মার্কসবাদ ও নারীবাদ খিটমিটে বন্ধুত্ব, না কি ‘পবিত্র বন্ধুত্ব’?

প্রাণিজগতের বিবর্তনে প্রথমে ছিল উভলিঙ্গ প্রাণী। বহু এক কোষী প্রাণী এখনো আছে যাদের মধ্যে যৌন পার্থক্যের প্রশ্ন অবান্তর এবং তারা এককভাবেই নিজেকে পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে (কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া দ্রষ্টব্য) আপন বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম।

কিন্তু প্রাণের বিবর্তনের অপেক্ষাকৃত উন্নত স্তরে আমরা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ক্রমেই দুই ধরনের প্রাণিসত্তার সাক্ষাত পাই: মেয়ে প্রাণী এবং ছেলে প্রাণী। তবে এ পরিবর্তনও খুব ধীরে ধীরে হয়েছে। অনেক সময় এখনো নিচু স্তরের প্রাণীর ক্ষেত্রে তাদের বাইরে থেকে দেখে ছেলে-মেয়েতে পৃথক করা যায় না। যেমন সেদিন আমার বাসায় ‘বোগানভালিয়া’ চারা এনে লাগিয়ে অনেকদিন পরে টের পাওয়া গেল যে গাছটি ছেলে গাছ এবং ফুল ফোটাতে অক্ষম। বাইরে থেকে গাছটি ছেলে না মেয়ে তা ধরার কোনো উপায় ছিল না! কিন্তু সবচেয়ে উন্নত প্রাণী মানুষের মধ্যে ছেলেতে-মেয়েতে প্রত্যক্ষভাবেই অজস্র পার্থক্য দেখা যায়। দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জৈবিক ক্ষমতার (যেমন: গর্ভধারণ) পার্থক্য তো বটেই, উপরন্তু ছেলেতে-মেয়েতে নানারকম সামাজিক ও আচরণগত পৃথকায়নও ঐতিহাসিকভাবে একেক সমাজে একেক মাত্রায় গড়ে উঠেছে বলে লক্ষ্য করা যায়।

তবে সাধারণভাবে দেখা যায়, সকল পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পিতা তথা পুরুষদের ক্ষমতাই প্রবলতর থাকে। পক্ষান্তরে সকল মাতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের তথা মায়েদের ক্ষমতাই প্রবলতর হয়। এ থেকে মার্কসবাদীরা অন্যদের মতোই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে, নারী-পুরুষে ক্ষমতার বৈষম্যটি প্রাকৃতিকভাবে অবশ্যম্ভাবী নয়, বরং সমাজব্যবস্থা অনুযায়ী তার রূপটি বিভিন্ন রকম হতে পারে। বস্তুত নারী-পুরুষ এই প্রাকৃতিক বিভাজনও সর্বদা ছিল না এবং প্রাণিজগতে বিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট স্তরে এসেই তার সূচনা হয়েছিল। এ পর্যন্ত যা বলা হলো, তা নিয়ে আধুনিক নারীবাদীদের সঙ্গে মার্কসবাদীদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায় তখনই, যখন নারীমুক্তি ও মানবমুক্তির আন্তঃসম্পর্কটি নির্ধারণের প্রশ্ন আসে। প্রথমত মার্কসবাদীরা নারীমুক্তিকে সর্বদাই মানবমুক্তি তথা নারী ও পুরুষ উভয়ের মুক্তির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু আধুনিক নারীবাদীরা নারীমুক্তিকে পুরুষের প্রভুত্ব থেকে নারীর মুক্তি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত এবং তাই সর্বদাই তারা নারীমুক্তিকে একটি স্বাধীন ও ‘অটোনোমাস’ (Autonomous) আন্দোলন হিসেবে দেখতে চান। ফলে মার্কসবাদের মানবমুক্তির সর্বজনীন এজেন্ডাকে নারীবাদীরা ‘ধান ভানতে শীবের গীত’ বা ‘ভাঁওতা’ বলে মনে করেন এবং সমাজে ‘শোষণ বিলুপ্ত হলেই, শ্রেণি বিলুপ্ত হলেই’ নারীরা মুক্তি পাবেÑএ ধরনের স্বয়ংক্রিয় স্থূল নারীমুক্তির তত্ত্বে তারা বিশ্বাস করেন না।

দ্বিতীয় আরেকটি বিষয়ে সম্প্রতি আধুনিক নারীবাদীরা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছেন। তাদের মতে, ‘গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত নারীশ্রমকে’ মার্কসবাদীরা অবমূল্যায়ন করেছেন। এমনকি কোনো কোনো বুর্জোয়া ধারার নারীবাদীদের মতে, মার্কস ‘গৃহস্থালীর শ্রমকে’ উৎপাদনশীল শ্রম হিসেবেই গণ্য করেননি। তাছাড়া কোনো কোনো লেখায় এই শ্রমের মূল্যকে তিনি স্বাধীনভাবে না মেপে শ্রমিক পরিবারের উপার্জনশীল শ্রমিকের আয়ের ও ভোগের মধ্যে একটি অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। কোনো কোনো বুর্জোয়া নারীবাদী গৃহস্থালির শ্রমের জন্য গৃহকর্তার কাছ থেকে মজুরি গ্রহণের প্রশ্নটিও সামনে এনেছেন। সম্প্রতি এই বিতর্কে অনেক সাবেক মার্কসবাদীও নারীবাদীদের মতকে সত্য বলে মনে করতে শুরু করেছেন। [দেখুন পিটার কাস্টার্স, ‘নারীশ্রম Ñঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট’]

বর্তমান প্রবন্ধে ‘মার্কসবাদবিরোধী’ নারীবাদীদের এই মতামতগুলো কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করবো। উল্লেখ্য যে পরস্পরকে দাঁ উচিয়ে তাড়া করে আরো দূরত্ব সৃষ্টি করা এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়, বরং পরস্পরকে শাণিত করে একটি সচেতন বন্ধুত্ব গড়ে তোলাই হবে এই আলোচনার প্রধান উদ্দেশ্য।

শোষণমুক্তি বনাম নারীমুক্তি?

মার্কস মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের সারমর্ম উদ্ঘাটন করেছিলেন এভাবে যে, এটি হচ্ছে ‘Unpaid Labour’ অর্থাৎ যিনি শোষকÑতিনি অপরের উদ্বৃত্ত শ্রম আত্মসাৎ করেন কিন্তু বিনিময়ে তাকে কিছুই প্রদান করেন না। এই মৌলিক অর্থে শোষণমূলক সম্পর্কটি একটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ সম্পর্ক।

একজন পুরুষ

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice