে না। আমরা কি ঈদের দিন কিছুটা সময়

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice