মতিনউদ্দিনের প্রেম
মতিনউদ্দিন মেদমাংসশূন্য ক্ষীণ কাঠামোর ক্ষুদ্র আকৃতির মানুষ। ক্ষিপ্রবেগে চলার অভ্যাস সত্ত্বেও পথেঘাটে সে সহজে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বাচালতা দোষ নাই বলে অন্যদের মতো অজস্র কথায় সৃষ্ট একটি স্পর্শনীয় দৃশ্যমান চরিত্রও তার নয়। আপিসে দীর্ঘ বারান্দা-ঘরের সহযোগীদের মতো রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যাপারে তার মতামত থাকলেও ক্বচিৎই তা সে প্রকাশ করে। কেবল চাল-ডালের দামের কথা উঠলে সে একটি বিশেষ মন্তব্য না করে যেন পারে না। একই ভঙ্গিতে একই স্বরে সে প্রতিবার বলে, শায়েস্তা খানের আমলে এক মন চাল পাওয়া যেত মাত্র দু-আনায়। উক্তিটা সত্য হলেও তা এখন সময়- কালবহির্গত এবং বাস্তব হতে এত দূরস্থিত শোনায় যে তার সে ঐতিহাসিক মন্তব্যটি শূন্যে ঝুলে মিলিয়ে যায়। সে-মন্তব্যটিও তার সহযোগীদের মনে তার সম্বন্ধে স্বল্পভাষী নম্রলাজুক মানুষের ছবিটিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনে না।
তবে বাড়িতে পা দেওয়া মাত্র সে মানুষেরই চেহারা- হাবভাবে একটি বিষম পরিবর্তন ঘটে। বাইরের মতিনউদ্দিন এবং ঘরের মতিনউদ্দিনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।
বাইরের মতিনউদ্দিন এবং ঘরের মতিনউদ্দিনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ইট-তর্জা-টিনযোগে কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা তার ক্ষুদ্র বাসস্থানটি তার নতুন চরিত্রের স্পর্শে প্রাসাদে পরিণত হয়... অন্যদিন হলে খালেদা উঠে মশারিটা ঝেড়ে আবার সযত্নে গুঁজে দিত। আজ সে নড়ে না। মতিনউদ্দিন অবশেষে শান্ত হয়। শত্রুবিজয়ী সেনাপতির মতো আত্মসচেতনভাবে কিছুক্ষণ নড়েচড়ে সে যখন ঘুমের আয়োজন করে, তখন তার পিঠটা খালেদার পিঠের সঙ্গে একটু লেগে থাকে। গ্রীষ্মের দিনে সে সংস্পর্শ...
ইট-তর্জা-টিনযোগে কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা তার ক্ষুদ্র বাসস্থানটি তার নতুন চরিত্রের স্পর্শে প্রাসাদে পরিণত হয়, এবং ঘরে তার স্ত্রী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো লোক না থাকলেও মনে হয় যেন তার হুকুম তামিল করবার জন্য মোসাহেব-গোমস্তা বাবুর্চিখানসামা পেয়াদা-হুঁকাবরদারের অন্ত নাই। তখন তার ত্রিশ-ইঞ্চি বুক থেকে অহরহ বাঘের মতো আওয়াজ বের হয়। তবে বন-জঙ্গলের শক্তিশালী পশুটির মতো তার সিনাটা গভীর নয় বলে মনে হয়, নিনাদপ্রচেষ্টায় যে-কোনো সময়ে তার রগ ফেটে যাবে। মতিনউদ্দিনের খড়মেও কম আওয়াজ হয় না। বরাবর দেখে-শুনে শক্ত মজবুত খড়ম কেনে সে। বস্তুত, তার ঘরের জাঁদরেল সত্তাটির একধারে তার গলা অন্যধারে খড়ম।
তিন বছর হল তাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু তার বউ খালেদা এখনো জানে না কখন তার স্বামী হুঙ্কার দিয়ে উঠবে, কখন হুড়ুম করে লাফিয়ে যাবে উঠান থেকে কাককুত্তা তাড়াতে। সে-জন্যে সত্যিই পান থেকে চুন খসার প্রয়োজন নাই, উঠানে কাককুত্তার উপস্থিতিরও দরকার নাই। দিনের মধ্যে কতবার যে খালেদার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে, তার ঠিক নাই।
খালেদাও ছোটখাটো মানুষ। গোপনে শরীরে একটু-যে মেদমাংস হয়েছে সে খবরটা ঢাকতে চেষ্টা করে নিঃশব্দে আলগোছে হেঁটে, দেহটা কাপড়ে জড়িয়ে রেখে। অবশ্য এ-বিষয়ে তার লজ্জারও কোনো অর্থ নাই, সাবধানতাও নিষ্প্রয়োজন। মতিনউদ্দিন কখনো তার বউয়ের দিকে চোখ খুলে তাকায় না। তাকালেও বুঝবে না যে তার স্ত্রী কেমন একটু মোটাসোটা হয়ে উঠেছে। দোষভাবটা খালেদার মনেই। মোটা হওয়া মানে খেয়েদেয়ে সে আরামেই আছে। সে-কথা প্রকাশ করতে তার লজ্জা হয়। বিশেষ করে স্বামীটি যখন তেমন রোগাপটকাই থাকে।
তারপর একদিন অকস্মাৎ মতিনউদ্দিনের মধ্যে একটি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটে। এমন আশ্চর্য ঘটনাটি ঘটে বিনা খবরে, তার অব্যবহিত পূর্বে ক্ষীণতম ইঙ্গিত ছাড়া। পরিবর্তনটি শুরু হয় সকালেই, কিন্তু খালেদা তা লক্ষ্য করে সন্ধ্যাবেলায়। সেদিন আপিস থেকে ফিরে বেড়াঘেরা ক্ষুদ্র উঠানে বসে মতিনউদ্দিন কেমন নীরব হয়ে থাকে। বসার ভঙ্গিটা শিথিল, দৃষ্টি মাটির দিকে। নিত্যকার মতো চায়ের পেয়ালাটা নিয়ে আসে খালেদা। মতিনউদ্দিন চা পান করে বটে কিন্তু অন্যদিনের মতো থেকে-থেকে তৃপ্তিসূচক উচ্চ আওয়াজ করে না। তারপর খালেদা হুঁকাটা নিয়ে এলে সে ধূমপানও করে, কিন্তু আজ ইঞ্জিনের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments