যাদু-করা ফুল
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
বোরোভোয়ে হ্রদ থেকে গত গ্রীষ্মে বাড়ী ফেরার পথে এক পাইন অরণ্যের মধ্যেকার ফাঁকা জায়গা দিয়ে আমি হেঁটে আসছিলাম। শুক্রো গ্রীষ্মের সুগন্ধে ভরা ঘাস সর্বত্রই প্রচুর জন্মেছে। কিন্তু গাছের গুঁড়িগুলোর চারপাশেই সেগুলো সবচেয়ে ঘন। বয়েসের দরুণ সেগুলো এমন ছাতা পড়া যে পা দিয়ে সামান্য আঘাত করতেই গাঢ় তামাটে রঙের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়লো মিহি কফি গুঁড়োর মতো তারপর গাছ ফুটো-করা কীটের সুড়ঙ্গের আবরণ মুক্ত গোলক-ধাঁধার পথগুলো কর্মব্যস্ততায় স্পন্দিত হতে লাগলো। ডানাওলা পিঁপড়ে আর সামরিক ব্যান্ড বাজিয়েদের মতো লাল ছোপওলা চ্যাপ্টা পিঠ কালো কালো গুব্রে পোকাগুলো এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এই গুব্রে পোকাগুলোর নাম ঠিকই দেওয়া হয়েছে ‘ক্ষুদে সৈনিক’।
অবিলম্বে এক অলস বৃহদাকার মৌমাছি এক গাছের গুঁড়ির তলাকার চাক থেকে বেরিয়ে উড়োজাহাজের মতো গর্জন করতে করতে উড়লো উপরে। তার হুলটা রয়েছে বেরিয়ে, অনধিকার-প্রবেশকারীর কপালে ফোটাবার জন্যে তৈরী।
তরঙ্গায়িত বিরাট মেঘগুলোকে এমন নিরেট বলে মনে হচ্ছে যেন সেই উজ্জ্বল তুলোর গাদায় শুয়ে নীচের সহৃদয় পৃথিবীটাকে দেখা যায়, যেখানে রয়েছে অরণ্য, পেকে-ওঠা শস্য আর নানারঙের পশু পাল।
অরণ্যপ্রান্তের কাছের এক ক্ষেতে আমি দেখতে পেলাম কতকগুলো নীল ফুল। সেগুলো এমন জমাট বেঁধে গুচ্ছ-গুচ্ছ হয়ে ফুটেছে যে দেখাচ্ছে যেন গাঢ় নীল রঙের জলে ভরা ডোবার মতো।
এই ফুলের মস্ত এক গুচ্ছ তুলে নিলাম। ইতিপূর্বে এই ফুল কখনো আমি দেখিনি। এগুলোকে দেখতে ব্লু বেল-এর মতো। তফাৎ শুধু এই ব্লু বেলগুলো মাথা নীচু করে থাকে, কিন্তু এই ফুলগুলোর মাথা উপর দিকে খাড়া করা সেগুলোকে যখন ঝাঁকালাম তাদের ভিতরকার পাকা বীজগুলো ঝুমঝুমির মতো শব্দ করে উঠলো।
পথটা বন থেকে বেরিয়ে ক্ষেতে পড়েছে। তারপর শস্যক্ষেতের অনেক উপরে লার্ক পাখীর গান ছড়িয়ে পড়লে।। মনে হোলো তারা যেন রূপোর তারগুলো অলসভাবে বাজাচ্ছে, কখনো সেগুলো টানছে সামনে, কখনো পিছনে, কখনো দিচ্ছে সেগুলো ফেলে, তারপর পড়ার আগেই ফেলছে সেগুলো ধরে, যাতে বাতাস ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে।
এই পথ ধরে দুটি গ্রাম্য মেয়ে আমার দিকে হেঁটে আসছিল। নিশ্চয়ই তারা অনেক দূর থেকে আসছে, কারণ ফিতে দিয়ে বাঁধা ধূলোভরা জুতোগুলো তাদের কাঁধের ওপর রয়েছে ঝোলানো। তারা হাসছিল আর গল্প করছিল কিন্তু আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল রুমালের তলায় তাদের শণের মতো চুলগুলো ঠিক করে নিলো এবং ঠোঁটগুলো রইলো চেপে।
তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে রোদে পোড়া, ধূসর চোখ, হাসিখুসি ধরনের দুটি মেয়ে যখন ও রকম গম্ভীর ভাব দেখায় ব্যাপারটা তখন কী বিরক্তিকর বলো তো! কিন্তু তার চেয়েও খারাপ লাগে যদি তোমার পাশ দিয়ে চলে যাবার পর তাদের হাসির শব্দ পিছন থেকে শুনতে পাও।
আমি প্রায় চটে উঠছিলাম এমন সময় মেয়ে দুটি থেমে দুজনেই এমন সহৃদয় ভাবে হাসলো যে আমি একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। দূর ক্ষেতের মধ্যে এক নির্জন পথে কোনো মেয়ের মুখে ঝিকিয়ে ওঠা হাসির মতো সুন্দর আর কিছু নেই। চকিত এক মুহূর্তের জন্যে তার চোখের গভীরে আনন্দিত এবং প্রায় স্নেহশীল আলো যেন বিচ্ছুরিত হলো যা দেখে বিস্ময় স্তব্ধ হয়ে যেতে হয় যেন অকস্মাৎ সামনে এক হানি-সাক্ল্ অথবা হথর্ণ-এর ঝোপ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে, শিশির পড়েছে তার উপর আর সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
মেয়ে দুটি বললো, ‘ধন্যবাদ।’
‘কিসের জন্যে?’
‘এই ফুলগুলো নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে।’
মেয়ে দুটি দৌড়তে লাগলো, কিন্তু দৌড়তে দৌড়তে কয়েকবার হাসিমুখে পিছনে চেয়ে বলতে লাগলো, ‘ধন্যবাদ। অনেক, অনেক ধন্যবাদ!’
আমি মনে মনে ভাবলাম যে মেয়ে দুটির মনে ফুর্তি আর ধরছে না আর তারা আমায় শুধু ক্ষেপাতে চায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments