আদি মানবের গল্প
আচ্ছা, তোমাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে কীভাবে, কতদিন আগে পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, তাহলে তোমরা কি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে? আমি জানি, তোমাদের মধ্যে অনেকেই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ধাঁধায় পড়ে যাবে। অবশ্য এতে তোমাদের লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, কারণ প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমাদের বড়দের পক্ষেই দেওয়া খুব কঠিন। আমাদের বিজ্ঞানী-ইতিহাসবিদেরা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে সবাই একমত হতে পারেন না।
এর কারণ কী, তা জানো? এর কারন হচ্ছে যে মানুষের জৈবিক বিবর্তন ও সভ্যতা বিকাশের ইতিহাস এখনও ঢাকা রয়েছে ঘন কুয়াশার অন্তরালে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন যুগে বসবাসকারী মানুষের কাছাকাছি আকৃতির প্রাণীর নানা রকম জীবাশ্ম অনেক রহস্যের জন্ম দিয়েছে। জীবাশ্ম বা ফসিল কাকে বলে, তা কি তোমরা শুনেছ? এটি হচ্ছে প্রাচীন প্রাণী, মাছ কিংবা গাছপালার অবশেষ, যা বহু লাখ বা কোটি বছর যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন শিলাস্তরে চাপা পড়ে ছিল। এই জীবাশ্মগুলোর উপর নানা গবেষণা করে আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে আমাদের বেশির ভাগ ধর্মগ্রন্থে যে রকমটি লেখা রয়েছে, মানবজাতির ইতিহাস মোটেও সে রকম মাত্র কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস নয়।
আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে একজন আইরিশ খ্রিস্টান পাদরি জেমস উশার গণনা করে বের করেছিলেন যে আমাদের এই বিশ্বজগৎ ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন খ্রিষ্টপূর্ব ৪,০০৪ সনের ২৩ অক্টোবর, রবিবার সকাল নয়টায়। তখনকার অনেক লোকই তাঁর গণনা করা এ দিন- তারিখটি বিশ্বাস করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এর পরবর্তী কয়েকটি শতাব্দী জুড়ে অনেক বিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক কিন্তু জেমস উশারের এই নিশ্চিত বিশ্বাসে একমত হতে পারেননি।
এর কারণ কী, তা জানো? এর কারণ হচ্ছে যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত মমি ও তুষার-সমাধিপ্রাপ্ত মানুষের মৃতদেহ, যেগুলো প্রায় অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে; নানা রকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সেগুলোই অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার বছরের পুরনো বলে সনাক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে পৃথিবীর বুকে মানুষের আদি যুগের নানা কর্মকাণ্ড—যেমন গুহার দেয়ালে আঁকা চিত্র, প্রাচীন যুগে মানুষের ব্যবহৃত হাতিয়ার, তৈজসপত্র—ইত্যাদি থেকে প্রমাণ হয় যে আমাদের এই সভ্যতার বয়সই ১০ থেকে ১২ হাজার বছর। আবার আদি মানবের নানা রকম জীবাশ্ম সাক্ষ্য দেয় যে পৃথিবীতে মানুষের মতো দেখতে প্রাণী—যাদেরকে আমরা মানবসদৃশ প্রাণী বলি, তাদের ইতিহাস কয়েক লাখ বছরের পুরনো। তাহলে জেমস উশারের মাত্র ৬ হাজার বছর বয়সী পৃথিবীর গল্পটি আর কী করে সত্য হয় বলো?
মানুষের পূর্বপুরুষদের অনেকগুলো প্রজাতি থেকে আমাদের এই একটি মাত্র প্রজাতি কীভাবে পৃথিবীর বুকে টিকে রইলো এবং অন্যরা পৃথিবী থেকে হারিয় গেল, আমাদের বিজ্ঞানী-ইতিহাসবিদেরা এ প্রশ্নটির সঠিক উত্তর এখনও দিতে পারেননি। তোমরা হয়তো জানো যে আমরা আমাদের নিজেদেরকে বলি ‘হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স’—যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী মানুষ। আরসারা পৃথিবীর সাদা-কালো-পীতবর্ণ, সবধরণের মানুষই এই একটিমাত্র প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের এই প্রজাতি, অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সের কিছু পূর্বপুরুষের জীবাশ্মও আমরা খুঁজে পেয়েছি, যারা দেখতে ঠিক আমাদের মতো না হলেও আমাদের খুব কাছাকাছি। আমরা তাদের নাম দিয়েছি ‘হোমো হ্যাবিলিস’ বা সক্ষম মানুষ, ‘হোমো ইরেকটাস’ বা খাড়া হয়ে চলা মানুষ, ইত্যাদি নানা নাম। এরা অবশ্য অনেক আগে—অর্থাৎ ৫, ১০ বা ২০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত। আমরা জানতে পেরেছি যে তারা তাদের আদি উৎপত্তিস্থল পূর্ব আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, যারা কর্কশ ও অমসৃণ পাথরের অস্ত্র দিয়ে নানা ধরনের জীবজন্ত শিকার করে বেঁচে থাকত।
এই আদি মানুষদের উত্তরসূরীরাই এক-সময়ে আগুনকে আয়ত্বে এনে তাকে নিজেদের কল্যাণে ব্যবহার করতে শেখে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments