একজন আদর্শ মা ও সমাজসচেতন নারী
১৯২৫ সালের দিকে বগুড়া জেলার রোহাদহ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে উম্মে হানী খানমের জন্ম। আদর্শ মা হিসেবে তিনি তার সব সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সেও একটি সুস্থ সমাজের স্বপ্ন তার চোখের তারায় ভাসছে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল ব্যাপক। তার বাবা চাইতেন যেন তার ছেলেরা উচ্চশিক্ষিত হয় এবং মনে করতেন মেয়েদের পড়াশোনার প্রয়োজন নেই। তিনি প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। সব পরীক্ষাতেই খুব ভালো করতেন। অঙ্কে সব সময় ১০০-তে ১০০ পেতেন। তবু শুধু নারী বলেই তিনি পড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি বাড়িতে সারাদিন সাহিত্য-রাজনীতিসহ নানাবিধ বই পড়তেন দেখে মায়ের বহু বকা শুনতেন। নারী হয়ে তার পড়ার আগ্রহ যেন ছিল এক অপরাধ।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মোসলেহউদ্দিন খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর উম্মে হানী খানম তার শ্বশুরবাড়ি সাভারে চলে যান। সেখানকার রক্ষণশীল পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থা তাকে আহত করে। বিয়ের পর পালকি থেকে নামার সময় এক আত্মীয় বলেছিল, ‘এ কেমনতরো বউ গো, নাকে নাই চুঙ্গি, বোঁচা বোঁচা লাগে।’ তার নাক তিনি ফোঁড়াতে দেননি। তৎকালীন সমাজের নিয়মকানুনের বিপরীতে এ ছিল তার নীরব প্রতিবাদ। শ্বশুরবাড়ির আপত্তি সত্ত্বেও তিনি পালকি বাদ দিয়ে হেঁটে ঘুরতেন। তার প্রথম সন্তান মেয়ে। মনে করেছিলেন নারী হিসেবে তিনি যেসব স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি, তার মেয়ের সকল স্বপ্ন পূরণ করবেন। মেয়েসন্তান হওয়ার পর তার মা তাকে একটি চিঠি পাঠান। তাতে তিনি লেখেন মেয়েসন্তান হওয়ায় দুঃখ না করতে। সেই চিঠি পড়ে তিনি প্রথম উপলব্ধি করতে পারেন যে মেয়েসন্তান হওয়া সকলের কাছে একটা দুঃখের ব্যাপার। তার দ্বিতীয় সন্তানও মেয়ে। তৃতীয় সন্তান ছেলে। এরপর আর ছেলে হয়নি, পর পর পাঁচ মেয়ে। এ সময় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নানা বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয় তাকে। প্রতিবেশী ছেলের বাবারা গর্ব করে বলত, ‘আমরা কি পাপ করেছি যে আমাদের সন্তান মেয়ে হবে?’ মেয়ে হওয়া যেন এক ভয়াবহ পাপের ফল। তার সাত মেয়ে ও এক ছেলে। তিনি তার সব মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন; প্রত্যেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। তিনি তার সন্তানদের যেন তার মতো অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিতে না হয়, তাদের উচ্চশিক্ষা দিতে সক্ষম হন, সেজন্য সাভার থেকে ঢাকায় চলে আসেন ১৯৫২ সালের দিকে। এসব কাজে স্বামী তাকে সমর্থন করেন ও সব সময় সাহায্য করেন। শ্বশুরালয়ের লোকজন আসতে বাধা দিলেও সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তিনি ঢাকা চলে আসেন। সাংসারিক অসচ্ছলতার জন্য তার সব মেয়েকে তিনি তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বাসায়ই পড়ান। তারপর স্কুলে পাঠান। এ সময় তিনি এলাকার নারীদের একত্র করেন, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আমাদের দেশের মেয়েরা যতদিন শিক্ষিত না হবে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হবে, ততদিন দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় প্রতিটি সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছেন। একই সময়ে মহিলা পরিষদ গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি তার এলাকায় মহিলা পরিষদের প্রথম কমিটি গঠন করেন। মহিলা পরিষদ ঢাকা শহর কমিটির প্রথম সভানেত্রী ছিলেন। উম্মে হানী খানম তার বাড়ির উঠানে তখন থেকেই গরিব বয়স্ক নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষা দিতেন। পরবর্তীকালে তিনি তার বাড়ির একটি কক্ষ এই কাজে ব্যবহার করতেন, যার নাম দিয়েছিলেন ‘আঁধারে আলো’। এছাড়া তিনি মহিলা পরিষদের উদ্যোগে রোকেয়া সদনে আশ্রিত মেয়েদের দেখাশোনা করতেন। তার ছেলে-মেয়ে সকলেই স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। বড় মেয়ে নাসিম আরা বেগম ১৯৬৪ সালে সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে শিক্ষকতা করেন। মেজো মেয়ে শামীম আরা বেগম ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments