প্রান্তর
রক্ষিতরা সম্পন্ন, অর্থে এবং পরিবার-সভ্যসংখ্যাতেও।
রান্নাঘরে উনান রেহাই পায় না,—শিশুদের কলরবে দেয়াল রেহাই পায় না, প্রতিধ্বনি করিয়া ক্লান্তি আসে—যেন একটি ছোটো-খাটো কারখানা। এ বাড়ির গুঞ্জনের সঙ্গে ভোরবেলা যে কোনো লোকের এমনি হঠাৎ পরিচয় হইলে মনে হয়, রাত থাকিতেই যেন এখানকার দিন-মানীয় কোলাহলের তোড়জোড় চলিতেছে। কোনো ছেলের ভোরে ইস্কুল, তাহার খাওয়ার ব্যবস্থা; বা কোনো শিশু রাত্রিশেষে কাঁদিয়া উঠিল, শেষ পর্যন্ত মনোরমা না উঠিলে আর উপায় নাই। তারপর আস্তে আস্তে ভোর হয়, তাড়া খাইয়া চাকর-বাকর ওঠে, সঙ্গে বাড়ির অন্যান্য ঘুমকাতর ছেলেমেয়েরাও। বাড়ির গৃহিণীকেই অতি সকালে উঠিতে দেখিয়া বধূরাও অতি কষ্টে আয়নার কাছে আসিয়া দাঁড়ায়, অবিন্যস্ত চুল অথবা কপালের সিঁদুর ঠিক করিয়া লয়।
মনোরমার পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। সব ক-টি ছেলেমেয়েরই বিবাহ হইয়াছে। মেয়েরা বেশির ভাগই থাকে দূর বিদেশে, কেবল ছোটো মেয়েটির এই শহরে বাস। ছেলের মধ্যে চারটিই উপযুক্ত, অর্থাৎ যথেষ্ট অর্থ বহন করিয়া আনে। তারপর ছোটো ছেলেটির সম্বন্ধে বলিতে হয় এইরূপ: কোনো অশুভ প্রভাতে বাড়ি ঘিরিয়েছিল পুলিশ, তারপর কী হইয়াছিল মনোরমা জানেন না, জ্ঞান হইলে দেখেন, বাড়ি ঘিরিয়া পুলিশ নাই, ছোটো ছেলে অজয়ও নাই। ছেলেটা মাত্র এম.এ. পাশ করিয়াছিল,—নিজের ইচ্ছায় একটি গরিবের মেয়েকে বিবাহ করিয়াছে। এখানেই মনোরমার দুঃখ। ছেলেকে লইয়া অনেক আশা তিনি করিয়াছিলেন, বিলাত যাওয়ার খরচ সুদ্ধ কত ডানাকাটা পরির বাপও ঘোরাঘুরি করিতেছিল তাঁহার কাছে। তার উপর জেলে যাওয়া! দৈনিক পত্রের বহু বিজ্ঞাপিত ব্যাপার শেষে তাঁহারই ঘাড়ে আসিয়া চাপিল!
তারপর একটি বছর কাটিয়া গিয়াছে। এখন সবই আগের মতো সহজ। কক্ষের অভ্যন্তরে শিশুদের দাপাদাপি, কোলাহল, বধূদের চাপা হাসি, চুড়ির শব্দ, চাকর-বাকরের চেঁচামেচি, মনোরমার ব্যস্ততা—স্বামীর মৃত্যুতিথির উৎসবদিনেও এক ফোঁটা চোখের জল ফেলিবার সময় নাই।
তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। কিছুক্ষণ নীচতলার পেছন দিকের বারান্দায় গলায় আঁচল জড়াইয়া সতী একাকী ঘুরিতেছিল। একপাশে একটি ছোটো ঘরের দরজার কাছে দেয়াল ঘেঁষিয়া বৃদ্ধা লাবণ্যলতা বসিয়াছিলেন। বংশের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বতন দৃষ্টান্ত তিনি, মনোরমার শাশুড়ি। কিন্তু সাংসারিক রীতি অনুযায়ী আপন নন, সৎ; মনোরমার মৃত স্বামী তাঁহার নিজের ছেলে নয়, আগের পক্ষের। কিন্তু শোনা যায়, সেই ছেলে অনেক বড়ো হইয়াও নাকি জানিতে পারে নাই, লাবণ্যলতা তাহার মা নয়। যা-হোক, সেই ছেলে অবশেষে মানুষ হইয়াছে, শহরে বাসা বাঁধিয়াছে, অজস্র টাকা উপার্জন করিয়াছে, আবার নিজের সন্তানদের মানুষ করিয়াছে, তারপর হঠাৎ একদিন মারা গিয়াছে। সেও খুব অল্পদিনের কথা নয়, তবু আজও সেই লাবণ্যলতা বাঁচিয়া আছেন। চোখে কম দেখিতে পান, তবু নিজে রাঁধিয়া খান।
কপালে কুঁচকানো চামড়া আরও কুঁচকাইয়া লাবণ্যলতা বলিলেন, ‘তুই কে?’
উত্তর আসিল, ‘আমি।’
—‘আমি? আমি কে?’
সতী কাছে গেল, ইচ্ছা করিয়াই কানের কাছে মুখ নিয়া বলিল, ‘অজয় নামে একটা ছেলে আছে না? আমি তারই বন্ধু, নাম হল সতী।’
লাবণ্যলতা নির্জে মুখ সরাইয়া নিলেন, ঠোঁট উলটাইয়া বলিলেন,
—‘ওমা—তোদের সব কাণ্ড! সোয়ামির নাম মুখে আনা যেন হেলা-খেলা, দিনে দিনে আরও কত দেখতে হবে! আবার বলা হচ্ছে, বন্ধু! আচ্ছা, বন্ধুই যদি, তবে বন্ধুর বিহনে একবারও চোখের জল ফেলিসনে কেন শুনি? অমন তাজা সোয়ামিটাকেও ঘরে আটকে রাখতে পারলিনে কেন শুনি? তোদের ভালোবাসায় ছাই!’
হাসিতে হাসিতে সতী বলিল, ‘আমাদের তো কিছুই নয়, কিন্তু সেকালে আপনাদের ভালোবাসার নমুনা দু-একটি বলবেন শুনি?’
—‘না, না, বাপু, অত বকবক করতে আমি পারিনে।’ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিলেন, ‘হুঁ, আবার নাম রাখা হয়েছে সতী।’
দীর্ঘ বারান্দার ওই পাশে ইলেকট্রিক আলো জ্বলিতেছে। উপরে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার শব্দ শোনা যায়। নীচে মনোরমা অথবা মেজছেলের ডাকাডাকি, ঝি-চাকরদের কলরব।
এদিকে কোনো সাড়া না পাইয়া লাবণ্যলতা মুখ ফিরাইয়া
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments