উৎসের রজতজয়ন্তী : এক আলোকবর্তিকা যাত্রার প্রামাণ্যচিত্র

একটি প্রতিষ্ঠানের পঁচিশ বছর বা রজতজয়ন্তী নিছক একটি মাইলফলক নয়, এটি হচ্ছে আত্মমূল্যায়নের আয়না, অভিজ্ঞতার ভান্ডার, সৃষ্টির নেপথ্য সংগ্রামের ইতিহাস। ‘উৎস প্রকাশন’-এর (২০০১-২০২৫) রজতজয়ন্তী সে রকমই একটি গৌরবোজ্জ্বল মূহূর্ত; যার জন্ম, বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠায় আছে একজন নিরলস, মেধাবী, স্বপ্নবান মানুষের নিরবধি শ্রম, একাগ্রতা ও শিল্পবোধ। তিনি মোস্তফা সেলিম। প্রকাশক হিসেবে যেমন তিনি অনন্যতা অর্জন করেছেন, তেমনি লেখালেখি ও গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সমীহ জাগানো উচ্চতায়। তিনি, সিলেটি নাগরীলিপির নবজাগরণের পথিকৃৎজন। ‘নাগরীলিপিবিদ’ হিসেবে একাডেমিক অঙ্গনে তাঁর রয়েছে স্বীকৃতি। ফোকলোর এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সেলিম ভ্রমণ নিয়েও একাধিক গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন পাঠককে। প্রতিভাময় বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সেলিম পেশাজীবনের এক স্বর্ণক্ষণে পদার্পণ করেছেন এ-বছর। দায়বদ্ধ প্রকাশনায় নজিববিহীন ভূমিকা রেখে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘উৎস প্রকাশন’ এখন দেশে-বিদেশে নন্দিত। রজতজয়ন্তী বর্ষে উৎস প্রকাশনের যাত্রাপথের বাঁকে বাঁকে আকা পথরেখাগুলো অবলোকন করা দরকার।

ছাত্রজীবন থেকে প্রকাশনার পথযাত্রা

১৯৮১ সালে বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর হাইস্কুলে আমার শিক্ষকতা জীবনের দ্বিতীয় বছরে শ্রেণিকক্ষে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তখনই ছেলেটির মধ্যে আমি লক্ষ করেছিলাম এক ধরনের স্বতন্ত্র আলো-শিল্পচেতনার সূক্ষ্ম বোধ, বিশ্লেষণী মনন এবং নিজেকে প্রকাশ করার প্রবল আকাক্সক্ষা। বয়সের তুলনায় চিন্তার গভীরতা ও ভাষার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সময়েই মনে হয়েছিল, এই শিক্ষার্থী সাধারণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরেই মোস্তফা সেলিম ছিলেন সক্রিয় ও দৃশ্যমান। সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, সাংবাদিকতা ও ছাত্রনেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল সরব উপস্থিতি ও প্রতিভার স্বাক্ষর। তিনি কেবল অংশগ্রহণকারী নন; বরং উদ্যোগী সংগঠক হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদে ‘সাহিত্য ও বিতর্ক সম্পাদক’ হিসেবে (১৯৯০) নির্বাচিত হওয়া এবং একই বছরে কলেজ ছাত্রাবাসের ‘ছাত্রাধিনায়ক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন, এই দুটি অর্জন তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্পষ্ট প্রমাণ।

কলেজজীবনেই ভবিষ্যতের প্রকাশক ও সম্পাদক সেলিমের প্রস্তুতি পর্বটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদ্দাম (১৯৮৮) সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তিনি সম্পাদকীয় দায়িত্বের প্রথম পাঠ নেন। একই সময়ে সিলেটের ডাক-এর ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে সমাজ ও সময়কে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে এবং ভাষা ও বাস্তবতার সংযোগ গড়ে তোলে।

ক্যাম্পাসজীবনে লেখালেখির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠা সেলিম একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সম্পাদনা করেন ছাত্রাবাস বার্ষিকী সংযোজন (১৯৯০), কলেজের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সপ্তাহ উপলক্ষে প্রকাশিত ঈষিকা (১৯৯০)। এগুলো ছিল শিক্ষাঙ্গনের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর সম্পৃক্ততার সূচনা। স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পরপরই তিনি সম্পাদনা করেন বিজয় অনির্বাণ (১৯৯০), যা কেবল একটি স্মরণিকা নয়, বরং সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন।

এইসব কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ছাত্রজীবনেই মোস্তফা সেলিম নিজের ভেতরে গড়ে তুলেছিলেন একজন সম্পাদক, সংগঠক ও প্রকাশকের বীজ। পরবর্তী সময়ে যে দায়বদ্ধ প্রকাশনার পথে তিনি অগ্রসর হয়েছেন, তার শিকড় নিহিত ছিল এই সময়ের নিরন্তর সাধনা, দায়িত্ববোধ ও স্বপ্নবহ সাহসে।

উৎস প্রকাশন : জ্ঞানচর্চার দায়বদ্ধ এক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ

বাংলা প্রকাশনা জগতে উৎস প্রকাশন একটি ব্যতিক্রমী নাম, কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল বই প্রকাশের বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জ্ঞানচর্চা, ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিকাশকে কেন্দ্র করে নিজস্ব একটি দৃষ্টান্ত নির্মাণ করেছে। ঢাকায় এসে মোস্তফা সেলিম ২০০১ সালে উৎস প্রকাশন প্রতিষ্ঠা করেন এমন এক সময়ে, যখন প্রকাশনা ক্ষেত্র দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঝুঁকছিল। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি যে পথ বেছে নেন, তা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে গভীর অর্থবহ। উৎস প্রকাশনের জন্মলগ্ন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে; এটি কোনো প্রথাগত মুনাফানির্ভর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নয়;

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice