আমাদের মুক্তিযুদ্ধ : বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
বাংলাদেশ হানাদার বাহিনী মুক্ত হওয়ার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের তিনি প্রথম রাষ্ট্রপতি এটাই তার বড় পরিচয় নয়। এর চেয়ে তাঁর মহত্তর স্বীকৃত হলো যে, সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের দিনগুলোতে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বৃটেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠন, প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধে সর্বতোভাবে সাহায্য করার প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্ব এবং নেতা সম্পর্কে তাঁর মনে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব, কোন সংশয় কিংবা বিপথগামী চিন্তা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি।
তাঁর 'মানবাধিকার' শীর্ষক বইতে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বলেছেন, "১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের স্থান পূরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তানের কারাগারে থাকলেও বন্দি হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং 'যার যা' কিছু আছে তাই নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান নয় মাস ধরে আমাদের নিরন্তর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তার নাম সেদিন হয়ে উঠেছিল বাংলার স্বাধীনতাকামী জনগণের মুক্তিমন্ত্র।"
স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেছেন। সেদিন তিনি ইউরোপ আমেরিকার সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন। কখনো লন্ডনে, কখনো প্যারিসে, কখনো ওয়াশিংটনে কিংবা কানাডার রাজধানী অটোয়াতে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজধানীতে তিনি পার্লামেন্টে কংগ্রেসে সিনেটে ভাষণ দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন বাঙালি জাতি অসীম সাহসে লড়ছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে। তিনি তাদের জানিয়েছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস অত্যাচার-হত্যা কাহিনী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: "পাকিস্তানি হানাদাররা হিটলারের পেটোয়া বাহিনীর কায়দায় বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে উদ্যত বাংলার সবুজ জমিন বাঙালির রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে, বাংলার নদী-নালা বাঙালির লাশে ভরে যাচ্ছে, নির্বিচারে নারী ও শিশু হত্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে গণহত্যা হচ্ছে। পাকিস্তানি গণহত্যাকারীদের থামাও। বাঙালি জাতি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের জন্য লড়ছে। তোমরা আমাদের সমর্থন দাও।"
সেদিন আমাদের জাতীয় জীবনের দুঃসহতম মুহূর্তে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সরকারি ও বিরোধী দলের ২৭০ জন এমপির লিখিত সমর্থন আদায় করেছিলেন।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের নিকট থেকে লন্ডনে অফিস খোলার অনুমতি আদায় করে নিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মৌখিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে তাঁর দৃঢ় ও সাহসী উচ্চারণ এবং একটি জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার যে জাতিসংঘের সনদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এ সম্পর্কে তার ক্ষুরধার যুক্তি ও ভাষণের জন্যই। একমাত্র তাঁর জন্যই বাকিংহাম প্রাসাদের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত ছিল। এ যে তাঁর প্রতি ব্রিটিশ সরকার ও রানী এলিজাবেথের কতখানি সম্মানের নিদর্শন, তা বলার জন্য কোন বাগজাল বিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতো তার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি।
আট নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলমগীর মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তার পিতাকে হারান। পাকিস্তানি হানাদারের গুলিতে যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
পিতৃহারা আলমগীর দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং পিতৃরক্তের ঋণ শুধতে ফ্রন্টে লড়ে চলেছে। অন্যান্য সহযোদ্ধার সঙ্গে সেও বিবিসি শোনে। শোনে কীভাবে প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশের রণাঙ্গনে যুদ্ধরত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দান করছে শেষ সম্বলটুকু। শোনে বিবিসিতে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার। উৎসাহিত হয়ে সে ফ্রন্ট থেকে চিঠি পাঠায় আবু সাঈদ চৌধুরীকে। চিঠিতে আলমগীর লেখে "স্যার, জান বাজি রেখে মাতৃভূমির জন্য আমরা লড়ছি। পাকিস্তানিদের বুলেটের আঘাতে প্রতিদিন সহযোদ্ধারা ঝরে ঝরে পড়ছে। যে কোন সময় আমিও হারিয়ে যাবো। আমার প্রিয় বাবাকে এই যুদ্ধে হারিয়েছি। যে স্বাধীনতার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments