মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পের মৃত্যুঞ্জয়ী রূপকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অতি আধুনিক বাস্তবতাবাদী রীতির গণকথাশিল্পী ও কমিউনিস্ট রূপে চিহ্নিত, আদৃত ও বিতর্কিত।
অতি আধুনিক বাস্তবতাবাদের গণকথাশিল্পী হিসেবে ফরাসী উপন্যাসের কারিগর আঁরি বারবুসে ও লুই আরাগঁ যেমন করে কমিউনিস্ট হয়েছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেইভাবেই কমিউনিস্ট। অতি আধুনিক রীতির কবি পাবলো নেরুদা এবং বার্টোল্ড ব্রেখটের কমিউনিস্ট হবার ধরনটির সঙ্গেও তাঁর মিল রয়েছে।
এঁরা প্রত্যেকেই জনগণের মুক্তিসংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গিত করে প্রায় একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধানত সংগ্রামী খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলেছেন অতি আধুনিক রীতিতে। সামান্য ও অসামান্য নির্বিশেষে এবং বিশেষ করে সামান্য ও সামান্যা মেহনতী মানব-মানবীদের নিমগ্ন মনের সম্ভাবনা, যন্ত্রণা, আনন্দ, মাধুর্য এবং বৈপ্লবিক ক্রোধ ও আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্ত করাই এঁদের অতি আধুনিকতার রীতি। বিশ্ব জুড়ে এই ধারা গড়ে উঠেছে একই সঙ্গে চূড়ান্ত সংকট ও পরিবর্তনময় বর্তমান শতাব্দীর বিশের দশক থেকে। সুতরাং এর মধ্যে ভাব-সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি ভাব-প্রগতি ও সক্রিয়। পরিবর্তনবাদী বিদ্রোহী লেখক লেখিকারা মুক্তিসংগ্রামী জনগণের অগ্রপদক্ষেপে শরিক হয়ে আধুনিকতম রীতিকে গণবোধ্য ও গণ-গম্য করে স্বাধীনতা ও সাম্যের সংগ্রামকে উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন কোটি কোটি নরনারীর প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের উন্মোচনে আলো ফেলে। ভাব সংকটের চক্রকে অতিক্রম করে ভাব-প্রগতিকে এরা এগিয়ে নিয়েছেন। বাংলার এই ধারার প্রবর্তক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে এই বিপ্লবী বাস্তবতাবাদের অনন্য সাধক বলেও অভিহিত করা যেতে পারে এ কারণে যে, তিনি বস্তুতপক্ষে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পের সেই একমাত্র লেখক যিনি বিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত বাংলা ভাষাভাষী ও অন্যান্য সন্নিহিতদের জীবনে প্রচণ্ড ভাঙ্গাগড়ার রদবদলের সমস্ত প্রকাশ্য ও অন্তঃশীল অভিঘাতকে চিত্রিত ও ধ্বনিত করেছেন বিশের দশকের বাংলায় সদ্য প্রবর্তিত কাঁচা ও আকাঁড়া অতি আধুনিকতার পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে পরিপূর্ণাঙ্গ করে তুলে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পসত্তার মূল ভিত্তি হলো তাঁর বিপ্লবী বাস্তবতাবাদ। তিনি কেবল একজন লেখক নন, বরং বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্পের এমন এক অনন্য রূপকার যিনি খেটে খাওয়া মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রায় তিনি অবক্ষয়ের চক্রকে জয় করে প্রগতির পথে নতুন ধারার প্রবর্তন করেছেন।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, দারিদ্রের জালে আবদ্ধ পদ্মা নদীর একান্তভাবে গায়ে-গতরে খেটে খাওয়া জেলেদের মনোবেদনার উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ কিংবা আলোকিত কলকাতা মহানগরীর ছায়াবৃত উপকণ্ঠের বাসিন্দা শ্রমজীবী ও মজুরদের কারখানা-জীবন ও ঘরভাঙ্গা ও ঘর বাঁধার একই সঙ্গে যাযাবরী ও সাংসারিকতার উনুন পাতার উপন্যাস ‘শহরতলী’, কিংবা চাষীর ঘরের কেশবতী নারীর জীবনে দুর্ভিক্ষের হানা এবং তার ন্যাড়া হবার কাহিনী নিয়ে লেখা ছোটগল্প ‘নেড়ি’তে রয়েছে এই অতি আধুনিক রীতির রক্তক্ষরা স্বাক্ষর।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচেছিলেন ৪৮ বছর। লেখা আরম্ভ করেছিলেন ২০ বছর বয়সে। এর পরে ২৮ বছর একটানা লিখেছিলেন। লেখাকে বৃত্তি হিসেবে নিয়েছিলেন এবং নিজেকে ‘কলমের মজুর’ বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রায় ৪০টি উপন্যাস ও আড়াইশ ছোটগল্প, একটি কবিতার বই লিখেছিলেন ২৮ বছরের মধ্যে। শ্রমসাধ্য ও অবিশ্রান্ত ছিল তাঁর কাজ। নিজেকে আরাম দেয়া দূরে থাকুক দুঃখই দিয়েছেন তিনি বরং।
তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে এমন বেশ কয়েকজনকে পাওয়া যাবে বাংলায়, যাঁরা সাফল্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোন কোন ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সময়টিতে বৈচিত্র্য যেমন যথেষ্ট, তেমনি উপন্যাস ও ছোটগল্পের লেখক লেখিকার সংখ্যাও হয়েছে যথেষ্ট। মনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র বিশের এবং তিরিশের দশক জুড়ে অবস্থান করেছিলেন এবং এমন কয়েকটি নামী উপন্যাস লিখেছিলেন এই সময়েই যেগুলি অতি আধুনিক রীতিকে এবং সামান্য ও সামান্যাদেরও নিজেদের মধ্যে টেনে নিয়েছিল বলে এইসব লেখা সত্তরের দশকেও সজীব। তাছাড়া, অতি আধুনিক বাস্তবতাবাদের ভিত্তি তৈরি করেছিল যে ‘কল্লোল’, তার লেখকেরা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments