খড়কুটোর সেপাই
খড়কুটোর সেপাই দেখেছেন কখনো?
প্রিয় পাঠকবর্গের কাছে আমি সেই-যে সেই চটের থলে আর খড়ের আঁটি দিয়ে বানানো ডামি-লড়াইয়ের কথাই শুধোচ্ছি। আমার ধারণা, আপনারা জীবনে অন্তত একবার ওদের নিশ্চয়ই দেখেছেন।
সত্যিকারের লড়ুয়েরা যখন যুদ্ধের মহড়া দেয়, তখন ঐ খড়ো-সেপাইদের সিনা লক্ষ্য করে সঙিন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পচা কুটো-কাটা আর বাতিল বস্তার ছোঁড়া টুকরো দিয়ে সাধারণতঃ এই ডামিগুলো তৈরী হয় যদিও, কিন্তু মাঝে মাঝে আবার কেউ কেউ মনযোগ দিয়েও বানায় বৈকি! যেমন কোনো কোনো ডামির মুখে মানুষের মুখের আদল সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে, চোখ আর নাক বানাতে তো রীতিমতো পরিশ্রমই করা হয়।
কাৎলো গাঁয়ের ছোঁড়ারা একদিন হৈ হৈ করতে করতে এসে ছাউনীটা ভরে ফেললো। তাদের লটবহরের মধ্যে একগাদা কাঠের বাক্স দেখা গেলো, যার ভেতরে গোছগাছ করে রাখা আছে আপেল, ডিম, সেদ্ধ করা মুরগি আর কালো সাদা দু'তিন রিল সূতো। ব্যারাকে পা দিয়েই তারা ধড়াচূড়া পরে নিলো, হাতে আটকে নিলো রাইফেলের কুঁদো—যদিও ট্রিগার টিপতে তারা জানে না বললেই চলে। যা হোক, তৈরী হয়ে গেলো তারা দেখতে না দেখতে। তারপর আচমকা লাফিয়ে পড়লো একটা খড়ের মূর্তির ওপর। সবাই মিলে মূর্তিটার বুক মাথা আর পেট লক্ষ্য করে বেয়োনেট চালাচ্ছিলো সমানে, কিন্তু কাঠের কাঠামোয় আটকানো ডামি-সেপাইটি আগের মতোই নির্বিকার হয়ে রইল। সঙিনের সাংঘাতিক আঘাতে একটুও প্রতিবাদ না করে নিজেকে যেন সে সপে দিলো ওদের হাতে।
বর্তমান গল্পের নায়ক ঐ খড়কুটোয় গড়া একটি ডামি মাত্র। কিন্তু এক কাকতালীর যোগাযোগের ফলে ঐ মূর্তিটিই কিছু বিস্ময়কর ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে। সব গল্পই শেষ হয়, এ গল্পেরও পরিণতি আছে। কিন্তু সহৃদয় পাঠকবর্গের দরবারে আমার অনুরোধ, তারা এ গল্প পড়ে এ রকম কিছু করবেন না যাতে মুষিক পর্বত প্রসব করে।
তা গল্পটা এখন শুরু করা যাক, কি বলেন! ১৩৫৭ নম্বর রেজিমেন্টের ব্যারাকে যুদ্ধ শিক্ষার গৌরবের চিহ্ন হিসেবে যে খড়ের মূর্তিটি আজও দাঁড়িয়ে আছে, তার দাঁড়িয়ে থাকার আয়ু ঝাড়া পনেরো বছরের। হবু লড়নেওয়ালারা এই পনেরো বছর ধরে সঙিনের খোঁচায় খোঁচায় তাকে এমন ক্ষতবিক্ষত করেছে যে মানুষের সকল আকৃতিই তার লুপ্ত হয়েছে। আগে দেখতে কেমন ছিলো কে জানে, কিন্তু এখন তাকে একটা থ্যাত,লানো কাছিম ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।
স্মৃতিটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার দৈহিক দুর্দশায় পাষাণ-হৃদয় ব্যক্তিরও দুঃখ হবে। যে কেউ এই লাঞ্ছিত মূর্তিটির জন্যে একটু সহানুভূতি না জানিয়ে পারবে না। আসলে খড়ের মূর্তিটি মোটেই অসুখী নয়, কেননা তার বোধ শক্তিই নেই। কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে—যে কোনো মূহূর্তে' সে ধরাশায়ী হতে পারে। যে কোনো সময় মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা টানা গাড়ীর সওয়ার হওয়া তার পক্ষে কিছুমাত্র বিচিত্রও হবে না।
যারা ফৌজে কাজ করেছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, প্রত্যেক রেজিমেন্টের প্রত্যেক কোম্পানীতে একজন করে সার্জেন্ট-মেজর থাকেন। এদের ভেতর কেউ কেউ এমন অদ্ভুত বাতিক নিয়ে চলাফেরা করেন যে, জওয়ানরা আড়ালে-আবডালে এদেরকে 'কোম্পানীর সৎ মা' বলে ডাকে। এই 'মায়েরা' তাদের 'বাছাদের' প্রতি প্রায় অষ্টপ্রহরই বিমাতাসুলভ আচরণ করেন।
আমাদের কোম্পানীর সার্জেন্ট-মেজরটা ছিলো যেন শয়তানের যমজ ভাই। রাত্রিতে সে তাঁবুতে ঘুরে বেড়াতো কে কি করছে তা দেখবার জন্যে। তার দাপটে সারা ছাউনীতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা একেবারে। আর হবেই না বা কেন? কথায় বলে—ফকির বাদশা হয়, কিন্তু তার ফকরে-নজর বদলায় না। আমাদের মেজরেরও বেলায় তো সেই বিত্তান্তই। ছিলো একটা সামান্য সেপাই, দু'চারটে গুলি ছুড়ে প্রমোশন পেয়ে এখন একেবারে সার্জেন্ট-মেজর। কাজেই ধরাকে সরা জ্ঞান করবে সে ছাড়া আর কে?
আস্তিনে তে-কোণা হলদে ব্যাজ, মুখে হিংসুক হাসি। নতুন রিক্রুটদের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments