১৯২০–১৯৪২
সোমেন চন্দ
১৯২০ সালের ২৪ মে সোমেন চন্দ নরসিংদী জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর তিনি ঢাকা মিট...
See more >>-
হাজরাদের বাড়ি বীণা বেড়াইতে গিয়াছে। পাড়ার অন্য দুই-একটা বাসা খুঁজিয়া সেখানে রনু গিয়া তাহাকে পাইল। বীণা আরও কয়েকজন মেয়ে ও বধূর সাথে বসিয়া গল্প করিতেছিল।
রনু ঘরের বাহিরে দাঁড়াইয়াই ডাক দিল, ‘বীণাদি, শুনে যান তো।’
বীণা বলিল, ‘ওখান থেকে বলো।’
হাজরাদের বধূ কনক হাসিয়া বলিল, ‘ও, রণজিতের বীণাদি বুঝি এসেছে এখানে? নইলে কোনোদিন যে ভুলেও এ বাড়িতে পা দেয় না, সে আজ এল! বীণাদির সাথে কী কথা আছে আমরা শুনতে পারব রনু?’
একটা মৃদু হাস্য-তরঙ্গ খেলিয়া গেল।
রনু লজ্জায় ঈষৎ কাত করিয়া বলিল, ‘আপনি কী যে বলেন বউদি। হ্যাঁ বীণাদি, শিগগির’—গোটাকতক কথা রনুর সকলের সঙ্গেই থাকে।
কনক বলল, ‘তুমি তো
-
এত বড়ো বটগাছ সচরাচর দেখা যায় না। পিরপুরের হাটকে যদি চিনিতে হয়, তবে যে-কোনো অশীতিপর ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেও ইহার উত্তর মিলিবে—দূরে, সে যত দূরেই হোক না কেন, যেন আকাশেরও প্রায় অর্ধেক ছাইয়া আছে, এমন একটা দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড গোলাকার গাছের দিকে দারুণ তৎপরতায় শীর্ণ হাতটি উঠাইয়া সে বলিবে, ‘আরে, তুমি কি কানা? ওই দৈত্যিটার বরাবর চলে যেতে পার না?’ যাহাকে বলা হইবে, সে যেন কোনো ব্যবসায়ী, ওই হাটের দিকেই যাইতেছে, আর কোনো উদ্দেশ্য তাহার নাই। পিরপুর গ্রামটি অন্যান্য গ্রামের মতো নয়, সেখানে কেউ ঘর বাঁধিয়া বাস করিতে পারে, একথা কেউ ভুলেও কল্পনা করিতে পারে না। কেবল একটি হাট লইয়াই
-
রাজপুত্তুরের নাম ইন্দ্রনাথ। বড়ো একটা দেশ একেবারে কম আয়াসে জয় করে নিলে! অত অত সৈন্য নেই, তেমন হাতি নেই, ঘোড়া নেই, তেমন কামান বন্দুক নেই তবু জয় করে নিলে। তারপর তার খুশি দেখে কে? এমন হলে কে না খুশি হয়? রাজ্য পেয়েই তো ইন্দ্রনাথ রাজা হল। এবার শাসনের পালা। অত বড়ো দেশ সে কেমন করে শাসন করবে? কিন্তু ইন্দ্রনাথ ঘাবড়াল না। খুব বুদ্ধিমান কিনা! শাসনকাজে আগে যেসব বড়ো বড়ো কর্মচারী ছিল তারা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এইজন্য তাদের একেবারে পথে বসানো হল না। ছেলে বা অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে সেইসব পদে নিযুক্ত করা হল। কাজেই তারা অধীন থেকেও খুশি হয়ে
-
ছোটোবেলায় শুনিয়াছি—রূপকথার রাজপুত্র সোনার কাঠি স্পর্শ করাইয়া রাজকন্যার নিদ্রা ভাঙিয়া দেয়। বুড়া ঠাকুরমার মুখে ইহা শুনিয়া মনে হইত, নিছক একটি কাহিনি। কিন্তু বয়স হইবার সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশাল জনহীন পুরীর মাঝে অনুপম সৌন্দর্য—লক্ষ্মী রাজকন্যা ও তেজস্বী এক রাজপুত্রের সাক্ষাৎকার ক্রমশই অপরূপ হইয়া উঠে।
সেইরকম একটি জীবন্ত কাহিনি ছোটোবেলায় দেখিয়াছিলাম। তখন ভাবিয়াছিলাম—মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে সত্য কতটুকু! কেবল প্রয়োজনবোধে বলিয়া ও করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু এখন মনে হয়, কথার পিছনে যে অনুপ্রেরণাটুকু থাকে, অন্তরের ভিতরকার সেই বস্তুটির দাম অনেক।
অভ্রভেদী অচলায়তন, অস্ত সূর্যের রাঙা রশ্মি, শাল ও দেবদারু গাছ: ইহাদিগের মাঝে দুইটি একান্ত অজ্ঞাত বালক-বালিকার ইতিহাসই আমি বলিব। ঢাকা শহরে বাড়ি।
-
সতীশ ওঠেনি, শিবু ওঠেনি, মনুর মা ওঠেনি, এমনকী সূর্যও আকাশে দেখা দেয়নি, তার শুধু আলো পৌঁছেছে পৃথিবীতে।
কিন্তু শ্রীবিলাস উঠেছে।
বিছানা থেকে উঠেই প্রথমে খুঁজল লাঠি,—এটা ছাড়া সে চলতে পারে না, তার অন্ধত্বকে সে কতকটা উপহাস করে এই লাঠির সাহায্য নিয়ে। ওই লাঠি তার মস্ত বড়ো সাথি। খুঁজতে খুঁজতে সাথিকে সে খুঁজে পেলও, তার ডগাটি একবার ডান পাশে, একবার বাঁ পাশে ফেলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল এবং আন্দাজে দিক ঠিক করে করজোড়ে সূর্যকে প্রণাম করল।
ঘরের ভিতর তার স্ত্রী বিন্দু, দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে, ভোরের বাতাসের ছোঁয়াচে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে।
লাঠিটা একপাশে রেখে শ্রীবিলাস দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝেয় বসে পড়ল।
-
আশ্চর্য, এমন একটা ছবি রানির ভালো লাগল না। অর্ধেকও হয়নি, তখনি সে অস্বস্তি বোধ করছিল। আগে, পেছনে ও পাশের দর্শকগুলো তন্ময় হয়ে দেখছে, কিন্তু রানি তার চোখদুটি যদিও পর্দার দিকে রেখেছে, ভালো লাগছে না তার। অথচ এখানে আসতে তারই আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
সে বিমলকে চুপি চুপি বললে, চলো বাড়ি যাই।
—কেন, ভালো লাগছে না?
—না, তুমি চলো।
বিমল বললে, দাঁড়াও ইন্টারভ্যালটা তো হোক।
হলের ভেতরের হাওয়া যেন ভারী হয়ে উঠেছে, রানি নিশ্বাস ফেলতে পারছে না।
বিশ্রাম হল, কিন্তু বিমল যা মনে করেছিল তা হল না, রানি আর থাকল না। সে আর কী করে, নীল আলোর নীচ দিয়ে বাইরে এসে
-
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সান্ধ্যভ্রমণ শেষ হয়নি; পার্কের যে-দিকটা জনবিরল সেখানে কখনও লাল কাঁকরের পথে, কখনও নরম ঘাসের উপরে স্যার বিজয়শংকর নীরবে পায়চারি করছিলেন। অদূরে মানুষের ভিড় থেকে, যানবাহন-পীড়িত পথের চলায়মান জনতা থেকে, একটানা কোলাহল শোনা যায়। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল আলো এসে পার্কের দেহাবরণ খুলে সমস্ত প্রকাশ করে দিচ্ছে।
স্যার বিজয়শংকর নিজের মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন।
—বাবা, ও বাবা!
কান্নায় বিকৃত একটি ছোট্ট মেয়েলি স্বর যেন কাছে কোথাও শোনা গেল! স্যার বিজয় থমকে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন।
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
মেয়েটি তাঁর কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে—ফ্রক-পরা, স্যার বিজয়শংকর চমশা-চোখে সেই স্বল্পালোকেই তাকে দেখলেন। ঘাড় পর্যন্ত চুল, দু-হাত আর পা নিরাভরণ, মুখ চোখের
-
ছোটো দোতলা বাড়ি, তবুও আমাদের পক্ষে বেশি হয়ে যায় বলে নীচের ঘরে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় একজন ভাড়াটে আনলাম।
লোকটির নাম শৈলেশ, সঙ্গে স্ত্রী আর চারটি ছেলে-মেয়ে।
যেদিন তারা প্রথম এল তখন রাত্রি, লোকটাকে সেদিন আর দেখিনি। কিন্তু পরদিন কলের পাড়ে মুখ ধুতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার চেহারা দেখে। মিশকালো তার গায়ের রং, চোখদুটি বড়ো, লম্বা আর ভয়ানক জোয়ান, সমস্ত গা লোমে ভর্তি, মাথায় চুল উলটানো। তার সবচেয়ে বিস্ময়কর যা তা হচ্ছে তার গোঁফ-জোড়া। স্যার আশুতোষেরও বোধ করি এমন গোঁফ ছিল না। নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম, এই ভেবে যে রাতে না দেখে ভালোই করেছি, দেখলে হয়তো মূর্ছা যেতাম। এখানে বলে রাখা
-
ঘরে আর কেউ নেই।
মালতী জিনিসটা এপিঠ-ওপিঠ করে বললে, ‘আহা, এটা কী দিয়ে তৈরি বলুন তো?’
সুব্রত ঢালটি পরীক্ষা করে বললে, ‘নিশ্চয় লোহা’।
মালতী খিল খিল করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতে বললে, ‘মোটেই নয়, তার ধার-কাছ দিয়েও নয়। এটা গন্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি। দেখতে ঠিক লোহার মতো মনে হয়, না?’
সুব্রত বিস্ময়ের স্বরে বললে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এ দিয়ে গুলি ফেরানো যায়?’
—‘হুঁ, খুব যায়। গন্ডারের চামড়া যে খুব শক্ত এটা জানেন না?’
—‘জানি।’
—‘তার চেয়েও শক্ত এটা। জলে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়েছে, একেবারে লোহার মতো হয়ে গেছে। এগুলো আগে আরও অনেক ছিল, হাতে হাতে কতগুলো নিখোঁজ হয়ে গেছে, এখন এই কয়টি
-
রমলা বিরক্ত হয়ে উঠল। যেন এত বিরক্তি তার কোনোদিন আসেনি। নইলে ইকনমিক্সের পপুলেশন চ্যাপ্টারটা তো জমে ওঠবার কথা কিন্তু আজকার ক্লাসে কিছুতেই যেন তার লেকচার গভীর হয়ে উঠল।
এমন এক-একটা দিন আসে সত্যি যখন কিছই ভালো লাগে না। আজ যেন তাই। সে যেন আজ প্রথম টের পেল, ইস্কুলের মেয়েদের চেয়ে কলেজের মেয়েরা গোলমাল করে বেশি। অথচ এখানে কিছুই বলা যায় না, ইস্কুলের মতো যায় না বেঞ্চির ওপর দাঁড় করানো, যায় না কান মলে দেওয়া। ইস্কুল থেকে কলেজে উঠে মনে করে, কী-না-কী করে ফেললাম; দুর্ভাগ্য সব। তার মেয়ে যদি হয়, সে কোনোদিন তাকে কলেজে পড়াবে না। পড়িয়ে বা লাভ কী? কিছু
-
ঠাণ্ডাটা আজ একটু বেশিই পড়িয়াছে, বাহিরেও কনকনে বাতাস, বেড়ার ফাঁক দিয়া সে বাতাস আসিয়া সকলের গায়ে লাগে। একপাশে একটি কুপি জ্বলিতেছে—প্রচুর ধোঁয়ায় মেশানো, লাল শিখা। বাতাসে কড়া তামাকের গন্ধ। রাত এখন কয়টা হইয়াছে কেহ বলিতে পারে না। মাঝে মাঝে কেবল কুকুরের ডাক ছাড়া গভীর নিস্তব্ধতা চারিদিকে।
কলকেটি উপুড় করিয়া আর এক ছিলিম তামাকের আয়োজন করিতে গিয়া কানাই দেখিল, কৌটাতে তামাক নাই। হাতের কাছেই ভেজানো দরজার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘একটু তামাক দে তো রে, দামি?’
দামিনী কানাইর মেয়ে। কেবলমাত্র বাবার মুখের অদ্ভুত গল্পটার আকর্ষণেই এতরাত অবধি জাগিয়াছিল। বলিল, ‘তামাক তো নেই বাবা।’
—‘সে কী, কালই না অতগুলো পাতা কাটলাম?’ খাওয়ার মালিক
-
Not yet had the sky well cleared and numerous birds were proclaiming the coming day at the top of their voices when, raising a dreadful storms in the hard breast of Bongram's dying river, a launch put in to shore.
Blind Dasarath knew it first. Of his two sons one had gone wrong and the younger, laying aside the oar in his hand, was filling the bowl of the hookah with tobacco for his father. Drawing in his net Dasarath sat staring with unblinking eyes at the still dark western sky as he awaited the boy's tobacco. Suddenly a sort
-
তখনও আকাশ ভালো করিয়া পরিষ্কার হয় নাই, নানাকমের পাখি আগামী দিনের ঘোষণায় প্রাণপণে ডাকাডাকি করিতেছে, বনগ্রামের মরা নদীর কঠিন বুকেও ভয়ানক ঝড় তুলিয়া কাহাদের এক লঞ্চ তীরে আসিয়া ভিড়িল।
প্রথমে দেখিয়াছিল অন্ধ দশরথ। তাহার দুই ছেলে—এক ছেলে গিয়াছে বেহালে, আর এক ছেলে যার বয়স অল্প, হাতের বৈঠাটি একপাশে রাখিয়া সে তখন অন্ধ পিতার জন্য এক ছিলিম তামাক ভরিতেছিল, আর দশরথও তখন তাহার হাতের জালটি গুটাইয়া গলাটি একটু ভিজাইবার আশায় পশ্চিমের প্রায়ান্ধকার আকাশের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে চাহিয়া ছেলের তামাকের প্রতীক্ষা করিতেছিল। হঠাৎ কেমন একটা গুম্ গুম্ আওয়াজ তাহার কানে বাজিতে লাগিল, কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে কান পাতিয়া শুনিয়া সে ডাকিল, ‘রাম?’
দশরথ-পুত্র
-
সোমেন চন্দ
অভিনয় শেষে গ্রিনরুমে এসে সকলে সমবেত হয়েছে। স্থান অল্প, লোক বেশি। অভিনয় ব্যাপারে এত পরিশ্রমের পরেও অজস্র কথার গতিতে মুখের রং তোলার বা পোশাক-পরিচ্ছদ বদলানোর তাড়া নেই।
স্থান-স্বল্পতা সত্ত্বেও ঘরের এক কোণে একটু নিরিবিলি আছে। মেয়েদের সেখানে আনাগোনা কম, কিন্তু ভারতী এসেই সে স্থানটুকু বেছে নিয়েছে। অত গোলমাল আর ভালো লাগে না। ভারতী তাই একটা লোহার চেয়ারে চিবুকে হাত রেখে বসে মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চুপ করে আছে।
কিন্তু কোনো রকমেই রেহাই পাবার উপায় নেই। রেখা কোত্থেকে এসে ধরল।
—ইস, ভাই তোকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। এমন করে একলাটি বসে আছিস কেন বল তো?
ভারতী হেসে বলল, ‘এমনি!’
—‘তোর
-
শীতের এক সুগভীর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলায় অত্যন্ত ময়লা কাপড় দিয়ে বাঁধা একটা পুঁটলি হাতে করে এক বৃদ্ধা রাজকুমার রায়ের প্রকাণ্ড ফটকওয়ালা বাড়ির ভিতরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রথমে ঢুকতে একটু দ্বিধা করেছিল, কারণ এ-বাড়িতে সে এই প্রথম পদার্পণ করছে, কিন্তু মুহূর্ত পরেই সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে এক নিঃসংকোচ কলেজ-বালিকার মতোই চাকর-বাকরের ছুটোছুটি আর কোলাহল-কাতর উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধার চেহারা এমন কদাকার যে হঠাৎ দেখলে ভয় হয়। উঁচু কপাল, তুবড়ানো নাক, মাংসল মুখ অথচ চোখ দুটি অত্যন্ত ছোটো এবং গর্তে বসানো। মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা, বয়স পঞ্চাশের বেশি হলেও গায়ের চামড়া এখনও যথেষ্ট ঢিলে হয়ে আসেনি।
বৃদ্ধা কারুর আশায় এদিক-ওদিক চেয়ে শেষে
-
এক একটা দিন আসে, এমন প্রায়ই দেখা যায়, যখন কিছুই ভালো লাগে না। এমন কি এ রকমও হয়, মরে যেতে ইচ্ছে করে। লোক চক্ষুতে ধরা পড়ে মুখের পদার্থই বেশি। তাদের স্থান মনের ক্ষেত্রে নয়। কাজেই সেখানে যা ঘটে তা নিজেরই ব্যাপার, অন্যে কখনও জানতে পারে না।
অর্থাভাবই দুঃখের একমাত্র কারণ নয়, আবার প্রচুর অর্থানুকূল্যই কেবল মানসিক সুখ ঐশ্বর্যের বাহন নয়। তাহলে কলকাতার খ্যাতনামা ধনী দীপক সেনের কেন আজ ভালো লাগবে না?
অথচ বাইরের চর্ম্ম চক্ষুতে শুধু এই প্রতীতি রয়েছে, তাঁর মতো সুখী এই অভাব—উষ্ণ পৃথিবীতে বিরল। কারণ তার বিস্তর অর্থ আছে, বয়স অল্প, ভালো চেহারা, মাথার ওপরে রক্তচক্ষু নেই, আত্মীয়
-
গলিটা হঠাৎ বোকার মতো শেষ হইয়া গিয়াছে। যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে কিছু খালি জায়গা, কিছু পুরানো ইটের স্তূপ, একটা ভাঙা দেওয়াল, আর উপরে খোলা নীল আকাশ। তার আগে শুধু এখানে-সেখানে সারি সারি টিনের ঘর, কয়েকখানা পুরানো একতলা বাড়ি, একটিমাত্র দোতলা বাড়ি, যার একতলার খানিকটা মাটির নীচে চলিয়া গিয়াছে। খোলা ড্রেন মাত্র একটি, কিন্তু খুব বড়ো, এত বড়ো যে একটা কুকুরের বাচ্চা দৈবাৎ একদিন সেখানে পড়িয়া সারা দিনে আর উঠিতে পারিল না, কেবল কেঁই কেঁই করিয়া কাঁদিল, ড্রেনের গা নখ দিয়া অনেক খুঁটিল, তারপর একদিন মরিয়া গেল। তারপর একদিন পেস্কারবাবু মথুরা চক্রবর্তীও মদের নেশায় শরীরের তাল ঠিক রাখিতে পারে নাই, হাতের
-
ছেলেগুলি যা দুষ্টু! কাল রাতে কানের কাছে কতক্ষণ ক্যান্স্ত্রা পিটিয়েছে, আজও পিটিতেছে। মানা করিলে জোরে বাজায়, কিছু না বলিলে আরও জোরে বাজায়। এমন খেলা আর খেলে নাই বুঝি। প্রত্যেকটি মধ্যযুগের দিগম্বর সম্প্রদায়ের বংশধর, মাথার চুল রোদে-পোড়া, হাতে-পায়ে বড়ো-বড়ো নখ। মুখে প্রৌঢ়া আর বৃদ্ধা মেয়েদের বিবাহের গানের অনুকরণ করিতেছে, হাতে ক্যান্স্ত্রা পিটিতেছে।
মাস্টার ছেলেটি ভালো, বড় বাধ্য। ঐশ্বর্যের লীলাভূমি শহরে অন্নের সন্ধানে আসিল, অন্ন পাইল না, কিন্তু পাইল আমাকে, তদবধি আমাকে ধরিয়াই আছে। আমি বৃক্ষ, সে লতা। মাস্টার ছেলেটি ভালো, অর্থাৎ সোজা কথায় যাকে বলে গুড বয়। মাথার চুল হইতে পায়ের নখ অবধি এমন একটি চেহারা যে, আঠারো হইতে পঁয়ত্রিশ অবধি
-
যাদব ঠিক করিল, সে আজ একটা সিগারেট খাইবে। বিবাহের আগে মাঝে মাঝে দু-একটা সিগারেট সে খাইত বটে, কিন্তু তারপর এতগুলি বছর আর ছুঁইয়াও দেখে নাই, আজ ঠিক করিয়া ফেলিল, যত দামই হোক, সিগারেট আজ একটা সে খাইবেই।
বড়ো রাস্তার রেলওয়ে ক্রসিং-এর গেটের সঙ্গে লাগিয়া যে ছোটো দোকানটা বসে, সেখানে সব রকম সিগারেটই থাকে। যাদব ধীরে ধীরে সেদিকেই চলিল। গিয়া দেখিল, দোকানের মালিক গোকুল সেখানে নাই, হয়তো খাইতে গিয়াছে, একটা ছোঁড়া বসিয়া আছে সেখানে। পান সাজানোর চকচকে থালাটার উপর দুটি পয়সা ঝনাৎ করিয়া ফেলিয়া যাদব বলিল, ‘একটা সিগারেট দে তো?’
‘যুদ্ধের ফলে সব সিগারেটের দামই চড়ে গিয়েছে’, ছোঁড়াটা বলিল।
তা হোক,
-
শীলাবতী যেন অপূর্ব সুন্দরী হইয়া উঠিয়াছে—বিশেষত আজিকার দিনটিতে। এক বছর ধরিয়া অশোক তাহাকে দেখিয়াছে, আজও দেখিল। দেখিল শীলাবতী ঘামিয়া উঠিয়াছে; কপালে, সরু চিবুকে, গলার নীচে, বুকের কাছটিতে ছোটো ছোটো ঘাম-বিন্দু। ডান হাতটি ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গিতে লীলায়িত, গালের পাশে অবিন্যস্ত উড়ো চুল।
রান্নাঘর। একপাশে একটি মাত্র জানালা—অপরিসর; সারাটা ঘর একটু আগেও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল, এখনও আছে, কিন্তু গভীরতায় অল্প।
অশোক দুই হাত তুলিয়া বলিয়া উঠিল:
—‘আহা দেখেছ, সব নষ্ট করে দিলে, সব নষ্ট করে দিলে। অমন মাছটা আর খেতে পেলাম না।’
খুন্তি নাড়িতে নাড়িতে, হাসিয়া শীলাবতী বলিল: ‘আহা! নিজের চরকায় তেল দাওগে বাপু, রান্নাঘরে কেন পুরুষের ঝকমারি! টাকা যদি তোমরা আনতে পার,
-
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে।
বিকালের রোদের নীচে সরু আলোর পথ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে আবার এই প্রথম সে গ্রামের দিকে পথ চলিতেছে। সেই পরিচিত পথ। সেই বুনোফুল-ঘাস-লতাপাতার গন্ধ, শুকনো পাতার স্তূপে কোনো অদৃশ্য প্রাণীর খস খস শব্দ, হঠাৎ কখনও সারি সারি আকাশ-ছোঁয়া তালগাছের সামঞ্জস্যহীন অবস্থিতি, সেই খেয়াঘাটের নৌকা ও মাঝি। বছরের পর বছর, মুহূর্তের পর মুহূর্ত কত পরিবর্তন চলিতেছে, কত স্বেচ্ছাচারীর চোখে-মুখে উল্লাস, কত ডাকাত পরের অন্নে মাথা ঠোকাঠুকি করে, অথচ এখানে তার ছোঁয়াটুকু নাই। পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে, তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল। আকাশে কী
-
ছয়টা বাজিয়া গেল তবু কেউ আসিতেছে না। অথচ সাড়ে ছয়টায় মিটিং। উদ্যোক্তারা অধীর হইয়া উঠিল, শেষে স্থির করিল, এমন কাণ্ড তাহারা জীবনেও দেখে নাই, শোকসভার অনুষ্ঠান করিতে গিয়া যে এমন বেকুব বনিয়া যাইবে, ইহা তাহারা স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই। একজন একটা অত্যন্ত কঠিন মন্তব্য করিয়া ফেলিল, আজ যাহারা শোকসভার এই আড়ম্বরহীন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দ্বিধা করিতেছে, কাল যে তাহারাই আবার শ্রাদ্ধ-বাসরে উপস্থিত হইতে কুকুরের মতো ঠেলাঠেলি করিয়া মরিবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। সুবোধ ঘোর জাতীয়তাবাদী, এমনকী বাংলাকেও ভারতবর্ষ হইতে পৃথক করিয়া দেখে, কিন্তু আধুনিক সব কাণ্ড কারখানা দেখিয়া সে বাঙালির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভীষণ সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছিল, অত্যন্ত বিরক্তিভরা সুরে
-
রক্ষিতরা সম্পন্ন, অর্থে এবং পরিবার-সভ্যসংখ্যাতেও।
রান্নাঘরে উনান রেহাই পায় না,—শিশুদের কলরবে দেয়াল রেহাই পায় না, প্রতিধ্বনি করিয়া ক্লান্তি আসে—যেন একটি ছোটো-খাটো কারখানা। এ বাড়ির গুঞ্জনের সঙ্গে ভোরবেলা যে কোনো লোকের এমনি হঠাৎ পরিচয় হইলে মনে হয়, রাত থাকিতেই যেন এখানকার দিন-মানীয় কোলাহলের তোড়জোড় চলিতেছে। কোনো ছেলের ভোরে ইস্কুল, তাহার খাওয়ার ব্যবস্থা; বা কোনো শিশু রাত্রিশেষে কাঁদিয়া উঠিল, শেষ পর্যন্ত মনোরমা না উঠিলে আর উপায় নাই। তারপর আস্তে আস্তে ভোর হয়, তাড়া খাইয়া চাকর-বাকর ওঠে, সঙ্গে বাড়ির অন্যান্য ঘুমকাতর ছেলেমেয়েরাও। বাড়ির গৃহিণীকেই অতি সকালে উঠিতে দেখিয়া বধূরাও অতি কষ্টে আয়নার কাছে আসিয়া দাঁড়ায়, অবিন্যস্ত চুল অথবা কপালের সিঁদুর ঠিক করিয়া লয়।
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.














