ইলা মিত্র ও নাচোলের কৃষকবিদ্রোহ
লেখক: মেসবাহ কামাল ও ঈশানী চক্রবর্তী
জনগণের আন্দোলন যেমনভাবে তার নেতৃত্বকে তৈরি করে, তেমনিভাবে নেতৃত্বের ভূমিকা নির্ধারণ করে আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতার সোপান। আবার অন্যদিকে সমসাময়িক ইতিহাসের কাঠামো যেমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তির ভূমিকাকে, তেমনিভাবে ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকাও বিকশিত করতে পারে জনগণের আন্দোলনকে, দ্রুততর করতে পারে পরিবর্তনের গতিবেগ। নাচোলের সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকদের মিলিত সংগ্রাম তৈরি করেছে তার নেতৃত্বকে যার পুরোভাগে ছিলেন রমেন্দ্রনাথ মিত্র, ইলা মিত্র, মাতলা মাঝি, শেখ আজাহার হোসেন, অনিমেষ লাহিড়ী, বৃন্দাবন সাহা প্রমুখ। তেমনি এই নেতৃত্বের এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকা নির্ধারণ করেছে এই বিদ্রোহের ফলাফল। এদের মধ্যে অনেকানেক কারণ মিলিয়ে বিশেষত ইলা মিত্রের ভূমিকা হয়ে উঠেছিল অনেকটা নির্ধারক যার প্রতিফলন পাওয়া যায় সাঁওতাল কৃষকের কাছে তার 'রাণী মা' হয়ে ওঠার মধ্যে। নাচেল ও তার পার্শ্ববর্তী থানাগুলোতে তাই আজো শোনা যায় অক্ষয় লোকগীতি—
"লীলা মৈত্রী নারী
আইন করল জারী
আধি জমি তেকুটি ভাগ
জিন হলো সাত আড়িরে ভাই
জিন হলো সাত আড়ি।"
বস্তুত নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ আর ইলা মিত্রের নাম এত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে ইলা মিত্র হয়ে উঠেছেন ঐ বিদ্রোহের মূর্ত প্রতিনিধি। তাঁর ভূমিকা নিশ্চিতভাবেই অনেকাংশে নির্ধারণ করেছে নাচোলে কৃষক জাগরণের অবয়ব।
খণ্ডিত বাংলার সকল অংশের সচেতন মানুষের কাছে ১৯৫০-এর দশকে নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ ও ইলা মিত্রের নাম ছিল অত্যন্ত সুপরিচিত। পরবর্তীকালে ব্যাপকতর পরিধির অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিড়ে এবং শ্রেণীজনিত কারণে নাচোলে কৃষক অভ্যুত্থান জনস্মৃতি থেকে প্রায় অপসারিত হলেও ১৯৯৬ সালে সাড়ম্বরে সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের ফলে তেভাগা আন্দোলন বিস্মৃত থেকে আপাতত রক্ষা পেয়েছে। তবে ইলা মিত্রের নাম বাংলার সকল অংশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী সক্রিয়তাবাদী এবং উদারনৈতিক চেতনার মানুষের কাছে বরাবরই অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। এদের সকলের কাছে ইলা মিত্র আজো অনুপ্রেরণার অভিন্ন উৎস এবং আদর্শনিষ্ঠার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অথচ এদের অনেকেই, বিশেষত পরবর্তী প্রজন্মের কর্মীরা, আজো জানেন না যে নাচোলে কৃষক প্রতিরোধের চরিত্র কি ছিল অথবা ইলা মিত্রের ভূমিকা কতটা বিস্তৃত।
এই বিদ্রোহের মূল শক্তি ছিলেন সাঁওতাল কৃষকেরা। তবে তাদের পাশাপাশি রাজবংশী, ওঁরাও, মুড়িয়াল সর্দার, মাহাতো ইত্যাদি অন্যান্য আদিবাসী এবং বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান কৃষকেরাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। রাজশাহী জেলা কমিউনিস্ট পার্টি ছিল এই বিদ্রোহের প্রধান সংগঠক।
নেতৃত্বকারী সাঁওতালদের মধ্য থেকে যে নামটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করতে হয়, সেটি হল মাতলা মাঝি। এছাড়া অন্যান্য আদিবাসী কর্মীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন মংলা মাঝি, টুটু হেমরম, চিতোর মাঝি, সাগারাম মাঝি, শুক্র মাডাং, চুতার মাঝি, সুখবিলাস বর্মন, ভগিরথ কর্মকার প্রমুখ।
নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ ছিল তেভাগা আন্দোনের একটা পরিবর্ধিত অংশ এবং তেভাগা আন্দোলন ছিল ফসলের অর্ধাংশের (নাচোলের ক্ষেত্রে একতৃতীয়াংশের) বদলে দুইতৃতীয়াংশ লাভের জন্য ভাগচাষিদের আন্দোলন। অর্থনীতির পরিভাষায় বলতে গেলে এটা ছিল ভূস্বামীকে দেয় খাজনার পরিমাণ অর্ধাংশ থেকে একতৃতীয়াংশে কমিয়ে আনার জন্য ভাগচাষিদের সংগ্রাম। এ আন্দোলন জমির ওপর কৃষকদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল না নিঃসন্দেহে, বরং এটা ছিল খাজনা কমানোর একটি অর্থনীতিবাদী আন্দোলন, কিন্তু অন্যান্য অনেক জেলার মতো রাজশাহীর নাচোলে এই আন্দোলন শ্রেণী-সংগ্রামের চরিত্র অর্জনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।
পটভূমি
নাচোল থানাটি বরাবরই চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাথে যুক্ত এবং ১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাগের পূর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার অন্তর্ভূক্ত। এই চাঁপাইনবাবগঞ্জে কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা প্রথম কখন শুরু হয় সে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কোনোকিছু জানা যায়নি। তবে শেখ আজাহার হোসেনের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে ১৯৩০-এর দশকে কমিউনিস্টরা নবাবগঞ্জের কোনো কোনো এলাকায় তৎপর ছিলেন। কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাই স্কুলের শিক্ষক কামার পাড়ার ফনিভূষণ মাস্টার, শিবগঞ্জের অজয় ঘোষ, কৃষ্ণগোবিন্দপুর মাইনর স্কুলের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments