কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ
সুকান্তর চেহারায় বৈশিষ্ট্য ছিলো, ব্যঞ্জনা ছিলো, কবিজনোচিত বলতে যা মনে আসে সে জলুস ছিলো না। নিভৃত নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত আরাম কৈশোরের লাবণ্য মসৃণ মোলায়েম করে তোলেনি, জীবনযুদ্ধের সৈনিকোচিত রুক্ষশ্রী এসে মিশেছিলো।
লাজুক মুখচোরা বলে সে পরিচিত ছিলো, আমি তার ভেতরের হলকা মাঝে মাঝে অনুভব করতাম তার শান্ত স্বল্প কথায়, তার কবিতায়।
সুকান্তর কবিতার সহজ সরলতা অনেককে আশ্চর্য ও মুগ্ধ করেছে, সেই সরলতার সমগ্র তাৎপর্য সকলের কাছে ধরা পড়েছিলো কিনা জানি না।
জীবনে যেমন, কাব্য-সাহিত্যেও সরলতা বিশেষণটিতে রিক্ততার ইঙ্গিতটাই আমাদের কাছে বড় বেশী জোরালো। গভীরতা, ব্যপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতি-কবিতা পর্যন্ত। সুকান্তর কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিলো।
রবীন্দ্রোত্তর বৈপ্লবিক ভাবধারাকে সমসাময়িক করে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে পারেন নি, নতুন চেতনা যাদের স্মৃতির প্রেরণা তাঁরাও খুঁজে পান নি আত্মপ্রকাশের পথ ও পদ্ধতি। বাংলা গদ্য-সাহিত্যের অগ্রগতির সঙ্গে পিছিয়ে পড়া কাব্য-সাহিত্যের মন্থরগতি মিলিয়ে দেখলে, আন্তরিক পরীক্ষা গবেষণাদির সীমার বহু বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে মৌলিক কবিতার দৈন্য বিচার করলে আমরা এক শোচনীয় সিদ্ধান্তে আসি, কিশোর কবি সুকান্তের অকালমৃত্যু যার মর্মান্তিক বাস্তব পরিচয়। কাব্য-সাহিত্যে নতুন যুগকে প্রাণ দিতে আজ কবির যে অভিজ্ঞতা ও সাধনা দরকার তার পুরস্কার মৃত্যু, সুকান্ত এই ভয়ানক সত্য ও কাব্য-সাহিত্যের চরম সাফল্যকে, আমাদের সমস্যাকে স্পষ্ট করে দিয়ে গেছে।
প্রতিভার অকালমৃত্যু বাংলায় বা জগতে এই প্রথম নয়, কিন্তু গত যুগেও কবির পক্ষে সমাজের সঙ্গে বেঁচে থাকার মতো একটা আপোষ করা সম্ভব ছিল যা তার কাব্য-সাধনাকে ব্যাহত করতো না। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আজ কবির পক্ষে অপরিহার্য, তখন তা পরোক্ষ হলেও চলতো।
আজ সেটুকু আপোষের সুযোগও শেষ হয়ে গেছে কবির পক্ষে। কোনো জীবিকার জন্য প্রস্তুতি তার নিজেকে অপচয় করা, কোনো জীবিকা গ্রহণ তার কাব্য-সাধনার সুনিশ্চিত ব্যৰ্থতা।
শৈশব থেকেই কবি প্রতিভা আজ এই সঙ্কটের সম্মুখীন, চাষী মজুর বা ভদ্রঘরে যেখানেই তার আবির্ভাব হোক, মানুষের বাঁচার ব্যবস্থা এমনি দেশে যে কোনো মতে বেঁচে থাকার উপায়টুকু আয়ত্ত করতে গেলেও অন্ত দৃষ্টিকে ঝাপসা হয়ে যেতে দিতে হবে।
গদ্য-সাহিত্যের সাধকও যে এ অভিশাপ থেকে একেবারে মুক্ত তা নয়, কিন্তু কবির সঙ্গে তুলনায় সে অনেক ভাগ্যবান। গদ্য-সাহিত্যের যেটুকু উর্বরতা দেখি, সাহিত্য-বিচারকের আসনে বসে এই নতুন প্রাণ সঞ্চারের মতো জটিল ও পরোক্ষ কারণই আবিষ্কার করি, মূল কারণ ওই। কাব্য-সাহিত্যের অনুর্বরতাও এই জন্য যে কবিতা লেখার মজুরীতে কবি বাঁচে না। নতুন যুগের অলঙ্ঘ নির্দেশে তাকে আজ দেহমনে চব্বিশ ঘণ্টার সাহচার্য বরণ করে নিতে হয় তার যে উলঙ্গ ছেলেরা আজ বুলেট খেয়ে মরছে তাদের, কাব্যচর্চা আর জীবিকাচর্চার শোষণে সে ক্ষয় হয়ে যায়। নয়তো বাধ্য হয় আপোষ করে নিজেকে গুটিয়ে এনে সীমাবদ্ধ জীবনের কল্পনা দিয়ে নতুন যুগের পরীক্ষামূলক কবিতা রচনা করতে। কতো সস্তায় মেলে কবির প্রাণ, যে প্রাণ কিনবার ক্ষমতাটুকুও কাব্যলক্ষ্মীর নেই।
সুকান্ত তা মানতে চায়নি, আপোষ করেনি।
সে বুঝি টের পেয়েছিলো চলতি অবস্থা অব্যবস্থা উলটে দিতে কবিরও শহীদ হবার প্রয়োজন আছে।
ছোট গল্পে ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে তরুণ লেখককে প্রশংসা করেছি, উৎসাহ দিয়েছি ; সুকান্তকে কবিতার প্রশংসা শোনানোর সম্পর্কে সতর্ক ছিলাম। কাব্য সমালোচনার সঠিক পদ্ধতি আমার জানা নেই, বিচার বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে খানিকটা হাওয়ার তারিফ শোনাতে ইচ্ছা হতো না। তা ছাড়া, নিজে থেকে সে যে কঠিন সংগ্রাম গ্রহণ করেছিলো, যে বিস্ময়কর দ্রুততার সঙ্গে বিকাশলাভ করছিল তার প্রতিভা, তাতে তাকে উৎসাহ দেবার প্রয়োজনও ছিলো না কিছুমাত্র বরং স্বীকার করি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments