যাদুকর অধ্যাপক

সেই যে ১৯৬২ সালে আনিস স্যারের অধ্যাপনায় মুগ্ধ হয়েছিলাম আজ অবধি সেই মুগ্ধতায় চিড় পড়ে নি। বাংলা বিভাগে পড়ার আগে থেকেই স্যারের গুণমুগ্ধ হয়েছিলাম আমার দুই ভাই মুনীর চৌধুরী (শহীদ) ও আব্দুল হালিম (প্রয়াত) এবং বোন মমতাজ বেগমের সূত্রে নানা প্রসঙ্গে তাঁর প্রগতিশীল চিন্তাধারা ও কর্মকান্ড জেনে। সে সময়টা ছিল ছাত্র আন্দোলন, হল নির্বাচন, 'ডাকসু' নির্বাচন, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, কবিতা-পত্রিকা প্রকাশনা, গল্প, সাহিত্যচর্চা, একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে নানা কর্মকান্ডের যুগ। প্রায় প্রতিদিনই আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা উদ্বুদ্ধ থাকতাম ক্লাসের লেখাপড়া, লাইব্রেরির পড়াশোনা এবং অবসর সময়ে কাব্য-গদ্য চর্চায়। বাংলা বিভাগের অধ্যাপকদের প্রায় সকলেই আমাদের উৎসাহ দিতেন। তাঁদের মধ্যে মুহম্মদ আবদুল হাই, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আহমদ শরীফ, মনীর চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম এবং আনিসুজ্জামান স্যারের কথা বিশেষ করে মনে পড়ছে। সকলে মিলে বাংলা বিভাগকে তাঁরা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ-আন্তরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এঁদের উদার মনোভাব আমাদের জন্য গড়ে তুলেছিল চমৎকার পরিবেশ। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের বাইরে (ভাই মুনীর চৌধুরী বাদে) একমাত্র আনিস স্যারের সঙ্গে আমাদের অনেকেরই গড়ে উঠেছে ঘরোয়া সম্পর্ক। তাঁর কাছে বলা যায় সব রকম সমস্যার কথা, সংকটের কথা, সহযোগিতা চেয়ে পাওয়া যায় আশার চেয়ে বেশি। স্যারের মনের দরজাটা যেমন উদার-খোলামেলা, তেমনি অন্দর-সদর দরজাও উন্মুক্ত সকলের আনাগোনার জন্য। সেই অন্দর-সদর সামলাতে পেরেছেন তিনি বেবী ভাবীর (সিদ্দিকা জামান) মতো সঙ্গ, বন্ধু, স্ত্রী। বেবী ভাবী দশটা-পাঁচটা (বা কখনো আরও সকালে বেরিয়ে দেরিতে ফিরে) চাকরিস্থলে থেকেও ঘর-সংসার-স্বামী-সন্তানদের সামলিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করেছেন এবং করছেন। এই আপ্যায়নের মধ্যদিয়ে তিনিও হয়ে উঠেছেন সকলের প্রিয় ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে অনেকের মতো আমারও গড়ে উঠেছে একরকমের সখ্য। আনিস স্যারের কথা বলতে গেলে বেবী ভাবীর কথা আসবেই। তাঁদের দুজনের প্রীতি-স্নেহ পেয়ে আমি এবং মতিউর রহমান পরম আপুত। আমার স্যার অবলীলাক্রমে মতিরও স্যার হয়েছেন। সম্ভবত সকলের ভাষ্যেই এটা জানা যাবে যে, অধ্যাপক, ডক্টর আনিসুজ্জামান 'ডি-লিট' সম্মানে সম্মানিত হওয়ার অনেক আগেই 'স্যার' সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। আমরা তাঁকে 'স্যার আনিসুজ্জামান' বললে অত্যুক্তি হবে না।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ার সময় স্যারের প্রতিটি টিউটোরিয়ালে ও ক্লাশের পড়া মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি, পড়া শুনেছি এবং নোট করেছি। স্যারের চিত্তাকর্ষক পড়াবার গুণে মনে হতো ক্লাশের ঘণ্টা আরো বাড়ানো যেত যদি! তবে এটাও সত্য স্যারের অবসর সময় বলে আমরা কিছু থাকতে দিতাম না। দল বেঁধে বা একা তাঁর ঘরে যেতাম নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতাম, সাজেশন চাইতাম, রেফারেন্স বইয়ের নাম নিতাম। একটা বিষয়ে স্যার আমাদের উদ্বুদ্ধ করতেন (মুনীর চৌধুরীও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়) যে, মূল পাঠ্যবইটি খুঁটিয়ে পড়তে হবে, নিজের বিশ্লেষণ, মতামত তৈরি করতে হবে। অন্যের মতামত বা সমালোচনামূলক রেফারেন্স বই যত সমৃদ্ধ এবং উচ্চতর বিশ্লেষণপূর্ণ হোক না কেন তা পড়ার আগে ছাত্রের নিজের বিশ্লেষণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ এখনও আমাকে পরিচালিত করছে। তাঁর অধীনে পি.এইচডি'র গবেষণা করেছি (ডিগ্রি, ডিসেম্বর ২০০৪), বেগম পত্রিকার (১৯৪৭-২০০০) বিষয়ভিত্তিক সংকলনের মাধ্যমে নারী সমাজের জাগরণের সার্বিক ক্রমবিকশিত রূপায়ণের একটি গবেষণা কাজ শেষ করেছি (২০০৫)। নারীর কথা (১৯৯৪) এবং ফতোয়া (১৯৯৭) জেন্ডার কোষ (কাজ চলছে) বইয়ের সম্পাদনা কাজে আনিস স্যারের সঙ্গে থাকতে পারার সৌভাগ্য আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে।

মনে পড়ছে ১৯৬২ সালে ভয়ে ভয়ে প্রথম টিউটোরিয়াল খাতা জমা দেওয়ার কথা। বঙ্কিম সাহিত্য পড়াতেন স্যার। আগে পড়া বঙ্কিম রচনাবলী তখন খুঁটিয়ে পড়েছি, লিখেছি নিজের বিশ্লেষণ। নম্বর পেয়েছিলাম ৬২। কেন যে বেশি খুশি ও সন্তুষ্ট হলাম জানি

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice