বন্দর জেগে উঠছে বন্দর কাজ করছে
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
এপ্রিল মাসে বড়ো কঠিন সময় কাটল, তবে তার ইতিবাচক ফলাফল ক্রমশ দেখা দিতে লাগল; এবং যা-কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল সবই বাস্তবায়িত হতে লাগল। বিচ্ছিন্ন কিছু জাহাজ আমাদের নৌবহরের গতিপথ অনুসরণ করে বন্দরে এসে ভিড়ল এবং মাল খালাস করল।
মে মাসের প্রথম দিকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাবিশিষ্ট 'সুদর্শনা হংকং' ট্যাঙ্কার জ্বালানি বহন করে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করল। এটা ছিল উদ্ধারাভিযানের প্রথম সাফল্য। এর ফলে এদেশে প্রেরিত যাবতীয় সহায়তা ও মালামাল বন্দরে খালাস করার সুযোগ মিলল।
বাংলাদেশের জনজীবনে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এই বন্দর অবস্থিত। তার পানি পলিমাটি-ভরা হওয়ার কারণে বন্দরের জলসীমা অস্বচ্ছ, ঘোলাটে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই বন্দরের গুরুত্ব বর্ণনার অতীত। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে এ বন্দরে মাল ওঠানামার পরিমাণ প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন ছিল।
পাট ও পাটজাত অন্যান্য দ্রব্য রপ্তানি, যা বৈদেশিক মুদ্রার বেশির ভাগই অর্জন করত, তা এ বন্দর দিয়েই সাগরপথে যাত্রা করত।
আন্তর্জাতিক নানা সংগঠন ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা সাহায্য স্বরূপ বিভিন্ন মালপত্র চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশে প্রবেশ করত। পরে এসব মালামাল সড়ক, রেল ও নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে বন্দর অচল হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের সাগর পড়ে গিয়েছিল।
বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল প্রতিটি স্থবির দিন। ৫ লক্ষ অধিবাসীর বাসস্থান দেশের দ্বিতীয় মহানগরী চট্টগ্রাম দেখতে ভারি সুন্দর। নৌবন্দর ও রেলওয়ে জংশন ছাড়াও রাসায়নিক শিল্প ও লোহালক্কড়ের কারখানার জন্য বিখ্যাত। এ ছাড়াও আছে চা শিল্প, কার্পেট প্রস্তুত, ক্রেন তৈরির ব্যবস্থা।
গোটা শহরটি যেন নববধূর ঘোমটার মতো হালকা ধোঁয়াশার আচ্ছাদনে ঢাকা এবং ধানক্ষেতের আবরণে সজ্জিত। আপাতদৃষ্টিতে শহরটি যেন ঘুমিয়ে আছে। আলসে গাড়োয়ান গরুর গাড়ি নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঝিমুচ্ছে। কড়া রোদের ঝাঁঝ এড়াতে গাছতলায় রিকশা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে রিকশাওয়ালা। রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান, এই ভরদুপুরে সে কাকে নিয়ে কোথায় যাবে? তবে কি নিষ্ক্রিয়তা ও মন্থরতা এদের জাতীয় স্বভাব? যদি তাই হবে, তো চট্টগ্রামকে 'অগ্নিনগরী'ই বা বলা হয় কেন?
বাংলার সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রামবাসীরা বরাবরই অগ্রসেনানীর ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৩০ সালে গুটি কয়েক বিদ্রোহী চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক ছিলেন। বিদ্রোহের বজ্রনির্ঘোষ ধ্বনিত হয়েছিল তাঁদের দ্বারাই। বিট্রিশ উপনিবেশবাদী প্রশাসন শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
চট্টগ্রামের বিদ্রোহ সংবাদ বেতার মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন সেই বিদ্রোহ রক্তের বন্যায় দমন করেছিল।
বিদ্রোহের শীর্ষ নেতা সূর্য সেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর শত শত সমর্থককে আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। কিন্তু এই বিদ্রোহের স্মৃতি মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। ১৯৭১-এর ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক মানুষকে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
নবীন প্রজাতন্ত্র তার সূর্যালোকিত পতাকা উড়িয়ে চতুর্দিক আলোকোজ্জ্বল করে তুলেছিল। তবে দেশে তখন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে হতাশার অজস্র চিহ্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত বন্দর, ব্রিজ, বাঁধ, রেলপথ ও কলকারখানা। আমি বন্দরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়াকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে অনুরূপ যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি শুনিয়েছিলাম। তিনি শুনে বলেছিলেন।
আমাদের দু দেশের মানুষের ভাগ্যের কতই-না মিল। নতুন জীবনে পা ফেলতে এই দুটো জাতিকে কতই-না কষ্ট করতে হয়েছে। তবে আপনারা নিজের চেষ্টাতেই দেশ পুনর্গঠন করেছিলেন, আর এক্ষেত্রে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন আপনারা। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই বিজয় এনে দেবে। এজন্যই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে সোভিয়েত জনগণ সম্পর্কে লিখেছিলেন: 'আজ পৃথিবীতে অন্তত এই এটা দেশের লোক স্বজাতিক স্বার্থের উপরেও সমস্ত মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments