দুই তীর
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় ক্যানভাসের ডেকচেয়ারে বসলে পায়ের সামনে আবদুল ঝুঁকে পড়ে তার জুতা-মোজা খোলে। ভৃত্যের এ সেবায় আফসারউদ্দিন যে আনন্দ বোধ করে, তা নয়। বরঞ্চ জুতা বাড়াতে গিয়ে প্রতিদিন কেমন জড়তা বোধ করে, তার পা-দুটি পাথরের মতো ভারি হয়ে ওঠে। সে আশা করেছিল নিত্যকার এ-সাহেবিয়ানা অনুষ্ঠানে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, কিন্তু এখনো হয় নাই। ভাবে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটাবে। তা-ও হয়ে ওঠে না।
আজও চাকরটি তার পাথরের মতো ভারি পা-দুটি থেকে প্রথমে জুতা খোলে, তারপর মোজা। অন্য দিনের মতো আজও আফসারউদ্দিনের দৃষ্টি পড়শীর বাড়ির ছাদে নতুন করে চুন-দেয়া সিঁড়িঘরে নিবদ্ধ হলেও তার সমগ্র সত্তা ব্যস্ত-সমস্ত চাকরটি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে থাকে। আবদুলের তেল জবজবে চুলে যত্ন করে কাটা সিঁথি। চটপটে স্বল্পভাষী ছেলেটি নিত্যকার এই অনুষ্ঠানে অসাধারণ কিছু দেখতে পায় বলে মনে হয় না। বরঞ্চ যেমন নিপুণভাবে সে কাজটি সম্পন্ন করে তাতে মনে হয় কাজটি করে সে তৃপ্তি বোধ করে, হয়তো গৌরবও।
ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে। তারপর কেমন একটা ঘূর্ণিবর্তের মধ্যেই একটি লাল শাড়ি ঝলমল করে ওঠে। একটা মুখও ভেসে ওঠে। সে-মুখ তার দিকে তাকায়, বোধহয় ভাবশূন্যতার মধ্যে নীরস ভদ্রতার একটা ক্ষীণ হাসি জাগে। তারপর হয়তো মরিয়ম খানমের কালো বোরখা ভেসে ওঠে। সেখানেও একটি মুখ ফিরে তাকায়। ঘূর্ণিবর্ত পুচ্ছ নাচায়। প্ল্যাটফর্মের শেষে রেলপথ হঠাৎ ডান দিকে মোড় নেয়। সে-বাঁকে ট্রেন শীঘ্র অদৃশ্য হয়ে গেলেও আফসারউদ্দিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে নিস্পন্দভাবে।
এবার আফসারউদ্দিনের পায়ের পাশে কালো চামড়ার চটি রেখে জুতা-মোজা হাতে আবদুল ক্ষিপ্রগতিতে ভেতরে চলে যায়। আফসারউদ্দিন জানে, জুতাজোড়াটি তুলে রাখার আগে তাতে সে একবার বুরুশ দিবে, মোজাজোড়াটা আলগোছে শুঁকে দেখে পেছনের বারান্দায় ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে। রোজ মোজা বদলাবার মতো আর্থিক অবস্থা আফসারউদ্দিনের এখনো হয় নাই।
দু-বছর আগে কেউ আফসারউদ্দিনের জুতা খুলত না। বস্তুত একটি মানুষের দিকে পা বাড়িয়ে দেবে এমন কথা তখন সে কল্পনাও করতে পারত না। তখন সে মেসবাড়ির হাওয়াবদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বাস করত। তার ঘরের দেয়ালে আর্দ্রতাজাত মানচিত্রের মতো নকশাটি এখনো সে স্পষ্ট দেখতে পায়। এমন কি মনে হয়, হাত বাড়ালেই সে যেন দেয়ালটা ছুঁতে পারবে। তারপর নড়বড়ে চৌকিটা, ডালে তেলেপোকা, খিতখিতে ঠাণ্ডা ভাত, আনোনা তরকারি, পচা মাছ, ঘোলাটে গ্লাসে পানি—কিছুই তার বর্তমান খোলামেলা উজ্জ্বল জীবনে ম্লান হয়ে যায় নাই। আমাশা রোগগ্রস্ত সঙ্গীটি আজ কোথায় সে জানে না। যে-জীবন আফসারউদ্দিন পশ্চাতে ফেলে এসেছে, হয়তো তার দৃঢ় আলিঙ্গনে এখনো সে আবদ্ধ। কিন্তু মেসবাড়ির জীবনের মতো আজ সে অদৃশ্য হয়ে গেলেও আফসারউদ্দিনের মন থেকে সে অদৃশ্য হয়ে যায় নাই। মেসঘরের দেয়ালের আর্দ্রতাজাত নকশাটির মতো তার মুখমণ্ডলের প্রতিটি রেখা, তার প্রতি ভাবভঙ্গি বা মুদ্রাদোষ নিয়ে সে মানুষটি তার মানসপটে প্রখর সুস্পষ্টতায় বিদ্যমান। যে মানুষের সঙ্গে হয়তো সে আর কখনো একই ঘরে রাত্রিযাপন করবে না, সে মানুষ স্বভাবগত ক্ষুদ্র পদক্ষেপে এখনো তার পদানুসরণ করে চলেছে, আত্মীয়তা বন্ধুত্বের দাবি না করেও তার সঙ্গ সে ছাড়ে নাই। তবু মানুষটির যে একটি নিজস্ব অস্তিত্ব আছে তা নয়। সে মেসবাড়ির জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মাত্র। আসবাবপত্রের তুলনায় তার স্মৃতিটা যদি উজ্জ্বলতর মনে হয়, তার কারণ সে মানুষ, প্রাণহীন বস্তু নয়।
আফসারউদ্দিন জানে, যে-জীবন সে ছেড়ে এসেছে, সে-জীবনের প্রতি তার কোনো মমতা নাই। থাকার কথা নয়। দারিদ্র্য জর্জরিত সে-জীবনে লোভনীয় আদরণীয় কিছু নাই। তবু বিগত জীবন এখনো ঘনিষ্ঠ মনে হয়। হয়তো সে জন্যেই দু-বছরব্যাপী প্রচেষ্টার পরেও সে তার নতুন জীবনকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments