সংগঠক ও সংগঠন
আমরা মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় প্রজন্ম। সঙ্গত কারণেই ব্রিটিশবিরোধী লড়াকু বিপ্লবীদের সান্নিধ্য আমরা পাইনি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধাদের আমরা দেখেছি, সান্নিধ্যও পেয়েছি। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, তাঁদের সংগ্রাম আমাদের উদ্বেলিত করে। আগে এক শিশুতোষ ভাবনা ছিল—যদি সেই অগ্নিযুগে জন্ম হতো তবে দেশমাতার মুক্তির জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতাম, অথবা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতাম। এখন বুঝি, এসব রোমান্টিক ভাবনা নেহাতই ছেলেমানুষি। লড়াই বা সংগ্রাম শুধু ঘটমান অতীত বিষয়টি মোটেও তেমন নয়—লড়াই—ছিল, আছে, এবং থাকবে। এই সময়ে চলমান লড়াইকে সুসংঘবদ্ধ ও সুসংহত করতে পারলে নিশ্চয়ই অতীতের মতো আমরাও ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষর রাখতে পারবো।
মানুষের মুক্তির মন্ত্র ঘরের মধ্যে অথবা নিজের ডিজিটাল জগতে দিন-রাত জপ করলে মুক্তি আসে না। সেই মন্ত্র অন্যের কানে পৌঁছাতে হয়, দীক্ষা দিতে হয়। তবেই না মানবমুক্তির সে লড়াই প্রকৃত লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। ছোটবেলায় বাঁশের মেকি তলোয়ার নিয়ে আমরা ঈশা খাঁ, টিপু সুলতান, সিন্দাবাদের মতো তলোয়ার যুদ্ধ খেলতাম। সে যুদ্ধ থাকত পূর্বনির্ধারিত। কে বাঁচবে, কে মরবে তা ছিল সাজানো—নেতা গোছের হাতেগোণা মাত্র কয়েকজন সাজাতাম বিষয়টা—বাকিরা ছিল সে খেলার অংশমাত্র। আজ এই পরিণত বয়সে এসে এসব যতই হাস্যকর মনে হোক না কেন, এখনও কি একই রকম রাজনৈতিক খেলায় মেতে নেই!—আমরাও কি আমাদের নেতাগোছের কারও কারও খেলার ক্রীড়নক নই? এই প্রশ্ন একান্তই নিজেকে করা, ভাববেন না যেন এসব প্রশ্ন সেইসব নেতাগোছের মানুষদের করছি।
শোষণহীন সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে সাম্যবাদী আন্দোলনে যুক্ত হওয়া। তরুণ বয়সে সেই স্বপ্ন আজ স্বাভাবিক মনে হলেও তা একেবারে সহজ বা সরল ছিল না। সবাইকেই সেই কঠিন পথ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। এর মধ্যেই ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক নানা কারণে হতাশা গ্রাস করতো। সেই সব হতাশাকে ঠেলে বারবার লড়াইয়ের ময়দানে ফিরতে হয়েছে। যাদের কারণে সেটা করতে পেরেছি তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কমরেড আনোয়ার হোসেন। তিনি একজন সরলপ্রাণ-দিলখোলা মানুষ। আমৃত্যু করে গেছেন শ্রমিক রাজনীতি। নিজের জীবনের হাজারো কষ্ট আলগোছে পাশে সরিয়ে রেখে আমাদের স্বপ্নের লড়াইয়ের কথা বলতেন।
আজ তাঁর জন্য এই ছোট্ট স্মরণিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে অধুনালুপ্ত পুরনো-স্মৃতি হাতড়ে তুলে আনতে হচ্ছে। একদম সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন তিনি; কিন্তু সমাজ-সচেতন, নীতিনিষ্ঠ। নেত্রকোনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। নেতা বলতে আমরা যেমনটা বুঝি—তিনি আদতে তা ছিলেন না। প্রকৃতবিচারে তিনি ছিলেন সংগঠক। চেষ্টা করেছেন নিজের বিশ্বাস ও আস্থাকে নিজের পরিবার ও আশপাশে ছড়িয়ে দিতে। এ কাজে তিনি আমাদের অনেক নেতার চেয়ে সফল।
একটি কমিউনিস্ট পার্টিতে নেতা-সংগঠক-কর্মী-সমর্থকদের সমসত্ত্ব মিশেল থাকতে হয়। এর বাহ্যিক কাঠামো দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। কিন্তু বর্তমান অবস্থা ঠিক তার উল্টো। এমতাবস্থায় পার্টিতে সবচেয়ে বড় সংকট সংগঠকের। নিকট অতীতের প্রায় সব নেতৃত্ব সংগঠন গড়তে সংগঠক খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয়েছে বা অনেকক্ষেত্রে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা সচেতনভাবে উপেক্ষা করেছে। বর্তমানে সারাদেশের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে সংগঠকের চেয়ে নেতা বেশি। সে নেতা আবার ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল’ গোছের। এ অবস্থাটা বোঝানোর জন্য ভিন্ন প্রসঙ্গের একটি উক্তি উল্লেখ করছি: ‘সমগ্র শরীরকে বঞ্চিত করে কেবল মুখে রক্ত জমলে তাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না।’—[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর] এখন আমাদের উল্টো পিরামিডের মাথায় সব নেতারা বসে আছেন আর নিচের সংগঠক-কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা ক্রমশ সরু হয়ে নেমে এসেছে বাংলার জমিন বরাবর। এটা স্বাভাবিকতা বা সুস্থতার নির্দেশক নয়। এ অবস্থার গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন না ঘটলে দলীয় বা জাতীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে না। আজকের বাংলাদেশের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments