মার্কসবাদীদের চোখে জীবনানন্দ

|| ১ ||

দুটি প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করা দরকার সর্বপ্রথম ।

প্রথমত, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ কি সত্যই ব্যক্তিজীবনে কোন অগ্রসর উদ্দেশ্য থাকার বিরোধী ছিলেন ।

দ্বিতীয়ত, তিনি কি স্বদেশে ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে কোনো মানবিক সামাজিক উত্তরণকে আমল দিতে চাননি?

মার্কসবাদের দৃষ্টিতে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও লেখাকে ইতিবাচকরূপে গণ্য করতে হলে এই দুটি প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর কারণ এই যে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্বন্ধে একটা জোর প্রচার, তিনি জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণকে অস্বীকার করেছেন, তিনি অবিপ্লবী। অথচ মার্কসবাদের দৃষ্টিতে ইতিবাচকতা দাবি করে জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণের অনিবার্যতা। মার্কসবাদ হচ্ছে বিপ্লবী দর্শন। মার্কসবাদ একটি অগ্রসর উদ্দেশ্যভিত্তিক মানবীয় জীবনদর্শন । এই উদ্দেশ্য শোষণমুক্ত মানবসমাজ। সুতরাং কোনভাবেই ব্যক্তিজীবনকে ভেসে চলতে বলতে পারেনা মার্কসবাদ । ইতিহাসে বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের অব্যাহত ধারায় আসে ব্যক্তিজীবনের উদ্দেশ্যপ্রবণতা। বিশ্বজগতের একটা বিশেষ গতিধারা আছে। এই গতিধারা অবিশ্রান্ত বিকাশের স্বন্যাত্মক অগ্রগতির ধারা, পরিমাণগত থেকে গুণাত্মক পরিবর্তনে উত্তরণ । শ্রেয় থেকে শ্রেয়তার উত্তীর্ণ হওয়া। সমাজবিপ্লব এই অবিশ্রান্ত উত্তরণেরই অবিশ্রান্ত প্রকাশ। মানবমানবীর অগ্রসর উদ্দেশ্যের সম্মতি আসে এখান থেকেই । নবজাত নক্ষত্র আর নবজাত চরিত্রের মানবমানবীর সত্তার বিকাশের সাযুজ্যরয়েছে এখানে।

মার্কসীয় দর্শনের এই ধারা স্বভাবতই কোন কবিকে ইতিবাচক বলে নির্দিষ্ট করলে তাঁর কবিতার মধ্যে উদ্দেশ্যহীনতা ও উত্তরণহীনতার প্রাধান্যের পরিবর্তে থাকা চাই অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণের প্রবণতা।

জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধেও এই বিচার প্রযোজ্য।

জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে সংশয়ের ধোঁয়া সৃষ্টি করে রেখেছে মার্কসবাদের বিরোধীরা। এরাই প্রচার করে এসেছে, কবির কোন অগ্রসর উদ্দেশ্য ছিল না, তিনি বিপ্লবের প্রয়োজনবোধের বিপরীত জগতে বাস করতেন।

এই ধোঁয়া থেকে জীবনানন্দ দাশকে বের করে আনতে হবে তাঁকে মার্কসীয় দৃষ্টিতে ইতিবাচক কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে।

|| ২ ||

এখানে প্রথমে আমরা দেখতে চেষ্টা করবো কবির লেখাতে অগ্রসর উদ্দেশ্যের প্রকাতা উদ্দেশ্যহীনতাকে কিভাবে পিছনে ফেলে এসেছে।

একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করা যাক,

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব।

আবার কি ফিরে আসবনা এই পৃথিবীতে?

আবার যেন ফিরে আসি

কোনো এক শীতের রাতে

একটা হীন কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে

কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

(কমলালেবু—বনলতা সেন)

এখানে উল্লেখ করা দরকার, বনলতা সেন' কাব্যের সেই 'অন্ধকার' কবিতার পরেই এ কবিতাটি, যেখানে কবি বলেছেন, 'কোনোদিন জাগবনা আমি কোনো দিন। আর'। 'কমলালেবু' কবিতাটি "অন্ধকার" এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ। নেতির বিরুদ্ধে ইতি। "কমলালেবু' কবিতাটি যে ব্যতিক্রম নয় তার আরও প্রমাণ:

শস্যের ভিতরে রৌদ্রে পৃথিবীর সকাল বেলায়

কোনো এক কবি বসে

অথবা সে কারাগারে ক্যাম্পে অন্ধকারে;

তবুও সে প্রীত অবহিত হয়ে আছে

এই পৃথিবীর রোদে এখানে রাত্রির গছে নক্ষত্রের তরে

তাই সে এখানকার ক্লান্ত মানবীয় পরিবেশ

সুস্থ করে নিতে চায় পরিচ্ছন্ন মানুষের মতো,

সমভবিতব্যতার অন্ধকারে দেশ।

মিশে গেলে, জীবনকে সকলের তরে ভাল ক'রে

পেতে হলে এই অবসন্ন ম্লান পৃথিবীর মতো

অম্লান, অক্লান্ত হয়ে বেঁচে থাকা চাই।

একদিন স্বর্গে যেতে হতো।

(পৃথিবীতে অন্যান্য কবিতা)

জীবনানন্দ দাশ নিজেকে আত্মকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন মানব বলে প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করেছেন বলে যে ধারণার সৃষ্টি হয়ে রয়েছে এবং যে ধারণাকে মার্কসবাদের বিরোধীরা কাজে লাগাতে চেষ্টা করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও চেষ্টা করবে, উপরোক্ত উদ্ধৃতি তার প্রতিবাদ ।

বিচ্ছিন্ন আত্মবোধ যে তাঁর কাছে বরং ধিক্কারই পেয়েছে তারও প্রমাণ দাখিল করা যেতে পারে এখানেই:

প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো

কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানব সাগরে।

(তোমাকে-বেলা অবেলা কালবেলা)

ব্যক্তির ক্ষয়রোধও মানবকে যে ক্ষয়ের মধ্যে ফেলে দিতে পারে না সে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice