১৮৯৯–১৯৫৪
জীবনানন্দ দাস
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদ জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস বিক্রমপুরের গাওপাড়া গ্রামে হলেও জন্মগ্রহণ করেন বরি...
See more >>-
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ, তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান, দেহের স্বাদের কথা কয়;বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট ক’রে দেবে তার সাধের সময়
চারিদিকে এখন সকাল— রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল;মাঠের ঘাসের ’পরে শৈশবের ঘ্রাণ—পাড়াগাঁর পথে ক্ষান্ত উৎসবের এসেছে আহ্বান।চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা-ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল; প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসেপেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশে! শরীর এলায়ে আসে এইখানে ফলন্ত ধানের মতো ক’রে,যেই রোদ একবার এসে শুধু চ’লে যায় তাহার ঠোঁটের চুমো
-
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদের জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।
জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে—এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায়—জীবনকে নতুন ক’রে প্রতিপালন করবার প্রযোজনে।
কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময়—বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় ব’লেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না
-
তুমি তা জানো না কিছু—না জানিলে,আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে’—পথের পাতার মতো তুমিও তখনআমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মনসেদিন তোমার!তোমার এ জীবনের ধারক্ষ’য়ে যাবে সেদিন সকল?আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;শুধু তার স্বাদতোমারে কি শান্তি দেবে;আমি ঝ’রে যাবো–তবু জীবন অগাধতোমারে রাখিবে ধ’রে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে,—আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।রয়েছি সবুজ মাঠে—ঘাসে—আকাশ ছডায়ে আছে নীল হ’য়ে আকাশে-আকাশে;জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়এই সব ছুঁয়ে ছেনে’;—সে এক বিস্ময়পৃথিবীতে নাই তাহা—আকাশেও নাই তার স্থল,চেনে নাই তারে ওই সমুদ্রের জল;রাতে-রাতে হেঁটে-হেঁটে নক্ষত্রের সনেতারে আমি পাই
-
কবিতা কি এ-জিজ্ঞাসার কোনো আবছা উত্তর দেওয়ার আগে এটুকু অন্তত স্পষ্টভাবে বলতে পারা যায় যে কবিতা অনেক রকম। হোমরও কবিতা লিখেছিলেন, মালার্মে র্যাঁবো ও রিলকেও। শেকস্পীয়র বদ্লেয়র রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টও কবিতা রচনা ক’রে গেছেন। কেউ-কেউ কবিকে সবের ওপরে সংস্কারকের ভূমিকায় দ্যাখেন; কারো-কারো ঝোঁক একান্তই রসের দিকে। কবিতা রসেরই ব্যাপার, কিন্তু এক ধরনের উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিজ্ঞতা ও চেতনার জিনিস—শুদ্ধ কল্পনা বা একান্ত বুদ্ধির রস নয়।
বিভিন্ন অভিজ্ঞ পাঠকের বিচার ও রুচির সঙ্গে যুক্ত থাকা দরকার কবির; কবিতার সম্পর্কে পাঠক ও সমালোচকেরা কি ভাবে দায়িত্ব সম্পন্ন করছেন—এবং কি ভাবে তা’ করা উচিত সেই সব চেতনার ওপর কবির ভবিষ্যৎ কাব্য, আমার
-
রৌদ্র-ঝিলমিল
উষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,
অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে-বারে
নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে।
উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,
উগ্র চুল্লীবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি’,
আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,
মরীচিকা-ঢাকা।
অগণন যাত্রিকের প্রাণ
খুঁজে মরে অনিবার, পায়নাকো পথের সন্ধান;
চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল;
হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধি-বিধানের এই কারাতল
তোমার ও-মায়াদণ্ডে ভেঙেছো মায়াবী!
জনতার কোলাহলে একা ব’সে ভাবি
কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি
বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী;
স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা
মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!
চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধা ধরণীর রুধিরলিপিকা,
জ্ব’লে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!
বসুধার অশ্রুপাংশু আতপ্ত সৈকত,
ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল,
-
বেলা ব’য়ে যায়,গোধূলির মেঘ-সীমানায়ধূম্রমৌন সাঁঝেনিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে,শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে;পান্থ ম্লান চিতার কবলেএকে-একে ডুবে যায় দেশ জাতি সংসার সমাজ;কার লাগি, হে সমাধি, তুমি একা ব’সে আছো আজ—কি এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!অতীতের শোভাযাত্রা কোথায় কখনচকিতে মিলায়ে গেছে পাও নাই টের;কোন্ দিবা অবসানে গৌরবের লক্ষ মুসাফেরদেউটি নিভায়ে গেছে—চ’লে গেছে দেউল ত্যজিয়া,চ’লে গেছে প্রিয়তম—চ’লে গেছে প্রিয়াযুগান্তের মণিময় গেহবাস ছাড়িচকিতে চলিয়া গেছে বাসনা-পসারীকবে কোন বেলাশেষে হায়দূর অস্তশেখরের গায়।তোমারে যায়নি তা’রা শেষ অভিনন্দনের অর্ঘ্য সমর্পিয়া;সাঁঝের নীহারনীল সমুদ্র মথিয়ামরমে পশেনি তব তাহাদের বিদায়ের বাণী,তোরণে আসেনি তব লক্ষ-লক্ষ মরণ-সন্ধানীঅশ্রু-ছলছল চোখে পাণ্ডুর বদনে;কৃষ্ণ যবনিকা কবে ফেলে তা’রা গেল দূর দ্বারে বাতায়নেজানো নাই তুমি;জানে না তো
-
সেদিন এ-ধরণীরসবুজ দ্বীপের ছায়া—উতরোল তরঙ্গের ভিড়মোর চোখে জেগে-জেগে ধীরে-ধীরে হ’লো অপহতকুয়াশায় ঝ’রে পড়া আতসের মতো।দিকে-দিকে ডুবে গেল কোলাহল,সহসা উজানজলে ভাটা গেল ভাসি,অতিদূর আকাশের মুখখানা আসিবুকে মোর তুলে গেল যেন হাহাকার।সেইদিন মোর অভিসারমৃত্তিকার শূন্য পেয়ালার ব্যথা একাকারে ভেঙেবকের পাখার মতো শাদা লঘু মেঘেভেসেছিলো আতুর উদাসী;বনের ছায়ার নিচে ভাসে কার ভিজে চোখকাঁদে কার বাঁরোয়ার বাঁশিসেদিন শুনিনি তাহা;ক্ষুধাতুর দুটি আঁখি তুলেঅতিদূর তারকার কামনায় আঁখি মোর দিয়েছিনু খুলে।আমার এ শিরা-উপশিরাচকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন,শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন—মোর তরে পিছু ডাক মাটি-মা—তোমার;ডেকেছিলো ভিজে ঘাস—হেমন্তের হিম মাস—জোনাকির ঝাড়,আমারে ডাকিয়াছিলো আলেয়ার লাল মাঠ—শ্মশানের খেয়াঘাট আসি, কঙ্কালের রাশি, দাউ-দাউ চিতা,কতো পূর্ব জাতকের পিতামহ পিতা, সর্বনাশ
-
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুলকুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুলজোনাকিতে ভ’রে গেছে; যে-মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রেচুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ–কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে-মাঠে ডানা ভাসাবারগভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক;আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাতএড়ায়ে উড়িয়া যায় দিগন্তের নম্র নীল জ্যোৎস্নার ভিতরে,আমরা রেখেছি যারা ভালোবেসে ধানের গুচ্ছের ’পরে
-
আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরেস্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;আমি তারে পারি না এড়াতে,সে আমার হাত রাখে হাতে,সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়শূন্য মনে হয়,শূন্য মনে হয়।সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারেসহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথাকে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তাকে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদকে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদসকল লোকের মতো কে পাবে আবার।সকল লোকের মতো বীজ বুনে আরস্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,শরীরে জলের গন্ধ মেখে,উৎসাহে আলোর দিকে চেয়েচাষার মতন প্রাণ পেয়েকে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?স্বপ্ন নয়—শান্তি
-
সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্য প্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।
বলতে পারা যায় কি এই সম্যক কল্পনা-আভা কোথা থেকে আসে? কেউ কেউ বলেন, আসে পরমেশ্বরের কাছ থেকে। সে কথা যদি স্বীকার করি তাহলে একটি সুন্দর জটিল পাককে যেন
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.

