নিষ্ফল জীবন নিষ্ফল যাত্রা
আকাশে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ছিল, সেগুলো তাড়াতাড়ি নেবে আসে। ব্যাটা ছেলেরা কাজ ভুলে আরাম ছেড়ে রাস্তায় বেরোয়, পর্দানশিন মেয়েরা দাঁড়ায় বেড়ার পেছনে পর্দার আড়ালে। ঔৎসুক্যের সীমা নাই যাদের তারা রাস্তার মোড়ে-চৌমাথায় জড়ো হয় এবং ন্যাংটা ছেলেরা বাঁদর-নাচ হবে মনে করে তারস্বরে চিৎকার করে দিগ্বিদিগশূন্য ছুটতে শুরু করে।
সারা শহরে খবর পৌঁছে গেছে।
খবরটা অতিশয় বিচিত্র।
সেটি এই যে, বৃদ্ধ সদরউদ্দিন একটি অত্যাশ্চর্য অন্তিমখেয়াল পূর্ণ করতে পথে নেবেছে। খাড়া নাকে কড়া রোদ, গর্তে ঢোকা চোখে ঘোলাটে অন্ধকার এবং লম্বা শীর্ণ হাড়সার পায়ে কাঠ কাঠ ভাব, শহরের অলিগলি দিয়ে হেঁটে হেঁটে সে বন্ধু-শত্রুর সন্ধান করে। মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে মানুষের যখন মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো কামনা থাকে না, যখন তার সমগ্র ইন্দ্রিয় অন্ত্র-তন্ত্র অধীরভাবে চায় যে জীবনের যবনিকা ঘটুক, যখন আশা-ভরসা মায়ামমতা ব্যথা বেদনা সবই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়, তখনই সদরউদ্দিন তার অন্তিমশয্যা ছেড়ে একটি অদ্ভুত মনস্কামনা পূর্ণ করতে বের হয়েছে। তার সময় নাই সে-কথা সে জানে। শয্যা ত্যাগ না করলে এতক্ষণে তার মৃত্যুও এসে যেত। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার মনস্কামনা পূর্ণ না করেছে ততক্ষণ পর্যন্ত পাকে-প্রকারে দৃঢ়সঙ্কল্পের বলে সে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখবে। যে-মানুষ মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছেও উগ্রসূর্যের তলে পথে-পথে এমনভাবে হাঁটতে পারে, সে আর মৃত্যুর ক্রীতদাস নয়। এখন ফেরেশতা নয়, সে-ই সাব্যস্ত করবে তার প্রাণান্তের সময়।
তার অন্তিম বাসনা বন্ধু-মিত্র-শত্রুর নিকট হতে মাফ চাওয়া। তাদের কাছে মাফ না নেওয়া পর্যন্ত সে মরবে না, লকলকে পায়ে অনিশ্চিত পদক্ষেপে যে-শহর ভ্রমণ শুরু করেছে সে-শহর ভ্রমণ হবে না। তার বাসনাটি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সে এ-দুনিয়া পরিত্যাগ করবে না।
অবশেষে সদরউদ্দিন কে বন্ধু কে শত্রু তার বাছবিচার আর করে না। সে বিষয়ে কে কখন নিশ্চিত হতে পারে? তাছাড়া মৃত্যুর সম্মুখে সে বাছবিচার নেহাতই অর্থহীন মনে হয়। সকলের কাছেই মাফ চায় সদরউদ্দিন। যার সঙ্গে সারাজীবনেও একটিবার কথার আদান-প্রদান করে নাই, তাকেও বাদ দেয় না। কে জানে কখন সে নিজেরই অজ্ঞাতে শুধু চোখের অবহেলায়ই কার হৃদয়ে আঘাত দিয়েছে। তবে কারো কাছে সে মাফ ভিক্ষা করে না, দাবিই করে।
একগুঁয়ে-ভাবে হাতের লাঠি ঠুকে ঠুকে মরণাপন্ন বৃদ্ধ সদরউদ্দিন অগ্রসর হয়। মাঝে-মাঝে লাঠি ঘুরিয়ে সে তার পেছনে ছেলেদের দলটিকে যথাস্থানে রাখে। তারা তার পেছনে ফেউ ধরেছে আজরাইলকে দেখবে বলে। তাতে তার আপত্তি নাই। তবে যখন তারা তার কাপড় ধরে টানে বা হাত ধরতে চায়, তখন সে বিরক্তই বোধ করে।
লাঠি দিয়ে সদরউদ্দিন তার মেয়েকেও দূরে রাখে। চুল আলু-থালু, মুখে উদ্ভ্রান্ত ভাব, মাথা ঘোমটাশূন্য—মেয়েটি তার পিছু ছাড়তে নারাজ। সে কেবল গোঙায়, বৃদ্ধ বাপকে ঘরে প্রত্যাবর্তন করবার জন্যে কাতরকণ্ঠে অনুরোধ করে। কিন্তু সদরউদ্দিন তার গোঙানিতে বা অনুরোধে কান দেয় না। সে জানে তার মেয়ের ইচ্ছে অপূর্ণ থাকবে না: কায়দামাফিক বিছানায় শুয়েই সে তার শেষনিশ্বাস ত্যাগ করবে।
বৃদ্ধ সদরউদ্দিন এগিয়েই চলে। তাকে দেখে মনে হয়, তার কাম্যবস্তু না এ-জীবনের না সে-জীবনের। গলির পর গলি পেরিয়ে চলে সে, কাঠের পা দুটি অব্যর্থভাবে সম্মুখদিকে নিক্ষিপ্ত হয়। সে-পা জীবনীশক্তিতে চলে বলে মনে হয় না। অত্যাশ্চর্যভাবে সোজা তার পিঠ, মাথা উন্নত—যন্ত্রচালিত পুতুলের মতোই সে এ-পথ সে-পথ অতিক্রম করে।
থেকে-থেকে মেয়েটি নিজেকে যেন সামলাতে পারে না। তখন তার গোঙানি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। একবার বৃদ্ধ সদরউদ্দিন ঘুরে দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিত শক্তির পরিচয় দিয়ে লাঠি ঝেকে মেয়েকে শাসন করে। অবশ্য লাঠিকে মেয়ের ভয় নাই। কেবল পুনর্বার তার বাপের অনমনীয় মনের পরিচয় পেয়ে সে এবার ডুকরে কেঁদে ওঠে। সদরউদ্দিন তার কানে খিল দেয়।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments