কিন্নরী
কিন্নর কৈলাসের আড়ালে অস্তগামী চাঁদটা তাম্রপ্রস্তর যুগের একটা ধাতুপাত্রের মতো তলিয়ে যাচ্ছে। আকাশের অগণিত নক্ষত্র জ্বলজ্বল চোখ মেলে চেয়ে দেখছে তাকে।
কামরু পাহাড় থেকে নেমে আসছে সে। ছায়া ছায়া পাকদণ্ডীর পথ। অভ্যস্ত পায়ে দ্রুত উতরাই বেয়ে পাহাড়ি ঝোরার মতো নামছে সে। বাঁকের মুখে অদৃশ্য হচ্ছে, আবার জেগে উঠছে। মাথার ওপর পরে নেওয়া সুন্দর ভেলভেটের শেউখানা উঁকি দিচ্ছে। তার তলায় সোনালি সেব ফলের মতো মুখখানা। উদ্ধত বুক চোলির বাঁধনে বাঁধা পড়তে চাইছে না। পা অবধি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দামি কম্বলের দোরি কাঁধ থেকে বুক ঢেকে নেমে গেছে নীচে। মোটা রেশমি গাচ্ছং বা কাপড়ের প্যাডে কটিদেশ বাঁধা পড়েছে।
পাহাড়ের ওপর কয়েক শতাব্দী আগেকার রহস্যময় কাঠের কেল্লা পেছনে পড়ে রইল।
সে সুপ্ত কামরু গাঁওয়ের ঘুম না ভাঙিয়ে নেমে এল সাংলা উপত্যকায়। হলুদ দুগ্ধ ফুলের খেত থেকে ভেসে আসছে একটা মিষ্টি গন্ধ। বুক ভরে সেই বাতাসের গন্ধটা টেনে নিতে নিতে সে একটা কুহলের কাছে এসে দাঁড়াল। এক ঝাঁক বাসরজাগা তরুণীর মতো খল খল হাসিতে লুটোপুটি খেতে খেতে ছুটে চলেছিল ঝরনাটা। একটু থমকে থেমে মুখখানা নামিয়ে জলের ওপর জেগে থাকা পাথরের মাথায় সাবধানে পা ফেলে ফেলে পেরিয়ে এল সে।
"আমি কথা দিলে সে কথা প্রাণ গেলেও রাখব।" লালা বলল, "বেশ, পুলিশ অফিসারকে আমি এ দুদিন ঠেকিয়ে রাখছি, কিন্তু তৃতীয় দিনে যদি তোমাকে না পাই... মানে তুমি যদি ফাঁকি দিয়ে পালাও, তাহলে তোমার ওই বন্ধুর দফাটি একেবারে নিকেশ হয়ে যাবে...।" তোসি উঠে দাঁড়িয়ে ছোট্ট করে বলল, "পরশু রাত শেষে বাস্পা নদীর ওই ছামের ধারে আপনি আমার দেখা পাবেন।"
আখরোট গাছের প্রান্তর। ডালপাতা মেলে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। অল্প অল্প বাতাসে পাতাগুলো নড়ছে। একটা হাতপাখা যেন চালাচ্ছে কেউ। মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে শব্দ, আবার ঝরঝর আওয়াজ উঠছে। ঘুমে ঝিমুতে ঝিমুতে যেন পাখা চালাচ্ছে গাছগুলো।
দুটো ধাপ পাহাড়ে উঠে ইয়াক ব্রিডিং সেন্টারের তারের বেড়ার পাশ দিয়ে সাংলা তহশিল অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল সে। চারদিকে একবার চেয়ে দেখল। সাংলা পি. ডব্লিউ. ডি. রেস্ট হাউস। বেড়া দেওয়া চত্বরের নীচে পুলিশ চৌকি। পেছনের টিলায় ওভারসিয়ারের কোয়ার্টার। পোলট্রি ফার্ম, ফ্রুট নার্সারির অফিসঘর। দূরে বাস্পা নদীর ধারে ট্রাউট ফার্ম। জাফরান খেতের চাষিদের ঘরগুলো অনেক দূরের থেকে কয়েকটা কালো ভালুকের মতো দেখাচ্ছে।
তহশিলদারের অফিসের পেছনে একখানা শ্লেটপাথরের চালা দেওয়া কাঠের ঘর। একটা বড় গোছের আখরোট গাছ ডালপাতা মেলে ছোট্ট ঘরখানাকে যেন আদরে সোহাগে আগলে রেখেছে। ঝোরকার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ডাক দিল সে, সুজয়, সুজয়।
অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে একটা মিশ্রিত আওয়াজ শোনা গেল। কেউ যেন আচমকা ঘুম ভেঙে খাটিয়ার ওপর উঠে বসল। সারা ঘরে দড়ি আর কাঠের একটা আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল।
কে, তোসি?
হ্যাঁ আমি, আমি! ঝটপট বেরিয়ে এসো। উখাং-এর ফুল আনতে যাবে না? ভুলে গেলে নাকি?
ভেতরে এসো, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে কতক্ষণ?
আমি ঠিক আছি। ভেতরে গেলেই দেরি হয়ে যাবে। তুমি বরং চটপট চলে এসো।
ধৌলাধার পর্বতের মাথায় বরফ, তার ঠিক উলটোদিকে হিমালয়ের প্রধান শাখায় কিন্নর কৈলাস। ছোট-বড় অনেকগুলো বরফে ঢাকা শৃঙ্গ। তার চারদিকে বরফের তলার পাহাড় দেওদার, কাইল, সিডার আর ফার গাছের জঙ্গলে ছাওয়া।
কনকনে কঠিন ঠান্ডায় বাইরে দাঁড়িয়ে রইল তোসি। ভ্যালির চারদিকে বরফের মাথা-উঁচু পাহাড়গুলো যেন ডিপ ফ্রিজের ভেতর সারা উপত্যকার সব কিছুকেই ভরে রেখেছে।
এতটুকু উত্তাপ আবহাওয়ার কোথাও নেই। তা না থাক, উত্তাপ ছিল তোসির বুকে। রাত পোহালেই ক্যালেন্ডারের পাতা জানিয়ে দেবে পাঁচই সেপ্টেম্বরের তারিখটা। উখাং উৎসবের উন্মাদনাময় চিহ্নিত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments