বেশি আদর বেশি শাসন, কোনোটাই ভালো নয়
‘হঠাৎ অতুলের ঘর থেকে ভীষণ চিৎকার আর কান্না শুনতে পেয়ে ছুটে গেলাম ওর ঘরে। গিয়ে আবিষ্কার করলাম কান্না আর চিৎকারের কারণ। আমার বোনের ছোট মেয়ে মিলি কেন ওর খেলনা দিয়ে খেলছে, সেটাই এই চিৎকার আর কান্নাকাটির কারণ। আমার ছেলের বয়স সাত হতে চলল, আর বোনের মেয়ে মিলির বয়স ছয়।’ এভাবেই একমাত্র ছেলে অতুলের কাণ্ডকারখানা বর্ণনা করছিলেন মিসেস মনি। মিসেস মনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই অতুল ওর ঘরে কেউ ঢুকলে, ওর খেলনা কেউ ধরলে সে কান্নাকাটি ও চিৎকার শুরু করে দেয়। ওর চিৎকার-চেঁচামেচিতে থাকা কঠিন। মা হিসেবে অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু একমাত্র ছেলে বলে আদর সব সময় বেশিই পেয়ে এসেছে, সেজন্যই মনে হয় ওর এই স্বভাব। তবু একমাত্র ছেলে হিসেবে আদর তো একটু বেশি পাবেই।
পরিবারে একমাত্র সন্তান হলে যেমন বাবা-মায়ের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যায়, তেমনি নিজ মনস্কামনা পূর্তিতে কোনো অংশীদারিত্ব থাকে না। তবে ভাই-বোনের সম্পর্ক বোঝা, সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে কাজ করা, মানিয়ে চলা-এ ধরনের মনোভাব গড়ে ওঠে না। নিজের জগতে অন্য কারও প্রবেশ সহ্য করার প্রবণতারও বিকাশ ঘটে না। আগের যুগে এক এক পরিবারে ভাইবোনের সংখ্যা হতো দশ-বারো জন। এ ধরনের ক্ষেত্রে মা-বাবার পক্ষে সন্তানদের সে পরিমাণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হতো না। যে বড় তাকে সব সময়ই তার ছোট ভাই-বোনকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হতো। ছোট ভাই বা বোনকে মানুষ করার ক্ষেত্রে মায়ের অনেক দায়িত্বই বড় সন্তান হিসেবে পালন করতে হতো। ভাই-বোনদের খাওয়া দাওয়া, স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসা, দেখাশোনা—এসবই। এ ধরনের পরিবেশ একজন শিশুর দায়িত্ববোধ, নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, দশজনের সঙ্গে মানিয়ে চলার অভ্যাস গড়তে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যার অভাব আমরা বর্তমান যুগে সন্তানদের মাঝে একান্তভাবে লক্ষ করি।
সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে তাঁর পঞ্চাশ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেন, আমরা ছিলাম নয় ভাইবোন, পাঁচ বোন চার ভাই। আমি ভাইবোনদের মধ্যে পাঁচ নম্বর। আমার ছোট দুই ভাই, দুই বোন। ছোটবেলা থেকে বড় ভাইবোনদের কাছ থেকে আমি অনেক সাহায্য পেয়ে এসেছি। স্কুলের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছু আমার বড় বোনই করিয়ে দিত। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এখন ব্যাংকে চাকরি করি। পড়াশোনার বিষয় ঠিক করা থেকে চাকরি সবকিছু আমারই ঠিক করা। এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় ভাই, আপার পরামর্শ আমাকে সাহায্য করেছে। আমার ছোট ভাইবোনকে দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আমি ওদের অঙ্ক, ইংরেজি পড়াতাম। বাবা-মা আমাদের দেখেছেন, তারপরও আমি আমার দুই মেয়েকে মানুষ করার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সময় বা মনোযোগ দিই, তার চেয়ে অনেক কমই আমরা পেয়েছি, কেননা নয়জনকে ওই পরিমাণ সময় দেওয়া সম্ভব নয় একজন মায়ের পক্ষে। সে সময় পরিবেশ অনেক ভালো ছিল, তাই আমাদের স্বাধীনতাও অনেক বেশি ছিল। বড় আপার ছোট হয়ে যাওয়া জামা, খেলনা, বই-খাতা দিয়েই আমার ছোটবেলা কেটেছে। আমরা পাঁচ বোন একঘরে থাকতাম, আর ভাইয়েরা এক ঘরে। নিজের ঘর বলতে কিছু ছিল না। এখন আমার দুই মেয়ের জন্য আলাদা দুই ঘর। নিজেদের ঘরে অন্য কারও প্রবেশ পছন্দ করে না। ভাবি, ওরা কখনও হলে থাকতে পারবে না। তবে ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে ভাগাভাগি করার স্বভাব হয়েছে। তারপরও বাড়িতে নিজেরা ঝগড়া করলেও বাইরে মিলেমিশেই থাকে। দুই বোনে এখন অনেক ভাব। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। প্রয়োজনে আমার সঙ্গে, ওদের বাবার সঙ্গেও আলাপ করে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। আমি ওদের বাধা দিই না, কেননা ওদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে এর প্রয়োজনীয়তা আছে। এভাবেই নিজের জীবন আর মেয়েদের গল্প বলছিলেন সুমাইয়া আক্তার।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments