গ্রীষ্মের ছুটি

সেবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সেলিনারা দাদার বাড়িতে বেড়াতে আসার দু-দিন পরেই গ্রামে একটি শোচনীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে দাদাসাহেবেরই প্রজা তারা মিঞা তার ছোটভাই সোনা মিঞাকে কোঁচবিদ্ধ করে খুন করে। নির্মম ঘটনাটি তুচ্ছ একটি দু-আনা পয়সা নিয়ে ঘটে।

খবর পেয়ে দাদাসাহেব যখন সদলবলে তারা মিঞার বাড়িতে উপস্থিত হন তখন নয় বছরের মেয়ে সেলিনাও যে তাঁর পশ্চাদানুসরণ করে তা তিনি লক্ষ্য করেন না। তারপর এক সময়ে লণ্ঠনের আলোয় লেপাজোকা পরিচ্ছন্ন উঠানে গরু-বাঁধার খুঁটির পাশে পড়ে থাকা চৌকোণা দু-আনার মুদ্রাটি দেখতে পেয়ে সেলিনা তীক্ষ্ণকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলে তিনি তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সজ্ঞান হন। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। উঠানে রক্তস্রোতের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে-থাকা সোনা মিঞার মৃতদেহটি সে চোখভরে দেখে নিয়েছে।

পরদিনই সেলিনার ভীষণ জ্বর ওঠে। তখন তারা মিঞার উঠানে তার বিচিত্র প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে গবেষণা হয়। কেন সেলিনা মৃত মানুষের বীভৎস দৃশ্যটি দেখে একটু শব্দ করে নাই, বা সে ক্ষুদ্র মুদ্রাটি দেখার পরেই তীক্ষ্ণভাবে চিৎকার করে ওঠে? এ সব গবেষণা শুরু করে আম-মৌলবী। আম-মৌলবী দাদাসাহেবের আশ্রিত মানুষ। বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। সমগ্র কোরান তার জিহ্বাগ্রে থাকলেও সে অতি দরিদ্র মানুষ। দাদাসাহেবের বাড়ির ছেলেমেয়েদের সে কোরান-হাদিস শেখায়, পাঁচ ওয়াক্ত আযান দেয়, নানাপ্রকার ধর্মীয় ব্যাপারে সম্পাদনা-নেতৃত্ব করে। আমের প্রতি তার অত্যধিক লোভের জন্যে কবে কে তার নাম দিয়েছিল আম-মৌলবী; সে নামেই এখন সে পরিচিত।

সেলিনার প্রতিক্রিয়ার কারণ আম-মৌলবীর কাছে নিতান্তই সহজ মনে হয়। সে বলে, হতভাগা সোনা মিঞার রক্তাপ্লুত দেহটি অতি বীভৎস দেখালেও ফেরেশতার মতো নির্মলচিত্ত সেলিনা সে-দৃশ্যে বিচলিত হয় নাই, কারণ নির্দোষ মৃত মানুষটি ততক্ষণে বেহেশতে পৌঁছে গেছে। এ-কথা লক্ষণীয় যে, খুনীকে দেখেও মেয়েটি ভয় বা ঘৃণাবিতৃষ্ণা বোধ করে নাই। তার কারণ, সে-ও নির্দোষ। কিন্তু মুদ্রাটির ওপর দৃষ্টি পড়তেই সেলিনা মুহূর্তের মধ্যেই সেটিকে শয়তানের জিনিস বলে চিনতে পারে। শয়তানের সে অস্ত্রটির জন্যেই কি অতিশয় শোচনীয় ঘটনাটি ঘটে নাই?

আম-মৌলবীর ব্যাখ্যাটি কেউ ফেলতে পারে না। কেন সেলিনা বিলম্বে চিৎকার করে উঠেছিল তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও তা মুখরোচক নয়।

আম-মৌলবীর ব্যাখ্যাটি সেলিনার কানেও পৌঁছায়। যারা তার কাছে কথাটি নিয়ে যায় তারা প্রশ্ন করে, সে কি শয়তানের চেহারা দেখেছিল মুদ্রাটিতে? কেমনই-বা শয়তানের চেহারা? অবশ্য সেলিনা কিছুই বলতে পারে না। মুদ্রাটি দেখার পর কেন সে চিৎকার করে উঠেছিল তা সে জানে না। কিন্তু আম-মৌলবীর কথা গোপনে গোপনে তাকে প্রভাবিত করে। হঠাৎ সে যেন ভালোমন্দ-শয়তান-ফেরেশতা সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হয়ে ওঠে।

সাতদিন জ্বর-ভোগের পর আরোগ্য লাভ করলে তার আচরণে একটি বিশেষ তারতম্য দেখা যায়। সে কেমন গম্ভীর, স্বল্পভাষী হয়ে ওঠে। তার মধুর চঞ্চলতা স্তব্ধ হয়ে যায়, কারো সঙ্গও আর যেন তার ভালো লাগে না। একাকী সে ঘর দেউড়িঘর করে, বা চুপচাপ বসে থাকে কোথাও।

তারপর একদিন সে বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধু-ধু মাঠটি আবিষ্কার করে।

সেদিন অপরাহ্ণে সে উঠানের প্রান্তে বরই গাছের তলে বসেছিল। অদূরে পাটিতে বসে সেলাই শেখার নামে তার চৌদ্দ বছরের বোন আনোয়ারা সমবয়সী চাচাতো বোনের সঙ্গে ফিসফিস-গুজগাজ করছিল এবং থেকে-থেকে একটু শব্দ না করে অদম্য হাসিতে ফেটে পড়ছিল। আজ তার হাসির ধরন সেলিনার মনে গভীর বিতৃষ্ণার ভাব জাগায়। তার মনে হয়, সে-হাসি আনোয়ারার মোটাসোটা দেহের অভ্যন্তরে মুক্তির জন্যে ঘুরপাক খেয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়েই মারা পড়ে। হয়তো তার ভেতরে তেমন হাসির অনেক লাশ স্তূপাকার হয়ে আছে।

অবশেষে আনোয়ারার হাসি অসহ্য হয়ে উঠলে সেলিনা উঠানের পেছন দিয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রথমে হাঁটতে থাকে। বাড়ির পেছনে জঙ্গলের মতো; সেখানে অনেক আমগাছ

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ


কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice