শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে

আমাদের এই বিংশ শতাব্দী এবং বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকাল সমাজতন্ত্রের তথা সাম্যবাদের অভ্যুদয়ের উদয়াচল। অপরদিকে এই শতাব্দী ধনিকতন্ত্রের অস্তমিত হওয়ার কাল। এই কালসন্ধিতে সর্বদেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবন ও সাধনা পরস্পরবিরোধী আকর্ষণ বিকর্ষণের লীলাভূমি হতে বাধ্য। শিল্পীচিত্রের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও সর্বজনীনতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা ও দায়িত্বশীলতা এই শতাব্দীর শুরু থেকেই নতুন কালের রসায়নের ভাণ্ডে কখনো অপূর্ব বর্ণবিভাময় নব উপাদান গড়ে তুলেছে, কখনো ধুম্রবহ্নি সমন্বিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রতিভার জন্য ডেকে এনেছে বিপর্যয়, কিংবা সৃষ্টিকে করেছে অনাসৃষ্টি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে সোভিয়েট ইউনিয়নের বোরিস পাস্তারনাক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের লেখক-জীবনের বিস্ফোরিত গতি পরিণতি এই দ্বন্দ্বের লীলাভূমিকে প্রকট করে দেখিয়েছে।

এই পটভূমিতে স্বভাবতই শিল্পীচিত্তের পরস্পরবিরোধী আকর্ষণ বিকর্ষণগুলির এবং বিশেষ করে স্বাতন্ত্র্য ও সর্বজনীনতার পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্ন একালের একটা মূল সমস্যা হিসাবে সামনে এসেছে।

এই সমস্যার সমাধানে অগ্রসর সমাজতন্ত্রের তথা সাম্যবাদের পক্ষপাতী তাত্ত্বিকরা বলেছেন, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সর্বজনীনতা ও সর্বসাধারণের প্রতি দায়িত্বশীলতাকে শিল্পী সাহিত্যিকরা মূল প্রেরণা হিসাবে ঐকান্তিকভাবে গ্রহণ করলেই অনাসৃষ্টির সম্ভাবনা বিলুপ্ত হবে। অপরদিকে ধনিকতন্ত্রের পক্ষপাতী তাত্ত্বিকরা বলেছেন, ধনিকতন্ত্রের অতীত স্বর্ণযুগের স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিক স্বতঃস্ফূর্ততায় ফিরে গেলে শিল্পী সাহিত্যিকদের সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। সমাজতন্ত্রের তান্ত্রিকরা বলেছেন, যৌথ সমাজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও সাফল্যের মাধ্যমেই শিল্পী সাহিত্যিকদের মনোভূমি পরস্পরবিরোধিতার আবর্ত থেকে মুক্ত হবে। আর ধনিকতন্ত্রের তান্ত্রিকরা যে কোন রকম যৌথ প্রবণতাকে পরিহার করার জন্য শিল্পী সাহিত্যিকদের যুক্তি জোগাচ্ছেন। কোন কোন তাত্ত্বিক অবশ্য মধ্যপন্থা বার করে কিংবা তৃতীয় কোন অভিনব পথ আবিষ্কারের চেষ্টায় শিল্পীচিত্তের সংকটত্রাণসূত্র দাখিল করেছেন।

ইতিহাসের জয়পতাকা আজ সমাজতন্ত্রের হাতে। ইতিহাসের রায় সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিকদের পক্ষে। সুতরাং সোজাসুজি সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে, উপরোক্ত ত্রিপাক্ষিক মতামতের সংঘাতে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বই শিল্পীর কাছে মুক্তির পথ। এখানে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ নয় এই কারণে যে, সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তরেও জটিলতা রয়েছে। এই জটিলতা গতিপরিণতির বৈচিত্র্যের জটিলতা, আধুনিক বৈজ্ঞানিক জীবনের জটিলতা। এই কারণে শিল্পীচিত্তের স্বাতন্ত্র্য ও সর্বজনীনতার প্রশ্নে সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তরে রয়েছে বির্তকের অবকাশ, অন্তর্দ্বন্দ্বের অবকাশ। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এই অন্তর্দ্বন্দ্বের দরুন প্রচণ্ড মত-সংঘাত ঘটেছে। আভ্যন্তরীণ বলে এর তীব্রতা কম হয়নি। বরং একেক সময়ে মনে হয়েছে, প্রথমে উল্লেখিত তিনপক্ষের অভিমতের সংঘাতকে ছাপিয়ে গিয়েছে সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তরের তাত্ত্বিকদের আভ্যন্তরীণ বির্তক। এই বির্তকই মীমাংসার দাবিদার।

শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নের মীমাংসার প্রয়াস একটি বহুমুখী ও জটিল বিষয়। তবে মীমাংসার পথ অনির্দেশ্য নয়, এই পথ অন্ধকার পথও নয়। এ পথে কখনও সোজাসুজি, কখনও আঁকাবাঁকা হয়ে অঝোর ধারায় আলো এসে পড়ছে। এই আলোকধারাগুলিকে কেন্দ্রিভূত করতে হবে মুক্তির লক্ষ্যে।

দুই

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার যুগ্ম উদ্গাতা কার্ল মার্কস্‌ ও ফ্রেডরিক এঙ্গেল্‌স্‌ ঘোষণা করেছিলেন, ধনিকতন্ত্রের দুনিয়াব্যাপী সম্প্রসারণ একদিকে যেমন বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণীর উদ্ভব ঘটিয়ে বসেছে নিজের মৃত্যুবাণরূপে, তেমনি উদ্ভব ঘটিয়ে বসেছে বিশ্বসাহিত্যের। সেদিনকার বিশ্বসাহিত্যের মূল পাদপীঠ ছিল অবশ্য ইউরোপ। সে ছিল যন্ত্রবিপ্লবের পরীক্ষাগার। মার্কস্‌-এঙ্গেল্‌সের বিজ্ঞানসম্মত সচেতনতার উত্তরাধিকারে সজাগ আমাদের শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের কালে বিশ্ব সাহিত্যের পাদপীঠ আর শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই। সুতরাং, বিশ্বসাহিত্যের পরিধি ও বৈচিত্র্য আজ সাগর থেকে মহাসমুদ্রে পরিণত। দেশ-দেশান্তরের সাহিত্যশিল্পীরা আজ বিশ্বশিল্পী। তাছাড়া বিশ্বশিল্পী যে শুধু সাহিত্যের ডুবুরী নন, তিনি যে সঙ্গীত, ছবি, নাটক, ভাস্কর্য প্রভৃতির অশ্রান্ত রূপকার, সে কথাটা পূর্বাপেক্ষে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে। বৃটেনের হার্বার্ট রীড কিংবা সোভিয়েট ইউনিয়নের আইসেনস্টাইনের লেখা ‘শিল্পকলা’ সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনাগ্রন্থে ছত্রে ছত্রে এর অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ। এই প্রাচীরভেদী অঙ্গীকার বিশেষ করে আইসেনস্টাইনের লেখায় এক বহমান

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice