নানির বাড়ির কেল্লা
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্
ফনুর একটা মস্ত সুবিধা। সেটা হল তার নানিবাড়ি। নানিবাড়ি তো নয় যেন সত্যিকার কেল্লা। গোটাকয়েক আম-জাম-লিচুগাছ আর কেমন জাতছাড়া হলদে রঙের বাঁশঝাড়ের পাশে নানির যে-ক্ষুদ্র বাড়িটি, সেটাই হল তার বিপদ-আপদের রক্ষাদুর্গ; এবং এ-রক্ষাদুর্গ থাকতে তার দুনিয়ায় ভয় নাই কিছুকে-এমন কি বাপের ঠেঙানিকেও না। মাঝে-মাঝে অবশ্য উঁই ফুঁড়ে যেন মছিবত ছোবল তুলে দাঁড়ায়। তখন আথালি পাথালি ছুটেও দিশে পাওয়া যায় না, নানির বাড়ির কেল্লা রীতিমতো চোখে সর্ষে হয়ে ফোটে তখন। এমন মছিবতের সম্মুখীন হলে অন্য কেউ হয়তো ঠাণ্ডা হয়ে যেত, কিন্তু ফনুর পেটে অহরহ শয়তান গুঁতায়, যে-গুঁতুনি আবার নানির বাড়ির কেল্লার নিশ্চিন্ত আরামে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে।
কেল্লায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকাকালে একদিন সকালে জীর্ণ জালটা কাঁধে ফেলে ফনু নদীতে যায়। জালটার ভার কম নয়, তবু সেটা এমন চমৎকার ঘাগরার মতো ঘুরিয়ে পানিতে ফেলে যে দেখে তাজ্জব হতে হয়।
খানিকটা উজানে নদীটা হঠাৎ কেচ্ছার মতো রহস্যময় হয়ে গেছে। ভাঙা, খাড়া তীরে বসে ফনু দশ-রকম চিন্তা করে খানিকক্ষণ। সাবধানী ছেলে ফনু, ডান-বাঁ না দেখে বা খারাপ-ভালো না ভেবে কোনো কাজ করে না। আকাশে এদিকে রোদ চড়ে, দূরে-দূরে শঙ্খচিলের নিঃশব্দ, মসৃণ চক্র শুরু হয়। সে-সব লক্ষ্য করে সে প্রায় শয়তানের মুখগহ্বরে থুতু ফেলে তীরে লুঙ্গি ছেড়ে খাড়াপাড় বেয়ে হনুমানের মতো নেবে যায়।
আধা-হাঁটু পানিতে হেঁটে-হেঁটে ফনু একঘণ্টার মধ্যে নানারকম মাছ ধরে। দেখতে না দেখতে বাইলা, কাটাইরা, ডংকু, মুলন্দি ও আরো কয়েক কিছিমের মাছে ভরে ওঠে চাইটা চাইটার পেছন দিকটা অবশ্য ভাঙা, কিন্তু মাছের বুদ্ধিতে ফনুর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই বলে সে-বিষয়ে সে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত। একটা-দুটো চোখের সামনে দিয়ে যখন পালিয়ে গেল তখন সে একটা বিচিত্র হাসি হেসে বললে, যা বেটা, ভাগ। কপালে তোর মরণ নাই, আমি কি মারবার পারি?
সত্যিকার মানুষ ফনু তখন গুম হয়ে আছে। নির্মল আকাশে কড়া উজ্জ্বল রোদ। কিন্তু এত আলো তার চোখে অন্ধকার হয়ে ওঠে, এবং সে-অন্ধকারে জীবনে প্রথম একটি কথা বোঝে। বোঝে, নানির বাড়ির কেল্লাটা একটি আস্ত ভুয়ো কথা। আসল জীবনের নির্মমতা থেকে ওখানে পালিয়ে বাঁচা যায় না।
কর্দমাক্ত কালো নগ্ন দেহে ফনু যখন আবার তীরে উঠে এল তখন দেখল যে, অদূরে বাবলাগাছের তলায় কে একটি লোক বসে। দেখেই কেমন সন্দেহ হয় তার, তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে চোখ।
লোকটি নিশ্চল হয়ে বসে আছে। ডান পাশে একটি কাপড়ের পুঁটলি, বসার ভঙ্গিতে শ্রান্ত মুসাফিরের ভাব। দেখেশুনে সন্দেহটা কিছু কমলে লুঙ্গি দিয়ে ভেজা গা মুছতে মুছতে ফন এগিয়ে যায়। নিকটে গিয়ে দাঁড়িয়েও কয়েক মুহূর্ত শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে তাকে, তারপর ভূমিকা না-করেই সরাসরি বলে, দেও গো বিড়িগা।
লোকটির ভুরুতে পথের ধুলো। চোখ আধা-বুজে গাল ভরে ধোঁয়া ছাড়ে। এবার শেষ টান মেরে ফনুকে বিড়িটা দেয়। তারপর গতর চুলকে হাই তুলে প্রশ্ন করে, কোন্ হানো তোর বাড়ি?
হাত প্রসারিত করে একসঙ্গে চতুর্দিকে দেখিয়ে ফনু বলে, ওই হানো। তারপর দূরে তাকিয়ে ঘন ঘন বিড়ি টানতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর হাত দিয়ে দূরে ইঙ্গিত করে বলে, মাইনষে কয় এইবার হেইহানো চর পড়ব। হেই চরে আমি ঘর বান্ধুম ।
লোকটি কোনো কথা কয় না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে একটা আস্ত বিড়ি দেয় ফনুকে। বলে, যাবি আমার লগে?
মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় ফনু। আবার চোখে ফুটে ওঠে সে-সন্দেহ, আর সঙ্গে-সঙ্গে সমগ্র ইন্দ্রিয় যেন সজাগ হয়ে ওঠে। শেষে রুদ্ধনিশ্বাসে বলে, কোন্ হানো?
—শহরে।
ফনু সাবধানী ছেলে। সাত-পাঁচ না ভেবে কথা কয় না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সব ভাবনা যেন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments