এক রাত্রির অতিথি

বুড়ো মাঝিটাকে তাড়া লাগানো বৃথা জেনেই অনিমেষ বহুক্ষণ আগে চুপ করেছিল। তার ফলে মাঝি আর আরোহী দুজনেই হাল ছেড়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছে। মাঝির বকাটাই রোগ—এমন কি ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল এইটেই পেশা। ওর বৌ কতদিন মরেছে, ছেলের বিয়ে দিয়ে কী ভুল করেছে, জামাই কেন মেয়েকে নেয় না—ছোট জামাইটা জুয়াড়ী, ছেলেটা নেশা করতে পেলে আর কিছু চায় না—খুব ছেলেবয়েসে একবার ও কলকাতা গিয়েছিল কিন্তু অত হট্টগোলে মাথা ঠিক থাকে না বলে পালিয়ে আসতে পথ পায় নি —আবার একবার যাবে মা কালীকে দর্শন করতে, ইত্যাদি তথ্য পরিবেশন করবার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র দম নেবার প্রয়োজনে যখন থামে তখনই শুধু দাঁড় বাইবার কথা মনে পড়ে ওর। সুতরাং শহরে যাবার বাস যে পাবে না তা অনিমেষ আগেই বুঝেছিল, কিন্তু এমন অবস্থায় যে পড়বে তা কল্পনা করে নি। বাস তো নেই-ই, আশেপাশে কোথাও মানব-বসতির চিহ্নও যেন চোখে পড়ে না।

নৌকা এসে যেখানটায় ভেড়ে সেখানে বাঁশের মাচা মতো একটা আছে, জাহাজঘাটা হলে অনায়াসে জেটি বলা যেত। সেই মাচাতে নেমে অসহায় ভাবে অনিমেষ একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। নিচে ময়ূরাক্ষীর কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। তার স্রোতের গতি থাকলেও তবু একটু প্রাণস্পন্দন বোঝা যেত—এত মন্থর তার স্রোত, এত নিস্তরঙ্গ--যে মনে হচ্ছে সমস্ত জলটা যেন জমাট বেঁধে স্তব্ধ হয়ে গেছে—আর তার সেই অতল কালো বুকে কত কী রহস্যময় জীব স্পন্দনহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে কৌতুকের হাসি হাসছে-

ওপারে ভগীরথপুর গ্রাম, বেশ সম্পন্ন গ্রাম তা সে জানে, বহু লোকের বাস, অনেক পাকা বাড়ি ইস্কুল ডাকঘর আছে কিন্তু এখান থেকে তার কিছুই দেখা যায় না। ঘাট থেকে উঠে যে রাস্তাটা গ্রামের দিকে গিয়েছে তা সাদা বালির আভাস নিবিড় বনের অন্ধকারে মিশে গেছে একটুখানি গিয়েই। দু'দিকে বড় বড় গাছ—কী গাছ তা বোঝা যায় না, কিন্তু তারই অসংখ্য শাখাপল্লব সমস্ত গ্রামটাকে যেন চোখের আড়াল করে রেখেছে। একটা আলোর রেখা পর্যন্ত চোখে পড়ে না।

ওপারেই যদি এই হয় তো, এপারের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এপারে 'যেদিন সে এসেছিল সেদিন দিনের বেলাও কোনও গ্রাম ওর চোখে পড়ে নি। বাসটা এসে একেবারে এই ঘাটের ধারে দাঁড়ায়, যাত্রীরা সবাই ভগীরথপুর চলে যায়। সেদিন অন্তত এমন কেউ ছিল না যে এপারে কোথাও যাবে। আসার সময়ও দুদিকে আমগাছের ঘন বন কাটিয়ে এসেছিল—বেশ মনে আছে। হয়ত ছিল কোথাও ঘরবাড়ি, কিন্তু তা ওর চোখে পড়ে নি।

পারাপারের জন্য একটা খেয়া নৌকো আছে, চওড়া ভেলার মতো প্রকাণ্ড বস্তু-কিন্তু শেষ বাস চলে যাবার পর আর ওপার থেকে কেউ আসবার সম্ভাবনা নেই জেনে সে ইজারাদারও বহুক্ষণ বাড়ি চলে গেছে নৌকোটা ওপারে বেঁধে রেখে।

‘বাবু ভাড়াটা?’—তাড়া লাগায় মাঝি।

বিহ্বলতা কাটে কিন্তু যেন আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে অনিমেষ।

‘ভাড়াটা কিরে! এই অন্ধকার রাত্রিতে আমি এখানে কোথায় থাকব? তুই তো এক ঘণ্টার রাস্তা সাত ঘণ্টায় এনে আমাকে এই বিপদে ফেললি। এখন নিদেন ওপারে পৌঁছে দে। দেখি কোথাও একটু আশ্রয় পাই কিনা, এপারে এই জঙ্গলে শেষ কি বাঘের পেটে প্রাণ দেব! চল, ওপারে নিয়ে চল্‌–' ‘উটি লারম আজ্ঞা!'

“সে কি! কেন রে? কী হয়েছে?

তার উত্তরে মাঝি যা বললো তার অর্থ হচ্ছে এই যে, ওপারে অন্য নৌকো গেলে খেয়ার ইজারাদার বড্ড বকাবকি করে, পুলিসে ধরিয়ে দেয়। সুতরাং ওপারে যাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

অনিমেষ তাকে অনেক ক'রে বোঝাল। ওপারে তাকে ধরবার জন্য ইজাদার যদি বসে থাকত তো অনিমেষ তাকেই ডাকত; শুধু ইজারাদার কেন, জনমানবের চিহ্ন থাকলেও সে মাঝিকে এ অনুরোধ

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice