রানু ও স্যার বিজয়শংকর
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সান্ধ্যভ্রমণ শেষ হয়নি; পার্কের যে-দিকটা জনবিরল সেখানে কখনও লাল কাঁকরের পথে, কখনও নরম ঘাসের উপরে স্যার বিজয়শংকর নীরবে পায়চারি করছিলেন। অদূরে মানুষের ভিড় থেকে, যানবাহন-পীড়িত পথের চলায়মান জনতা থেকে, একটানা কোলাহল শোনা যায়। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল আলো এসে পার্কের দেহাবরণ খুলে সমস্ত প্রকাশ করে দিচ্ছে।
স্যার বিজয়শংকর নিজের মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন।
—বাবা, ও বাবা!
কান্নায় বিকৃত একটি ছোট্ট মেয়েলি স্বর যেন কাছে কোথাও শোনা গেল! স্যার বিজয় থমকে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন।
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
মেয়েটি তাঁর কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে—ফ্রক-পরা, স্যার বিজয়শংকর চমশা-চোখে সেই স্বল্পালোকেই তাকে দেখলেন। ঘাড় পর্যন্ত চুল, দু-হাত আর পা নিরাভরণ, মুখ চোখের জলে ভেজা, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদছে।
—বলুন না, আমার বাবাকে দেখেছেন?
স্যার বিজয় তার ছোটো একটি সরু হাত ধরে বললেন, তোমার বাবা বুঝি হারিয়ে গেছেন?
মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললে,—বাবা আমায় খুব ভালোবাসে কিনা, আমি প্রায়ই বাবার সাথে এমনি বেড়াতে আসি, আজও এলাম, কিন্তু বাবাটা কি দুষ্টু, আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেল, আমায় একবার ডাকলও না, আমি কত খুঁজলাম, এমন দুষ্টুমি তো বাবা কখনও করে না। আমি তো আর সব পথ চিনি না, কেমন করে বাবাকে খুঁজে বের করি। আপনি দেখেছেন আমার বাবাকে?
স্যার বিজয়শংকর তার মাথায় হাত রেখে বললেন, দেখিনি, কিন্তু খুঁজে বার করে দেব, তুমি কেঁদো না খুকি। আচ্ছা, তোমার বাবার কেমন চেহারা বলো তো?
—আপনি যেমন লম্বা-না, ঠিক এমনি লম্বা। কিন্তু আপনার মতো দাড়ি-গোঁফ নেই, আর থাকবেই বা কেন, আপনার মতো বুড়ো তো নয়—কিন্তু আমি একদিন দুপুরবেলা দেখেছি, মাথায় ছোটো একটা টাক, চুলও পেকেছে খুব, আমি কত ফেলে দিই তবু পাকে!
কথার বেগে মেয়েটির কান্না কমে আসছিল। স্যার বিজয় পকেট থেকে সিল্কের রুমাল বার করে সস্নেহে মেয়েটির চোখের জল মুছে দিলেন। বললেন, খুকি, তুমি কেঁদো না। কোনো ভয় নেই, আমিই তো আছি, তুমি কেঁদো না। আমি তোমার বাবাকে খুঁজে বার করে দেব।
মেয়েটি তাঁর মিষ্টি কথা শুনে, আর চেহারার আভিজাত্য, গাম্ভীর্য দেখে কতকটা আশ্বস্ত হয়েছিল। ঘাড় কাত করে বললে, কলকাতার সব রাস্তা আপনি চেনেন?
কী একটু ভেবে স্যার বিজয় বললেন, তা না হলে আর এত বুড়ো হলাম কেমন করে বলো? সব রাস্তা চিনি।
মেয়েটি মনে মনে তাঁর যুক্তি স্বীকার করল।
—রূপ সিং?
—হুজুর?
স্যার বিজয়শংকর মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন, এসো।
প্রকাণ্ড গাড়ি। আর কেমন চকচক করে! মেয়েটি বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল। মাডগার্ডের ওপরে হাত বুলোতে বুলোতে বললে, এটা আপনার গাড়ি! আমিও উঠব, না?
—হ্যাঁ। স্যার বিজয় হাসলেন।
—কত দাম? তেমনি হাত বুলোতে সে জিজ্ঞাসা করলে।
স্যার বিজয় আবার হেসে বললেন, কুড়ি হাজার।
মেয়েটি আশ্চর্য হল না; কারণ কুড়ি হাজার কাকে বলে তা সে জানে না। কেবল চারদিকে চেয়ে দেখতে লাগল।
—এসো। স্যার বিজয় ভেতরে গিয়ে বসে তাকে পাশে বসালেন। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে বললেন, রূপ সিং?
—হুজুর?
টাকা বার করে তিনি বললেন, কুছ টফি ঔর লজেন্স—
একটি পরে রূপ সিং কতগুলো টফি আর লজেন্স এনে হাজির করল। সেগুলো সিটের একপাশে রেখে স্যার বিজয়শংকর বললেন, তোমার খিদে পেয়েছে, না? খাও।
কিন্তু সেগুলো কয়েকটা হাতে নিয়ে মেয়েটি বসে রইল, আর তাঁর দিকে তাকাতে লাগল—কেমন করে খাব?
স্যার বিজয় ওপরের কাগজ ছিঁড়ে তার মুখের কাছে ধরে হেসে বললেন, আচ্ছা, তোমার নাম তো বললে না?
—রানু। মেয়েটি চিবুতে চিবুতে বললে।
রাজপ্রাসাদ বললেও অত্যুক্তি হয় না। কক্ষসারির প্রতি জানালায় দেখা যায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments