সারেঙ সুখানী
আর থোড়া অক্ত।
আর কিছু সময়।
অনন্তের সুড়ঙ্গে এই হামাগুড়ি আর কতক্ষণ দেওয়া যায়?
সোলেমান সারেঙের কাছে তখন কি প্রশ্ন বার বার ঘাই মেরেছিল, তা আজ জানার কথা নয়।
কারণ, মুহূর্ত নির্যাস হয়ে এলে অনেক ছবি, অনেক কথা, ঘটনা একাকার যে রূপপরিগ্রহ করে তা নিতান্ত অনুভবের ব্যাপার। ক্যামেরার লেস অতি দ্রুত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই ফিল্মের সমতলে নানা ছাপ সংগ্রহ সহজ। তার পাঠ উদ্ধারও সম্ভব। সেখানে একক ছবি ছাড়া আর কিছু নেই।
কিন্তু ঘটনা আবেগ-প্রবাহ যখন তেমন কায়দায় গতির চোটে একটার পর একটা—একটার ভিতর একটা সেঁধিয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র জানান দেওয়ার দাবি হাঁক-ফুকর ছড়াতে থাকে, তখন অর্থহীনতার কাছে সব সোপর্দ করতে হয়। কিন্তু অনুভূতি কি অমন করে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
মানুষের ধুক্পুক্ বুক থেকেই ত সব আসে।
দক্ষিণ আকাশে মেঘ ধরেছিল, বাতাসের তোড় সঙ্গে। সৰ্বনাশী মেঘনা খালি হাসে আর হাসে। খল্খল্ বালিকা-কন্যার কচি দাঁত, তিনটে পোকায় খাওয়া। খালি আওয়াজ উঠানে মুরগীগুলো কট্ কট্ করে নাম নেই ডিম দেওয়ার। সামনে ঈদের পরবে বেশ ভুলতেই জানে। কয়েকটা হালাল করা যেতে পারে। বন্যার পর চরে যে পলিমাটি পড়েছে, চৌগুণ ফসল হতে বাধ্য। নির্জন চরের বিস্তার এক একবার অমন ঝলসে উঠে কেন রোদ্রে? অবিরল কল্কল্ আকাশ উপুড় হয়ে আঁজলা আঁজলা জল খায়, পিঠে রঙ্গীন বাদাম উড়িয়ে, মাটির ধার ধারে না। নেহাৎ যদি ইজ্জৎ বিস্মৃতি ঘটে গাছপালা জাপটে ধরে, যা সবুজ বিষে মৃত। তাই তারও হরিৎতর। গ্রীষ্মের ধূ ধূ চর। হা হা বাতাস। হা-হা—
পায়ে হেঁটে যতদূর যাও এই বাওড় ধরে আর এক বাওড়ে বাতাসে আর কোন বোল নেই। রাঙতাখালি, পায়রাচালি, নিশ্চিন্দিপুর, দরিয়াগাছি—অন্তত এমন ত্ৰিশটা গ্রাম মাতম করেছে মহরমের। এখানে জারি কেবল আহাজারী। নাসিমন খালার ছেলে ষণ্ডা জোয়ান তালেবের ভাইজান—ডাকে পাথর গলে যেত। ছেলেবেলায় বলতো, “সোলেমান দাদাভাই, চলেন অহন হাড়ে যাই।” পাপড় খাওয়ার শখ। এক পয়সাতেই খুশী। তালেব হাঁটছে দ্রুত। চার বছর, ছয় বছর—আট বছর—কুড়ি বছরের তালেব। কি জল্দি জল্দি কালো চেহারা জলতরঙ্গে সুরের মত নিজের পরিবেশ ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়ত। পাগল, পানের দোকান দিয়েছিল বক্সী বাজারে। পানের চেয়ে গান বেচত বেশী, সদা গুন্গুনে। ভাইজান ডাক শোনা যায় ৷ অবিরল জলকল্লোল যতই প্রচণ্ড হোক, আদরের আহ্বান তা ছাপিয়ে উঠে। কারণ তাকে বাতাস কোল দেয়। কোল দেয় মনুষ্যকণ্ঠের সম্মাননায়। স্টীমারের হুইসেল আদমের ছেলেরাই বানায়। বাঁই-বাঁই ঝড়ে আকাশ মাতাল যখন টলে টলে পড়ে, তার ধকল যায় লঞ্চ স্টীমারের উপর দিয়ে। যেন সাঙাতে সাঙাতে অনিয়ম মশ্করা। তালেবের পানের দোকান পুড়ে গেছে। সে ভিতরেই ছিল। বাইরে বেরোলে মেশিনগানের গুলী খেয়ে জান যায়। পুড়ে মরে যাওয়ার ছেলে সে নয়। ফেরৎ যখন আসেনি, মরণের হাদিস আউড়ে মুনাফা কোথায়? বাতাস গুম্রে গুম্রে কাঁদে নাসিমন খালার মত, নির্বাক পাথর। ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন—বেশক এলাহীর কাজেই ফিরে আসে। জাহাজের স্টীয়ারিং হুইল ধরে দরিয়ার রহমান চাতালে চোখ রেখে রেখে তালেবের মুখ আঁকবার চেষ্টা করা যায়। দুরন্ত ঢেউ সব মুছে দিতেই যেন অমন দাবড়ি মেরে উঠে। কত পানি দেখলাম সেই জোয়ান কাল থেকে। বয়লার থেকে শুরু, হুইলে এসে শেষ হচ্ছে। চোখের পানি আর কত ভয় দেখাতে পারে? সব পানি শুকিয়ে যাক্, সব অশ্রু শেষ হয়ে যাক্, মরুভূমি হোক বাংলাদেশ। আর কেউ মক্কায় যাবে না অত খরচ করে। একটা খায়েস ছিল। কোম্পানীর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বড় দরিয়া পার জেদ্দা মক্কা যাওয়ার। একটি রঙীন হাজী তোয়ালে কাঁধে ফেলে মুন্সীপাড়ার নসরুদ্দীন হাজী মুরগীর পালে মোরগের মত বুক চেতিয়ে চেতিয়ে কি হাঁটে!
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments