মাঝি
পদ্মাতে নতুন পানির শোরগোল পড়ে গেছে। পদ্মা নিজেকে বিস্তীর্ণ করেছে, যে জমিগুলো কোনো প্রকারে মাথা জাগিয়ে রোদ পোহানো কুমিরের মতো সূর্যের তলে নিজেকে প্ৰকাশ করেছিল, সে-গুলো আবার ঢেকে দিচ্ছে; কিন্তু ভাসিয়ে নিচ্ছে, আর দু-ধারের দুই দিগন্ত স্পর্শ করবার ব্যাকুলতা নিয়ে সে মুহূর্তে মুহূর্তে নিজের সবল দেহ প্রসারিত করছে, ফুলে-ফুলে গর্জে-গর্জে হিংস্র ঔদার্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ওধারে ঘোলাটে আকাশে কেমন হাওয়া। থেকে থেকে সে হাওয়া এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মনিরুদ্দিনের ঘাসী নৌকাটা কাত হয়ে ওঠে। হাল ধরছে সে নিজেই, মাঝি দুটো ছইয়ের এধারে উবু হয়ে বসে রাতের রান্নার ব্যবস্থা করছে। ছইয়ের ভেতরে ওদিকটায় দুটি প্রাণী—স্বামী আর স্ত্রী; তারা যাত্রী। কলকাতা থেকে আসছে তারা, সম্ভবত ধনী। বেশভূষা আর চেহারা দেখে তাই মনে হয়। মাঝি দুটো আড়চোখে কখনো-সখনো তাকিয়ে দেখে। দেখে তাদের লোভ হয়। হয়তো সৌন্দর্য দেখার লোভ, বা ধনীকে দেখার লোভ : একবার দেখে সাধ মেটে না, পরক্ষণেই আবার তাকাতে হয়। এদিকে মনিরুদ্দিনের সে-দুর্বলতা নেই। কড়া স্রোতে হাল নিয়ে ব্যস্ত, চিন্তা তার নদী, আকাশ, আর যাত্রীদের গন্তব্যস্থান। যাত্রীরা তার কাছে তুচ্ছ। তাছাড়া হাল ধরে দাঁড়িয়ে ছইয়ের ভেতরটা নজরে পড়েও না। দৃষ্টি তার সামনে, খোলা হাওয়া এসে থেকে-থেকে আঘাত দেয় বটে রোদ-পানি ও ঝড়ঝাপটায় রুক্ষ অথচ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠা চোখে, তবু সে দৃষ্টি চলে যায় দূরে, দিগন্তে, এবং দিগন্তের শেষে কেমন ঈষৎ বেগুনি-নীল রঙের মেঘ যে জমাট হয়ে রয়েছে, তাতেও সে দৃষ্টি যেন বাধা পায় না, সে পুঞ্জীভূত মেঘ ভেদ করে কোথায় চলে যায় কোথায়? একদিন : সেদিনও এমনি। সেদিন এমনি এক বিকালে দূর-দিগন্ত ঘিরে মেঘ জমেছে ঘন হয়ে আর স্তরে স্তরে, আর দিগন্তপ্রসারিত পদ্মায় স্তব্ধতা। হয়তো পদ্মা আশঙ্কায় স্তব্ধ ছিল, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার অমঙ্গল চিন্তায় আচ্ছন্ন নিথর কপালের মতো। কিন্তু তার বাপ তখন সরকারের নৌকার মাঝি। পদ্মা নদীর বুকে-বুকে অল্প পানির সাবধানী সঙ্কেত হিসেবে সন্ধ্যার পর আলো জ্বেলে দেয়া ছিল তার কাজ। ওই যে দূরে একটু বাঁকের মতো নজরে পড়ে সে স্থানটা যেমনি চওড়া তেমনি তার ও-ধারটায় স্রোতটা খরতর। কিন্তু ঠিক মাঝখানে আবার একটু চরের মতো, অবশ্য পানিতে ডোবা। ওখানে ছিল একটি সাবধানী সঙ্কেত।
মুহূর্তের জন্য মনিরুদ্দিন ভুলে গেল তার চোখের তীক্ষ্ণতা ও কণ্ঠের দৃঢ়তার কথা, তার সারা অন্তর আকুলভাবে প্রশ্ন করলে, বিপদ-তো অন্য কারো, ওই যে মেয়েটি মহাশক্তির মধ্যে একবিন্দু দুর্বলতার মতো অসহায়ভাবে বসে রয়েছে তার তো বিপদ নয়, তাকে কেন এক বিপদের মধ্যে সে টেনে নিয়ে যাবে? যদি মাঝ দরিয়ায় ঝড় ওঠে, যদি ওঠে? কিন্তু মুখে কিছু সে বললে না... মুখ উঠিয়ে আনবার সময় এক পলকের জন্য নজরে পড়ল তার—বাবুটির হাতের কাছে বন্দুকের মতো কী যেন। হয়তো সে তীক্ষ্ণতা ঐ বন্দুক হতেই জেগেছে বাবুটির চোখে। আকাশে মেঘ তেমনিই জমাট। হঠাৎ কেমন এক আকুলতায় মনিরুদ্দিন মনে-মনে বললে, খোদা, ঝড় কি আসব না? মাঝ দরিয়ায় তো নাও পৌঁছল তবু ঝড় কি আসব না?
দূর-দিগন্তে মেঘ জমছিল, আর সূর্য ডুবতে-না- ডুবতেই অমাবস্যার সন্ধ্যা ঘনিয়ে উঠে একেবারে রাত হয়ে গেল। মনিরুদ্দিনের বাপ ছমিরুদ্দিন সেদিন ধাঙরবাড়ির হাটে গিয়েছিল, ফিরতে একটু দেরি হওয়ায় এ-দিকে সাবধানী সঙ্কেতের কাছে গিয়ে পৌঁছাবার আগেই আকাশ এত কালো হয়ে উঠল যে, মনে হল যেন রাত অনেক গভীর হয়ে উঠেছে। মনিরুদ্দিন তখন ছোট বটে, তবে সেদিনের কথা তার মনে আছে। আকাশে কী রঙের মেঘ জমেছিল, এবং কোন কোণ হতে ধীরে-ধীরে তা মাথা জাগিয়ে উঠেছিল—তা তার মনে আছে স্পষ্ট। বাপ যাবার সময় তাড়াহুড়ো করেছিল—তাও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments