রাজা
তখন আমি ছেলে মানুষ, বয়স সাত বৎসর। হঠাৎ পায়রা পোষবার শখ মাথায় চাপল। কাঠের বাক্সের একটি খোপ বানিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে দিলুম,আর তিন-চার জোড়া পায়রা এনে সেখনে বসিয়ে দিলুম।
তাদের আদর যত্নের অন্ত রইল না। এই পায়রার নেশা যখন উগ্রভাবে মাথায় বর্তমান, সেই সময়ে এক দিন নানিজানের এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলুম। তাদের অনেক পায়রা ছিল। সেগুলি খেলছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের দেখতে লাগলুম। তাদের মধ্যে একটি কপোত আমার মনকে দখল করে বসল। তার গায়ের রং ছিল স্লেট পাথরের মত ধূসর। গলায় নীল রঙের পালকগুলি সূর্যের আলোয় চকমক করছিল। সে তার মাথায় উঁচু টোপরটি স্বগর্বে নেড়ে, ‘বাক বাকুম’ ‘বাক বাকুম’ করতে করতে আস্ফালন করে বেড়াচ্ছিল, আর অন্য কপোত কপোতীরা সম্ভ্রমে তার জন্য পথ ছেড়ে দিচ্ছিল। তার আকার ছিল অন্য পায়রার তুলনায় অনেক বড়। আমি স্বভাবতই তাকে দলের নেতা বলে মনে করলুম। ‘রাজা’ বলে ডাকতে ডাকতে তার কাছে গেলুম। সে আমাকে দেখে পালাবার চেষ্টা করল না, আগের মতই স্বগর্বে ‘বাক বাকুম’ করে বেড়াতে লাগল।
রাজাকে নিজের সম্পত্তিতে পরিণত করবার এক দুর্নিবার লোভ আমার মনকে পেয়ে বসল। ছেলেবেলার আগ্রহ কোন বাধা বিপত্তি মানে না। আমি তৎক্ষণাৎ নানিজানের কাছে গিয়ে আবদার ধরে বসলুম। পরের জিনিস লোভ করতে নেই, এই কিন্তু বোঝবার ছেলেই ছিলাম না। আমাদের আত্মীয়েরা আমার আবদারের কারণ জানতে পেরে বললেন, ‘তা নিয়ে যাও বাবা। তোমার যখন পছন্দ হয়েছে তখন আর কী করা যায়। ও পায়রাটি আর ওর জুড়িকে তোমায় বকশিশ দিলুম।’ নানিজানের আপত্তি সত্ত্বেও আমি তখন ‘রাজা’ আর ‘রানি’ কে নিয়ে স্বগর্বে বাড়ি এলুম। তাছাড়া তারা যাতে তাদের পুরানো আবাসে ফিরে যেতে না পারে, সেই উদ্দেশে কাঁচি দিয়ে তাদের পালক কেটে দিলুম।
মেঝেতে রাশি রাশি পালক ছড়ান রয়েছে, আর জায়গায় জায়গায় রক্তের বড় বড় দাগ। প্রকৃত ঘটনা বুঝতে আমার বাকি রইল না। কোণের কাছে একটা মই দাঁড় করানো ছিল। রাতে সেই মই দিয়ে উঠে খাটাশে রাজাকে ধরে নিয়ে গেছে। ছেঁড়া পালক আর রক্তের প্রাচুর্যে বুঝলুম রাজা, রাজার মতোই লড়াই করে মরেছে।
রাজা যেমন তার পুরানো রাজ্যে স্বচ্ছন্দে রাজত্ব করত আমাদের বাড়িতে আমার পায়রাগুলির মধ্যেও ঠিক সেইরূপ স্বচ্ছন্দে রাজত্ব করতে লাগল। তার এই নতুন আবাসে তাকে দেখলে মনে হত রাজা হবার জন্যই সে জন্মেছে; আর তার সমসাময়িকদের পক্ষে তার প্রাধান্য স্বীকার করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।
রাজার বেশভূষার একটা বিশেষত্ব থাকা দরকার মনে করে এক দিন একটি নূপুর কিনে তার পায়ে পরিয়ে দিলুম। রাজার পায়ের সেই নুপুরের ধ্বনি বড় সুন্দর শোনাত। নূপুরটি যে তারও বিশেষ এক গর্বের জিনিস ছিল, সে তার ব্যবহার দেখেও স্পষ্ট বোঝা যেত। ‘বাক বাকুম’ ‘বাক বাকুম’ করতে করতে পায়চারি করবার সময় নূপুরটিতে বিশেষ একটি তাল দিয়ে বাজাতে রাজা কোনোমতেই ত্রুটি করত না।
সকাল হলেই রাজা আর তার অনুচরেরা ঝটপট করে তাদের খোপ থেকে বারান্দায় নেমে আসতো। আমি তখন তাদের জন্য মেঝেতে ধান ছড়িয়ে দিতুম। তারা আগ্রহের সঙ্গে খুঁটে খুঁটে সেগুলো খেত, আর আমি মুগ্ধ নয়নে তাদের দেখতুম। রাজার ভোজনটা অবশ্য রাজার মতই হত। আহার সাঙ্গ করে রাজা ‘বাক বাকুম’ ‘বাক বাকুম’ করতে করতে তার অনুচরদের দলে ঘুরে বেড়ত আর তারা ব্যস্ত-ত্রস্তভাবে তার পথ ছেড়ে দিত। কোনো কপোতকে কোনো কপোতীর ওপর অত্যাচার করতে দেখলে কিংবা প্রবল কপোতকে দুর্বল কপোতের ওপর জুলুম জবরদস্তি করতে দেখলে রাজা তাদের শাস্তি বিধানে কিছুমাত্র ইতস্তত করত না। সে তার তীক্ষ্ম ঠোঁট দিয়ে ঠোকরাতে ঠোকরাতে সেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments