ঝোড়ো সন্ধ্যা

বাইরে আকাশ কাঁদছে, ঘরে কাঁদছে রহিমা।

ঝমঝম শব্দে অবিশ্রান্ত অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে: বৃষ্টির ছাটে জানলার স্বচ্ছ সার্শিগুলো ঝাপসা ঝাপসা হয়ে উঠছে: অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে পানি ঝরার একটানা করুণ সুরে-সুরে রহিমা কাঁদছে; আর অদূরে ঝাপসা সার্শির মধ্য দিয়ে বাইরের অস্পষ্ট সিক্ত বস্তুগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঈষৎ মাথা নিচু করে প্রস্তরমূর্তির মতো আনোয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে ক্রন্দনরতা রহিমার স্বামী।

আকাশের পানি অবিরাম ঝরছে, কিন্তু রহিমার কান্না যেন ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে আসছে। সে-কথা আনোয়ার জানে। জানে বলেই সে কিছুটা অধীরচিত্তে আগতপ্রায় সন্ধ্যার কথা ভাবছে। সন্ধ্যা-আলো আজ মলিন থাকবে। এ-মলিনতার মধ্যে এখানে আসবার পথ কি মমতাজ বেগম খুঁজে পাবে? একবার খুব করে জোর ঝোড়ো হাওয়া বইলে হত, তাহলে নিমেষে উড়ে যেত সব জমাট নিরন্ধ্র মেঘ, সন্ধ্যাকাশ মলিন না হয়ে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠত, সে-ঔজ্জ্বল্য মমতাজকে আগবাড়িয়ে নিয়ে আসত। তবে ঔজ্জ্বল্যের চেয়ে মালিন্যই ওর পক্ষে বাঞ্ছনীয়, কারণ বর্ষামুখর রাতে ওর কালো-কালো চোখ দুটি কেমন রহস্যময় হয়ে ওঠে। সে-রহস্যময় চোখের পানে তাকালে মনে হয়, সে যেন কুয়াশাচ্ছন্ন অস্পষ্টতার পানে তাকিয়ে রয়েছে, অথবা তাকিয়ে রয়েছে দিগন্তের পানে---যেখানে সাগর আর আকাশ এক হয়ে মিশেছে। আবার এমনি বাদলা দিনে মমতাজ শেলির কাব্য পড়তে অত্যন্ত ভালোবাসে, কিন্তু আনোয়ারের কাব্য মমতাজের কালো গভীর চোখে, তার হালকা চুলে ও চুলের গন্ধে, তার দৈহিক স্নিগ্ধ রঙে।

বাইরে অনাবিল ধারায় ঝর ঝর ঝর করে পানি ঝরছে- তো ঝরছেই, কিন্তু রহিমার চোখ দিয়ে আর ঝরছে না: নরম কোমল বালিশে মুখটি গুঁজে সে নিঃশব্দে নিশ্চলভাবে পড়ে রয়েছে। তার ফুলে-ওঠা ক্লান্ত-শ্রান্ত চোখ নিবিড়ভাবে বোজা; মাঝে মাঝে তার পাতলা ঠোঁট শিশুর ঠোঁটের মতো হঠাৎ কেঁপে-কেঁপে উঠছে; সে যেন বর্ষণের সুরে সুরে কখন অজ্ঞাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আনোয়ার নিশ্চিতভাবে জানে যে, সে ঘুমোয় নি। বর্ষণসঙ্গীত রহিমার চোখে ঘুম নাবাতে কি গভীর অবোধ্য ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারে না, পারে শুধু মমতাজের চোখে, যার চোখ এমনি দিনে শুধু রহস্যময় হয়ে ওঠে।

জোর ঝোড়ো হাওয়া বইল কিন্তু। নিশ্চল আনোয়ার হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল, ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটায় নিজের মুখখানা ক্ষত-বিক্ষত করবার ইচ্ছা হলেও সে কিন্তু জানলা খুললে না, ঘরে ঘুমাচ্ছন্নের মতো রহিমা পড়ে রয়েছে বলে। এ-ঘুমের ছলনা যেন মৃত্যুর ছলনা।


অন্যায় করে কারো অন্তরে ঘা দিলে খোদা কখনো সহা করেন না; এ-অন্যায়ের শাস্তি তোমাকে একদিন বইতেই হবে


সার্শির বাইরের জগৎ আনোয়ারকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে: আর দূরে অদৃশ্য হতে ডাকছে বোধহয় মমতাজ, যার মুখ এতক্ষণে বিদ্রোহিনীর মতো নির্ভয়ে সোজা ও উদ্ধত হয়ে উঠেছে। সমস্ত জাগতিক স্নেহবন্ধন ছিঁড়ে ফেলে ঝোড়ো হাওয়া যেন তাকে মুক্তির অসীম পূর্ণতায় ছুড়ে ফেলতে চাইছে, মমতাজ নীরবে দৃঢ়চিত্তে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে অগ্রাহ্য করছে। নতুন কিছু নয়, পুরাতনই সব, তার মাঝেই পূর্ণতা, শান্তি। কিন্তু তাই কি? না। ঝড়ের প্রচণ্ডতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে মমতাজ প্রচণ্ড হয়ে ওঠে, ফুলের কোমলতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে সে কোমল হয়ে পড়ে; এবং এই তার স্বভাব।

ঘরে মৃদু পদশব্দ। বিছানা ছেড়ে রহিমা উঠেছে। ঝোড়ো হাওয়া বইছে কি না—সে আর ঘুমাচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকতে পারছে না, জানলা দরজা সব বন্ধ আছে কি না একবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সংসার তার সবকিছু; পানির ছিটায় ঘর ভিজে গেলে, মেঝের দামি কার্পেটটা ভিজে গেলে তার অনেকটা ক্ষতি। ঝড়কে যে বাধা দেয়, সে ঝড় কি তার চোখে কুয়াশা-স্বপ্নিল ছায়া সৃষ্টি করে?

মৃদু পদশব্দ বাইরে মিলিয়ে গেলে আনোয়ার ভাবলে, ও কি সত্যিই কাঁদে? অর্থাৎ দুঃখে, অর্থাৎ ব্যর্থতায় কাঁদে? আনোয়ার রহিমাকে ভালোবাসে না,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice