কিশোর কবি, কিশোর সভা ও কিশোর বাহিনী
কিশোর কবির কথা মনে উঠতেই আমাদের চোখের পাতায় ভেসে ওঠে সুকান্তের গালে হাত দেওয়া ছবিটি। পুরো নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭)। একুশ বছর না পুরতেই তিনি যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। মাত্র সাত বছরের কাব্যচর্চার মধ্যদিয়ে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিশোর বয়সে কাব্যচর্চার কারণে কিশোর কবির অভিধায় পরিচিতি লাভ করেছিলেন। জীবনের শুরুতেই তিনি লক্ষ্য স্থির করেছিলেন ব্রিটিশ পদানত দেশকে স্বাধীন করবেন, দেশের মানুষকে বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষকে নিপীড়ন-নির্যাতন, শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করবেন। আর কলমকেই বেছে নিয়েছিলেন হাতিয়ার হিসেবে।দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার ‘কিশোর সভা’ পরিচালনা এবং কিশোর সংগঠন ‘কিশোর বাহিনী’ গড়ে তোলার দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের যে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন ‘ছাড়পত্র’ কবিতায়, তিনি তা আজীবন রক্ষা করেছিলেন:
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
সুকান্তের জন্ম হয়েছিল ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০ শ্রাবণ, ১৯২৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় মাতামহের ৪২, মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়িতে। তাঁর পিতার নাম নিবারণ চন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবী। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনসিয়া গ্রামে। বাবা মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে সুকান্ত ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর অন্যান্য ভাইয়েরা ছিলেন সুশীল, প্রশান্ত, বিভাস, অশোক ও অমিয়। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন বৈমাত্রেয় দাদা মনোমোহন ভট্টাচার্যের স্ত্রী সরযু দেবীর কাছে। ছ বছর বয়সে তাঁকে ভর্তি করা হয় কমলা বিদ্যামন্দির-এ। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালে তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়’ বের করেছিলেন। এটা ছিল তাঁর জীবনেরও বড় সঞ্চয়। তাঁর লেখালেখি শুরুও তখন থেকে।
‘...তোমাদের কাজের রিপোর্ট খুব প্রশংসা করবার মতো। এমনি কাজ করলেই একদিন তোমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কিশোর বাহিনী হয়ে উঠবে। ...তোমরা জানো না তোমাদের চিঠি পেলে আমাদের কত আনন্দ হয়।’
ন বছর বয়সে ছড়া লেখে সুকান্ত পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে উৎসাহ লাভ করেছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে তাঁকে ‘দেশবন্ধু হাইস্কুলে’ ভর্তি করা হয়। সে সময় তিনি ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন। স্কুলের সহপাঠী ছিলেন অরুণাচল বসু। সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালে দু বন্ধু মিলে প্রকাশ করলেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’। ১৯৩৭ সালে সুকান্তের মা ক্যান্সার রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তাঁর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। তখন বাবা ও জ্যাঠা মশাইয়ের একান্নবর্তী পরিবারেও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ফলে স্কুলের পাঠ্য বিষয়ে অমনোযোগী হয়ে পড়েন সুকান্ত।
অল্পবয়সেই তিনি পাঠ করেছিলেন রামায়ণ ও মহাভারত। তারপর রবীন্দ্রনাথ এবং একজন শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় পড়া শুরু করেছিলেন ইংরেজি সাহিত্য। পাশাপাশি কাব্যচর্চা; অব্যাহত ছিল আমৃত্যু। গণিতে দুর্বল থাকায় দুবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েও কৃতকার্য হতে পারেননি। এরপর আর চেষ্টাও করেননি। তিনি নিজেই তাঁর ‘অতি কিশোরের ছড়া’-তে লিখেছেন:
তোমরা আমায় নিন্দা করে দাও না যতই গালি,
আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি,
কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া,
পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া।
সুকান্তকে আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিদ্রোহ-বিপ্লবের কবি হিসেবেই আমরা বেশি চিনি। শ্রেণিচেতনা ও শ্রেণিসংগ্রামের ক্ষেত্রে তার কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। জনতার সংগ্রাম বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের সংগ্রামকে অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারপরেও তাঁর কাব্য ও সাহিত্যভাবনায় কিশোর বয়সের চিন্তাচেতনার প্রতিফলন লক্ষণীয়। কিশোর বয়সের বন্দনা করে তিনি ‘আঠারো বছর বয়স’
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments