বই
অগ্রন্থিত গল্পাবলি
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবৎকালে তাঁর তৃতীয় কোনো গল্পগ্রন্থ বেরয়নি। সাংবাদিক গবেষক সৈয়দ আবদুল মকসুদ ও অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন অন্তত ৩২টি অগ্রন্থিত গল্প খুঁজে পেয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র। লক্ষ করা যাচ্ছে, এদের সবই প্রায় চল্লিশের দশকে ‘সওগাত’ ও ‘মোহাম্মদী’-তে প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ ‘নয়নচারা’র যুগের রচনা এগুলো। স্বাভাবিক নিয়মে এসব গল্প নিয়ে এক বা একাধিক সংকলন প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ হয়নি।
-
‘ওমা, আমি ভেবেছিলুম এ ঘরে বুঝি কেউ নেই; যা অন্ধকার—কিছু দেখা যায় না।’ শুনে নিরন্ধ্র অন্ধকারে আনোয়ার হাসলে, বোধ হয় কথাটা মিথ্যে বলে; চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে আবছা সাদা বস্তুর পানে তাকিয়ে বললে: ‘আলাপ করবে? উঁ? করবে-তো ওঘর হতে আলোটা নিয়ে এসে বস।’
‘আলো?...তা…’ ছালেহা ইতস্তত করে থেমে গেল। আনোয়ার উঠে দাঁড়ালে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে একটা অর্ধদগ্ধ মোমবাতি খুঁজে বের করল, জ্বালাতে-জ্বালাতে, বললে: ‘বুঝেছ? মাঝে মাঝে একেবারে ভুলে যাই আমাদের বাড়িতে শুধু একটি আলো। মুসলমানদের এ-ধরনের ভুল প্রায়ই হয়ে থাকে, এবং সেইখানেই সবচেয়ে বড় দুঃখ।’
ছালেহা কিছু বললে না; আনোয়ারের ছেঁড়া-নোংরা মাদুরের এক প্রান্তে নিঃশব্দে বসল। কয়েক
-
বাইরে আকাশ কাঁদছে, ঘরে কাঁদছে রহিমা।
ঝমঝম শব্দে অবিশ্রান্ত অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে: বৃষ্টির ছাটে জানলার স্বচ্ছ সার্শিগুলো ঝাপসা ঝাপসা হয়ে উঠছে: অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে পানি ঝরার একটানা করুণ সুরে-সুরে রহিমা কাঁদছে; আর অদূরে ঝাপসা সার্শির মধ্য দিয়ে বাইরের অস্পষ্ট সিক্ত বস্তুগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঈষৎ মাথা নিচু করে প্রস্তরমূর্তির মতো আনোয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে ক্রন্দনরতা রহিমার স্বামী।
আকাশের পানি অবিরাম ঝরছে, কিন্তু রহিমার কান্না যেন ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে আসছে। সে-কথা আনোয়ার জানে। জানে বলেই সে কিছুটা অধীরচিত্তে আগতপ্রায় সন্ধ্যার কথা ভাবছে। সন্ধ্যা-আলো আজ মলিন থাকবে। এ-মলিনতার মধ্যে এখানে আসবার পথ কি মমতাজ বেগম খুঁজে পাবে? একবার খুব করে জোর
-
দূরে সবুজ বনরেখা। সে বনরেখার পেছনে যে নীল পাহাড়গুলো দিগন্তরেখায় ঢেউ তুলে সারি-সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাহাড়িরা বলে সেখানে নাকি একটি স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, যার চারিধারে প্রাচীর সৃষ্টি করে ভিড় করে রয়েছে দীর্ঘ ঘন সন্নিবদ্ধ পাইন-বৃক্ষ। ওই সবুজ বনরেখা পেরিয়ে সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে—জড়াজড়ি-হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন পাইনের বন ঘেঁষে আজ সকালে এক ঝাঁক নাম-না-জানা হলদে পাখি উড়ে গেল।
হলদে পাখির ঝাঁক উড়ে গেল, সকালের নম্র স্নিগ্ধ সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে মনির তা-ই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, অলস কান পেতে শুনেছে তাদের পাখার সম্মিলিত অস্ফুট ধ্বনি, আর চলতে-চলতে হোঁচট খেয়েছে। বনের অন্তরালে ওরা মিলিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপরে ঝাউগাছটার তলে
-
আজ সন্ধ্যায় উত্তর আকাশের মেঘগুলো নীলাভ হয়ে উঠেছে, আর তাই চেয়ে-চেয়ে দেখে আরশেদ হামেদের স্বচ্ছ চোখও যেন নীলাভ হয়ে উঠল। হাতে তার একটা বক্তজবা, গাঢ় লাল তার রং। পাশের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা যে-ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি বসে ছিল নীরবে, তার পানে চেয়ে সে বললে: ‘ওই যে নীল মেঘগুলো—স্নেহের মতো নরম কোমল নীলাভ মেঘগুলো, ওইগুলো দেখে হঠাৎ একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল, ভারি দুঃখময় সে ঘটনাটি। শুনবে?... বলছি, আগে এই ফুলটি নাও।’
মেয়েটির সরু-সরু আঙ্গুলগুলো কোমল আর দীর্ঘ, সে-আঙ্গুলগুলো দিয়ে সে হামেদের হাত হতে আস্তে ফুলটি নিলে, নিয়ে মাথা নিচু করে কেমন করে সেটা খোঁপায় গুঁজে দিলে।
-
প্রথম শ্রেণীর একটা ছোট কামরা।
অস্পষ্ট কোলাহলে কামালের তন্দ্রা ছুটে গেল; চোখ বুজেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে—মাদকতাপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস; অনুভব করল মাঝারি গোছের একটা নাম-না-জানা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে। ক্রমে কোলাহল ও ব্যস্ততার শব্দ ডুবে গেল রাত্রির সীমাহীন গভীর নীরবতার বুকে: যারা নাববে নেবে পড়ল, যারা উঠবে তারা উঠে পড়ল।
কামাল কান পেতে আছে: সামনের কয়েকটা অনির্দিষ্ট মুহূর্তের যে-কোনো একটা মুহূর্তে গার্ডের বাঁশি বেজে উঠবে, তার সুরের তীক্ষ্ণতা ক্ষণিকের জন্য ভরে তুলবে কালো নিষ্কম্প আকাশ, মায়াময় রহস্যময় করে তুলবে তন্দ্রাচ্ছন্ন যাত্রীদের আধ-জাগা কান, আর গাড়িতে আনবে চাঞ্চল্য ও গতি। কিন্তু হঠাৎ কামালের অপেক্ষমাণ কানদুটি সচকিত হয়ে উঠল, দরজা খোলার দ্রুত হ্যাঁচকা
-
চৈত্রের শেষে পল্লবশূন্য গাছে-গাছে নতুন সবুজ কচিপাতা গজিয়ে ওঠবার আগেই সাঈদের মেয়াদ ফুরিয়ে এল। তার অস্থায়ী পোস্টাফিসের চাকরিটির নির্দিষ্ট সময় উতরে গেলে। এবার তার যাবার পালা।
যে-দিন সাঈদ তার কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি চলে যাবে, সে-দিন অতি প্রভাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠল। উঠে ধীরে-ধীরে জানলার কাছে গিয়ে গরাদ ধরে দাঁড়ালে। তার ঋজু পাতলা দেহে তখনো ঘুমের জড়িমা: তার পদ্মের মতো চোখ দুটি তখনো নিদ্রালস। জানলার নিচেটা নানারকম ফুলের গাছে পরিপূর্ণ; তারই মিষ্টিমধুর গন্ধে সাঈদের নাক ভরে উঠল। বাইরে আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু সে-আলোতে রক্তাভা নেই: আছে একটা বিস্তৃত পবিত্র সুনির্মল স্নিগ্ধতা। দূরের জিনিস আবছা-আবছা দেখাচ্ছে, যেন পৃথিবীর গায়ে কুয়াশা। আর
-
বৃহৎ জানলাটা খোলা।
ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারছে আমার সারা দেহে। খোলা জানলা দিয়ে ঢুকছে সে-হাওয়া—উদ্দাম মুক্তির নিশ্বাস নিয়ে। বন্ধনহীন হাওয়া ছুটছে জোরে কঠিন তীব্র হয়ে—জুঁই ফুলের শুভ্র কোমলতা গুঁড়িয়ে দিয়ে—তুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে।
লতিয়ে আছি বিছানায়, তার কোমলতার সাথে দেহের উষ্ণ কোমলতা মিশিয়ে। নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছি ভোরের উন্মত্ত আকুল আহ্বানের মাঝে, যেখানে তার লজ্জানম্র অরুণ পরশ বিলীন হয়ে গিয়েছে।
দূরে দীর্ঘ ঝাউগাছগুলোতে অবিশ্রাম মর্মরধ্বনি বহু নিপীড়িতের করুণ মর্মভেদী আর্তনাদের মতো। বৃহৎ গাছগুলো অধীরভাবে দুলছে, আর সেই সঙ্গে দুলছে আমার হৃদয়। চোখ বুজে আছি পরম তৃপ্তিতে।
বৃষ্টির ছাটে আমার সারামুখ ভিজে যাচ্ছে, জ্বলজ্বল করছে আমার মুখ সিক্ত ফুলের মতো। চোখের পাপড়ি
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.