ওয়াগন ব্রেকার

স্বাধীনতার দামামার শব্দে উত্তরঙ্গ গোটা বাংলাদেশ।

বাড়ীর উঠানে ঢুকতেই মা হঠাৎ ঘোমটা টেনে বসল। ঝোপ দাড়ীওয়ালা কোন বেগানা মরদ অন্দরে ঢুকে পড়েছে। তৌবা !

লাতু তখনই হো হো শব্দে হেসে উঠল এবং দৌড়ে গিয়ে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, সাথে সাথে উচ্চারণ “মা আমারে চিনত৷ পারলে না? আমি লাতু—।”

হাউমাউ কান্নাসহ সন্তানকে বুকে চেপে জননী কী যে বলতে লাগল বুঝা গেল না। এই নাটকীয় মঞ্চে তখন আরো দর্শক জুটে গেছে। লাতুর ছোট ছোট দুই বোন, বারো বছরের এক ভাই। তারা হকচকিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মার কান্না, এক অপরিচিত মিলিটারী যদিও মুক্তিযোদ্ধা, অমন কোলাকুলি। সবই অভাবনীয়। তখনই বাপ জবেদ মিয়া কোথা থেকে যে নাজেল হোলো, আল্লা মালুম।

নাটক আরো জমে উঠল।

মা-কে আলিঙ্গন করার জন্যে লাতু তার ব্রেন্‌গান আগেই মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। সেদিকেও অনেকের নজর যায়। বিময় ত শুধু এক কিসিমের নয়।

লাতু… লাতু…।

বাপ পুরুষ মানুষ বলে বোধ হয় অন্য আর কোন শব্দ উচ্চারণে লজ্জা বোধ করে। কিন্তু তার চোখের পানি, আলিঙ্গনের দৃঢ়তায় সব অভাব মিটে যায়।

লাতুকে চেনার আরো অসুবিধা ছিল। সব সময় তাকে লুঙ্গি পরাই দেখেছে পাড়ার সকলে। তার বেশী কৃষক পল্লীতে লেবাস আর কি কল্পনা করা যায়? সেই ছেলের পরনে মোটা খাকী প্যান্ট গায়ে চার পকেটওয়ালা বুশ শার্ট। চেহারাই কি খোলতাই হয়েছে। মা-শা-আল্লাহ। এম্নিতে ছেলেবেলা মোটা-তাজা জন্মেছিল, সেই রকম লম্বা, ছ’ফুট তিন ইঞ্চির কম হবে না। এখন ঝোপ-দাড়ীর ফলে মুরুব্বী দেখায়। তবে বেমানান কিছু না।

বাপ শোকর গোজার করে আল্লার দরগায়। কত কেঁদেছে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে রাতের অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। কতো মৃত্যুর খবর আসত প্রতিদিন। তার লাল মাণিক কি আর বেঁচে আছে? তা হলে দুমাস কোন খবর দেয়নি।

আল্লার কাছে হাজার শোকর।

পাড়া কি, গোটা গ্রাম ভেঙ্গে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যে। লাতু ফিরে এসেছে লড়াই করে। গাঁয়ের কৌতূহল, গর্ব সৰ একাকার মিশে যায়। প্রতিবেশীসুলভ ছোট-খাটো কলহ-জাত ঈর্ষা, মনকষাকষি সব কোথায় যেন তলিয়ে গিয়েছিল।

বহুজনকে আলিঙ্গন অথবা কদমবুসি (প্রণাম) এই হুল্লোড়ের মধ্যেই চলে। ক্লান্ত লাতু কিন্তু ক্লান্ত হয় না। শেষে বিচক্ষণ বর্ষীয়ানই তাড়া দিয়েছিল “চলো এ্যাহন। গাঁয়ের পোলা হগ্গল কথাই শোনা যাইবো পরে। ওরে জিরাইতা দাও।”

এইভাবেই সেদিন পয়লা আসর খালি হয়েছিল। মা-বাবা-ভাই-বোনদের সঙ্গে লাতু বহুদিন পরে ঘরের আস্বাদ ফিরে পায়। আশ্চর্য তার কাঁধে ব্যাগ ঝুলছিল, সেটা নামিয়ে রাখার কথা কেউ বলেনি। প্রাথমিক উত্তেজনার রীতি, বোধ হয় এই রকম।

পরম উত্তেজনা আরো গোপন ছিল, লাতু যখন কাপড়-চোপড় খুলে লুঙ্গি পরতে-পরতে মার হাতে দু'শ টাকা দিলে।

—কতো ট্যাহা বাজান?

—দুইশ, হৈব।

—দুইশ!

গরীব চাষী পরিবারে একজোট দুশ’ টাকা। অভাবনীয় নয়, অবিশ্বাস্য।

—কুথা পাইলি, বাজান?

—কতোজনে দিছে। শহর যহনই গেছি, মুক্তিযোদ্ধা জানলে মানুষে দিতে বখিলী করে নাই।

—বা-জান, বা-জান !

লাতুর মা তার বেশী আর কিছু উচ্চারণ করতে পারেনি সেদিন।

আরো কিছু টাকা অন্য এক পকেটে থেকে গিয়েছিল। দুশ’খানেক হবে। পরদিন নিকটের বাজার থেকে লাতু ছোট ভাই-বোনদের জন্যে জামা, বাপের জন্যে লুঙ্গি, মার জন্যে শাড়ী কিনে আনলে, তখন যেন কোন ঈদ-জাতীয় পর্ব ফিরে এলো। আর লাতু ত প্রতি বাড়ীর মেহমান। সকলেই যুদ্ধের কাহিনী শুনতে লাগল। অনেক রাত হলে তবে সে ফুরসৎ পায়।

দুটো মাত্র বাঁশের খড়ো চালা ঘর। মা পুরাতন কাঁথা বিছিয়ে দেয় ছেলের জন্যে মাদুরের উপর। লাতু হেসেছিল তখন। “মা, শক্ত জমিনের উপর হুইছি। ঝোপঝাড়, বন-বাদাড়ে রাত জাইগ্যা বইস্যা কাটানো। আপনে এসব কি করেন? দ্যাশ স্বাধীন হৈছে, আরো মেহনৎ করা লাইগব।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice