১ জানুয়ারি ১৯৭৩-এ কী ঘটেছিল
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এক বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র মিছিলে প্রথম পুলিশি গুলিবর্ষর্ণ ও ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। শহীদ হয়েছিলেন মতিউল ইসলাম এবং মীর্জা কাদেরুল ইসলাম। মিছিলটি ছিল ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়নের ঘোষিত 'ভিয়েতনাম দিবসের' সংহতি মিছিল।
ভিয়েতনাম। পঞ্চাশের দশক থেকেই এই নাম বাঙালির মনে আসন নেয়। ষাটের দশকে এসে তা এক আবেগপূর্ণ নামে পরিণত হয়। সারাবিশ্বে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাধে। এমনকি খোদ আমেরিকাতেও এই অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে শিক্ষক-ছাত্র-বুদ্ধিজীবী-বিবেকবান প্রগতিশীল মানুষ রাজপথে আন্দোলনে নামে। ষাটের দশক ছিল বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক সোনালি সময়। তখন ঔপনিবেশিকতার জাল ছিন্ন করে এক এক করে স্বাধীন হচ্ছে দেশ। সাম্রাজ্যবাদ পরাস্ত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষেই মানুষ উর্ধ্বে তুলে ধরছে সাম্য-মৈত্রী আর স্বাধীনতার বাণী। এসবের পিছনে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অনন্য। বিশ্বব্যাপী এই আন্দোলনের ঢেউ এদেশেও এসে লাগে। ফলে সেসময় এদেশে চলমান জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অনুপ্রেরণার অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হয়ে যায় বিপ্লবী ভিয়েতনামের নাম। এদেশেও তখন শ্লোগান ওঠে, "তোমার নাম, আমার নাম—ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম।"
সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই আরেকটি শ্লোগান এদেশের মুক্তিকামী বাঙালির কণ্ঠে উঠে আসে—"বিশ্বজুড়ে দু'টো নাম—বাংলাদেশ আর ভিয়েতনাম।" ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের মনে ভিয়েতনাম একটি দৃষ্টান্তমূলক অনুপ্রেরণা হিসেবে সাহস যোগায়। 'আঙ্কেল স্যাম'-এর বিশাল প্রতাপশালী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে 'আঙ্কেল হো'র বাহিনী যেভাবে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিল তা এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্যও ছিল অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক কমান্ডাররা ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা নিয়ে তা সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। এইসবের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী ভিয়েতনাম হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, ভিয়েতনাম তখনো শত্রুমুক্ত হয়নি। সুতরাং স্বাধীনতার পরও ভিয়েতনামকে নিয়ে মানুষের সেই আবেগ অটল থাকে। স্বাধীন দেশে ভিয়েতনাম সংহতি আন্দোলন আরো জোরদার হয়। বিশ্বব্যাপী ছাত্র-যুব-বুদ্ধিজীবী প্রগতিশীল বিবেকবান মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশেও সজোরে উচ্চকিত হতে থাকে, "ভিয়েতনামের বীর জনতা-আমরা আছি তোমাদের সঙ্গে।”
বাহাত্তর সালের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধকে তীব্রতর করে। মার্কিন সামরিক বাহিনী স্বাধীনতা উত্তর ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়, হাই ফং প্রভৃতি শহরে B-52 বোমারু বিমান দিয়ে হামলা শুরু করে। নাপাম বোমার আক্রমণসহ গ্রাম-শহর জ্বালিয়ে দিতে থাকে। এমনকি গ্রামে-গ্রামে ফসলের ক্ষেত পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হয় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে। যেন মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যায়। এই ভয়াবহতা, নৃশংসতা তখন সারা বিশ্বের বিবেক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই দেশের ছাত্র সমাজ এবং ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও এই বর্বর নৃশংসতা ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার ও নিন্দা জানানো হয়। ভিয়েতনাম সংহতি আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে এদেশের মানুষের মধ্যে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করা হয় এই নারকীয় হামলার প্রতিবাদ করার জন্য। কিন্তু সরকার তা করেনি। উল্টো স্বাধীনতার এক বছরের মাথায়ই দু'একটা ঘটনায় মনে হতে থাকে সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সরকারের নীতি সামান্য নরম হচ্ছে। তদুপরি দেশে সংঘটিত নানা ঘটনায় সরকারের দুর্বলতা ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড মানুষের কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল। আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে ততদিনে জাসদ সৃষ্টি হয়ে গেছে। সরকার বিরোধী আওয়াজও রাজপথে সোচ্চার হচ্ছিল। এই অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়ন ঠিক করে সরকারি দল, সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে দেশকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদকে টার্গেট করে গণআন্দোলন জোরদার করতে হবে। এইসব বিবেচনা থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ভিয়েতনামে জোরালো বোমাবর্ষণ শুরু করল তখন ভিয়েতনামের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments