রক্ত
সন্ধ্যা থেকে পানের দোকানটার সামনে একটা টুলে স্তব্ধ হয়ে বসে রয়েছে আবদুল। মনে অদ্ভুত শূন্যতা, এবং সে-শূন্য মনে পাশের হোটেলের কোলাহল অতি বিচিত্র ও রহস্যময় ঠেকছে। কখনো পানওয়ালাটা হঠাৎ ছাড়া গলায় তীক্ষ্ণস্বরে হেসে উঠলে সে চমকে উঠছে, বিস্তৃত শূন্যতার মধ্য থেকে তার মন বিহ্বল হয়ে বেরিয়ে আসছে, তারপর কী যেন খুঁজে-খুঁজে না পেয়ে আবার শূন্য হয়ে উঠছে।
রাস্তার ওপাশে গুদামের মতো একটা বন্ধ ঘর; তার এধারে গ্যাসপোস্টের তলে ধোঁয়ার মতো রহস্যময় ক্ষীণ আলো। সেদিকেই আবদুলের ভাষাশূন্য চোখ নিবদ্ধ হয়ে ছিল। এবার হঠাৎ তার সে চোখ কেঁপে উঠল—কিছুটা ভয়ে কিছুটা বিস্ময়ে। ওধারের ফুটপাথ দিয়ে একটি কালো ছায়া আবছা অন্ধকারে মিশে নিঃশব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, আর তাকে ঘিরে রয়েছে প্রেতাত্মার মতো বীভৎস সংগোপনতা। শীতল ভয়ে স্তব্ধ হয়ে এল তার দেহ, এবং তাই প্রাণের উষ্ণতার সন্ধানে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকাল ওধারে, দেখলে উজ্জ্বল আলো, চকচকে আয়না, আর সঙ্গীর সাথে কথা কইতে কইতে হাসতে থাকা পানওয়ালাকে।
শান্ত হয়ে আবদুল আবার ওধারে তাকাল, তাকিয়ে এবার বুঝলে যে, নুলোটা গেল। ওদিকে কোথাও হয়তো নুলো লোকটার মাথা গুঁজবার আস্তানা রয়েছে, দিনান্তে সেখানেই সে ফিরে গেল। রোজই এমনি সময়ে সে যায় এদিক দিয়ে।
হঠাৎ বিড়ির কড়া গন্ধ নাকে লাগল। মুখ ফিরিয়ে আবদুল চেয়ে দেখলে একটি লোক তার পাশে টুলের ওপর বসে ঝুঁকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার পানে। ও তাকাতেই সে শুধাল:
—খালাসি?
আবদুল মাথা নেড়ে জানালে, হ্যাঁ।
—চুক্তি মিল্তিছে না?
কয়েক মুহূর্ত আবদুল কিছু উত্তর দিলে না, তারপর আস্তে-আস্তে বললে, না। এ কথা বললে না যে চুক্তি সে এখন পাবে না, খারাপ স্বাস্থ্যের জন্যে তাকে বরখাস্ত করে দিয়েছে। এবং এ-জন্যেই কেমন একটি ব্যর্থতা তার বুকে এসে বিঁধছে, আর সে-ব্যর্থতা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে শূন্যতা। হঠাৎ সামনে যেন পথের সন্ধান মিলছে না, ধূসর মরুর মতো শূন্যতা ধু-ধু করছে।
কিন্তু এবার হঠাৎ মনের সে-শূন্যতা কাটতে লাগল। একটু আগে পঙ্গুকে যেতে দেখছে সামনে দিয়ে, তাই বিশ্বাস জমতে লাগল ধীরে-ধীরে। এবং একটু পরে হাওয়ায় ভেসে শামি কাবাবের গন্ধ নাকে এসে লাগলে সে স্বচ্ছন্দ মনে উঠে পড়ল, তারপর হোটেলে ঢুকে ভিড়ের মধ্যে এক ফাঁকে বসে পড়ে শীঘ্র জীবনের কোলাহল ও প্রাণের স্পন্দনের মধ্যে ডুবে গিয়ে অদূরে তার জীবনের তীর দেখতে পেলে।
খাওয়া শেষ করে আবার বাইরে এল সে, দেখল, তখনো সেই লোকটি তেমনিভাবে টুলের ওপর বসে। আবদুল যখন এখানে বসেছিল, তখন শূন্যতার দীনতা তাকে ঘিরে ছিল বলে লোকটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তার পানে, কিন্তু এখন নীরব উপেক্ষায় সে আত্মকেন্দ্রিক বলে লোকটা তার পানে চেয়ে সন্দিগ্ধ ও দুর্বলভাবে হাসল। উত্তরে আবদুল না-হাসার মতো হাসলে, অথচ তাকে পান খাওয়াল, বিড়ি দিল।
—নাম কী?
—আক্কাস।
মনে পড়ে জাহাজের কাপ্তানের উদ্ধৃত দৃষ্টি। এবার তাকাতে গিয়ে আবদুল সে-রকম দৃষ্টি অনুভব করলে নিজের চোখের মধ্যে, এবং আক্কাসের চোখে দেখল স্পষ্ট অসহায়তা। তাকে অনুসরণ করতে বলে দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করলে।
সে আস্তানায় গেল না। হোটেল থেকে কিছু দূরে একটি খোলা জায়গার ধারে এসে রাস্তা থেকে নেবে ঘাসের ওপর বসলে, আক্কাসকেও বসতে বললে। ওর দ্রুতগতির রেশ ধরে চলে চলে আরো দুর্বল হয়ে উঠেছে লোকটা, পাশে সে বসল বটে কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। দীর্ঘ সাত বছর বিশাল সমুদ্রের বুকে বাস করেছে আবদুল, এবং জাহাজের ক্ষুদ্র দুনিয়ায় নিবিড়ভাবে অনুভব করেছে সর্বশক্তিমান কাপ্তানের ব্যক্তিত্ব আর শক্তিত্ব, জেনেছে সারেঙ্গ—টেণ্ডলের পদস্থ-ক্ষমতা। এবং জাহাজের ক্ষুদ্র জগতে লস্কর হিসেবে তা অনুভব করেছে ও জেনেছে বলে স্পষ্ট হয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments