বুলবুলি গান গাও!
লেখক: আবুলহাসান (জন্ম ১৯০৬)
[সোভিয়েত আজেরবাইজানের বয়োজ্যেষ্ঠ গদ্যলেখক। শ্রমিকদের জীবনের গল্প এবং নতুন সমাজতান্ত্রিক মনোভাব ও নীতিবোধ সম্পর্কে গল্পগুলির জন্য তিনি সুপরিচিত। তাঁর ‘চড়াই’ (গ্রামের কৃষির যৌথীকরণ সম্বন্ধে), ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে’ (সোভিয়েত শাসনের জন্য আজেরবাইজানের জনগণের সংগ্রাম সম্বন্ধে), ‘সাদাগেত' (আধুনিক গ্রামের জীবন সম্পর্কে ‘বন্ধুত্বের দূর্গ’ (পিতৃভূমির মহাযুদ্ধের সময়ে সেভাস্তোপোলের বীরোচিত প্রতিরক্ষা সম্বন্ধে) উপন্যাসগুলি যথাযোগ্য মর্যাদা পায়। ছোট গল্প ‘বুলবুলি গান গাও!’ যুদ্ধের বিষয়ে—গোলন্দাজ বাহিনীর একটা ছোট দলের বীরোচিত কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে।]
‘ফা-য়া-র!’
দূরপাল্লার কামানগুলির চাকা দারুণভাবে নড়ে উঠল আর একসঙ্গে তাদের লম্বা নল থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল অগ্নিধারা। দারুণ আওয়াজে পাহাড়গুলি কেপে উঠল, বনটা দুলে উঠে সরসর মর্মর আওয়াজ তুলল। মাটি কাঁপছে আর মনে হচ্ছে যেন সবকিছু, সেই সঙ্গে কাঁপছে। যেইমাত্র আকাশে এই ধোঁয়া, আগুন, ধূলো আর কান ফাটানো আওয়াজ ধীরে ধীরে গলাধঃকরণ করেছে অমনি আবার শোনা গেল সেই একই কণ্ঠস্বরে জোর এবং পরিষ্কারভাবে সেই একই আদেশ: 'ফা-য়া-র।'
ব্যাটারিটি[১]আর একবার ঘৃণার সঙ্গে অগ্নিনিক্ষেপ করল শত্রুবাহিনীর দিকে।
কামানের আওয়াজ এখনও দূরের প্রতিধ্বনির মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে, সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায় নি, গোলন্দাজ বাহিনীর তীক্ষ্ণ কান কিন্তু বিমান আক্রমণ সংকেত পরিষ্কার শুনতে পেল। দ্রুত কিন্তু হুড়মুড় না করে তারা কামানগুলোকে শ খানেক মিটার দূরে টেনে এনে একটা গভীর গর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল, ওপর থেকে এখানটা কিছু বোঝা যায় না, আর ভারী বোমা এখান পর্যন্ত পৌঁছবে না। শত্রুদের বিমানগুলি কালো চিলের মত উড়ছিল আকাশে আর সাংঘাতিক সাংঘাতিক বোমা ফেলছিল নীচে। থেকে থেকে আশপাশের সবকিছু কেপে উঠছিল, পাক খেয়ে ওঠা ধোঁয়া আর আগুন উল্টোপাল্টা হয়ে যাওয়া মাটির সঙ্গে মিশে, প্রচন্ড উপছে ওঠা ঢেউয়ের মত জীবিত সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে নিচ্ছিল।
মনে হচ্ছে এবারেও এই ব্যাটারিটিকে খুঁজে বার করে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল শত্রুদের। শত্রুর বোমারু বিমানগুলিরও তা বোধহয় অজানা নয়, সাধারণত তারা বোমা ফেলে সাড়ম্বরে ফিরে যায় ‘আদেশ পালন’ করা হয়েছে সে খবর জানাতে। কিন্তু এবারে তারা একগুঁয়েভাবে ঘুরতে লাগল ওই জায়গাটার ওপর দিয়েই, যেখানে কয়েক মিনিট আগেই ব্যাটারিটি ছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু দেখতে না পেলেও তারা স্থির নিশ্চিত হল যে এবারে আক্রমণ খুব জোরদার হয়েছে, তাই তারা একের পর এক ফিরে চলল। কিন্তু তারা ফিরে ঘাঁটিতে নামার আগেই কামানগুলি আবার আগের জায়গায় বসে গেল, আবার দলনেতা আহমেদভের গলায় আদেশ শোনা গেল: ‘ফা-য়া-র!’
আর যেন সব ক্ষতিপূরণ করে নেবার জন্য ব্যাটারিটি দ্বিগুণ শক্তিতে শত্রুপক্ষের ওপর কামানের গোলাবর্ষণ আরম্ভ করল।
দশদিন ধরে এই ছোট্ট দলটি শত্রুর সঙ্গে এই লুকোচুরি খেলা খেলে চলেছে, খেলাটা সবাইকে অনুপ্রাণিত করছে আর সৈন্যদের মনে এক ধরণের যুদ্ধের উদ্দীপনা জাগাচ্ছে। শত্রুর ব্যর্থ অনুসন্ধানে সব থেকে বেশী আনন্দিত হত সার্জেন্ট আস্কের। সে-ই সর্বপ্রথম কামান নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসত লুকোবার জায়গাটা থেকে, তাড়াতাড়ি করে নলটা শত্রুদের দিকে উঁচিয়ে রাখত আর আদেশ শোনামাত্রই ট্রিগারটা টিপে দিত। তার নিশানা সবসময় নির্ভুল হত আর তার মুখ হাসিতে ভরে উঠত। যখন বহু প্রতীক্ষিত সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা নেমে আসত, তখন সে কাছের বনে চলে যেত। সেখানে একটা পাথরের ওপর বসে চঞ্চল আবেগে কাউকে যেন উদ্দেশ্য করে বলত: ‘গাও, বুলবুলি, গাও!’
মনে হয় পাখিটি সার্জেন্টের এই অনুরোধেরই অপেক্ষা করছে: একটু পরে দূর থেকে শোনা যায় বুলবুলির মিষ্টি ডাক। যদি বুলবুলি উত্তর দিতে দেরী করছে তবে বুলবুলির বদলে আস্কেরই গান গাইতে আরম্ভ করে দিত।
আজও সৈন্যদলের এমন সাফল্য উপলক্ষে আস্কের বুলবুলিকে গাইতে অনুরোধ করল, বেশীক্ষণ অনুরোধ করতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments